skip to content
গুলবাহার
অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার সেই হারানো কৌশল

অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার সেই হারানো কৌশল

·

• ৪ মিনিট

আজকের লেখাটা শুরু করি একই দিনে ঘটা দুইটা ঘটনা দিয়ে। ট্রেনের একটা বগিতে বসেছিলাম, ভিড় কমই ছিল। হঠাৎ সত্তরোর্ধ্ব এক নারী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “এখানে কি বসতে পারি? নাকি একা একা নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতে চাও?”

আমি এক মুহূর্ত ভাবলাম। তাঁকে বসতে দেওয়ার মানে হলো একটা আলাপচারিতার সুযোগ করে দেওয়া। তবুও বললাম, “না না, অবশ্যই বসুন।”

ভদ্রমহিলা মানুষ হিসেবে বেশ অমায়িক ছিলেন। দিনটা তাঁর বেশ কঠিন কেটেছে। আমাকে খুব বেশি কিছু বলতে হয়নি, শুধু টুকটাক সায় দিচ্ছিলাম—“শুনে খারাপ লাগলো” কিংবা “আপনার জন্য দিনটা আসলেও কঠিন ছিল।” মাঝে মাঝে তিনি আমার সম্পর্কেও জানতে চাইছিলেন। বুঝলাম তিনি শুধু নিজের কথা একতরফা বলে যেতে চান না, বরং এমন কাউকে খুঁজছিলেন যে একটু মন দিয়ে শুনবে। এটা কেবল তথ্য আদান-প্রদান ছিল না, ছিল একটা মানবিক সংযোগ।

আমার মনে হলো তিনি হয়তো একটা খালি বাড়িতে ফিরছেন, আর সারাদিনের ক্লান্তিটা কারও সাথে ভাগ করে নিতে চাইছিলেন। আমার মোটেও অস্বস্তি হচ্ছিল না। চাইলেই ফোনের বাহানা দিয়ে আমি সরে যেতে পারতাম, কিন্তু পুরো ৫০ মিনিটের যাত্রায় আমাদের অনেক কথা হলো। আমি কথা বলার চেয়ে শুনলামই বেশি। খেয়াল করলাম, এমন সহজ যোগাযোগ এখনকার দিনে বেশ বিরল। তবুও মানুষে-মানুষে এমন টান দেখে আমার ভালোই লাগলো।

সেই সন্ধ্যায় পরিবারের সাথে এক রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। বিল দিতে এলেন একজন নারী কর্মী। কথায় কথায় জানলাম তিনি সিউলের মেয়ে। বেশ লাজুক আর শান্ত স্বভাবের। কোরিয়ান খাবার আর তাঁর দেশের কথা নিয়ে হালকা কিছু আলাপ হলো। তখন বিষয়টাকে আমি খুব সাধারণভাবেই নিয়েছিলাম।

কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে আমার ১৫ বছরের ছেলে জিজ্ঞেস করলো, “বাবা, এভাবে হুটহাট কথা বলা কি ঠিক?”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন, কী হয়েছে?”

সে জানতে চাইলো, অচেনা কারও ব্যক্তিগত বিষয় বা দেশ নিয়ে কথা বলার সীমা কতটুকু। প্রশ্নটা আসলেও চমৎকার, অচেনা মানুষের সাথে কথা বলার নিয়মটা আমরা আসলে কীভাবে বুঝি? তখন বুঝলাম, বড় হতে হতে আমরা সবাই কিছু অলিখিত সামাজিক নিয়ম শিখে ফেলি, যা দিয়ে আমরা বিচার করি কার সাথে কথা বলা যাবে আর কার সাথে নয়।

আমি ভাবলাম, ট্রেনের সেই নারী কীভাবে বুঝলেন যে আমার সাথে কথা বলা যাবে? ছেলেকে বললাম, “সবসময় এটা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না রে। মাঝেমধ্যে একটু ঝুঁকি নিয়েই দেখতে হয়।”

তখন একটা বিষয় মাথায় এল—মানুষ এখন একে অপরের ওপর আস্থা রাখা কমিয়ে দিয়েছে। অথচ আপনার আশেপাশেই হয়তো কেউ আছে যে আপনার কথা শুনতে চায়, বা নিজেই কিছু বলতে চায়। মানুষ এখন নিজের ওপর থেকেও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে; তারা ভয় পায় নতুন কারও সাথে কথা বলতে পারবে কি না বা প্রত্যাখ্যানের শিকার হবে কি না।

রেস্টুরেন্ট, দোকান, লাইন কিংবা গণপরিবহনে আগের মতো সেই আড্ডা বা আলাপ এখন আর দেখা যায় না। ২০১৮ সালে যখন আমি পাবলিক স্পিকিং আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ শুরু করি, তখন মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝেছিলাম—তাদের মূল ভীতি কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা নয়। বরং জনসমক্ষে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতেই এখন অনেকের জড়তা কাজ করে।

এর পেছনে অনেক কারণ আছে। কানে দামী হেডফোন গুঁজে রাখা মানেই হলো ‘আমার সাথে কথা বলবেন না’। এছাড়া ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া আর সব কিছুতে প্রযুক্তির ব্যবহার তো আছেই। এখন দোকানে গিয়েও মানুষের সাথে কথা বলতে হয় না, টাচস্ক্রিনে অর্ডার দিলেই চলে। এটাকে বলা যায় আমাদের সামাজিক মেলামেশার জায়গাটুকুর মৃত্যু। মহামারি এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় অজুহাত হলো—“অন্যরা কথা বলছে না, আমি কেন বলব?” ওয়েটিং রুমে সবাই যখন চুপচাপ ফোন গুঁতোগুঁতি করে, তখন কথা বলাটা একটু অদ্ভুতই দেখায়। অনেকে অন্তর্মুখী স্বভাব বা বিরক্তির অজুহাত দেন। বিশেষ করে ‘আবহাওয়া’ নিয়ে ছোটখাটো আলাপ এখন অনেকের কাছেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। লকডাউনের সময় দূরত্ব বজায় রাখাটা নিয়ম ছিল, কিন্তু সেই অভ্যাসটা আমরা এখনো ছাড়তে পারিনি। সবাই যেন একটা প্রযুক্তির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখছি।

বিষয়টা কেবল কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি নয়, বরং এর চেয়েও গভীর। আমরা আমাদের মৌলিক মানবিক দক্ষতা—একে অপরকে বোঝা এবং শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জেনারেশন স্বাভাবিক আলাপচারিতার দক্ষতায় আগের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে, যা তাদের আত্মমর্যাদাবোধকেও কমিয়ে দিচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এটা আসলে চর্চার বিষয়। সামাজিক দক্ষতাগুলোকে পেশির মতো নিয়মিত ব্যায়াম করে শক্তিশালী রাখতে হয়। আগে যা খুব স্বাভাবিক ছিল, এখন তা যেন এক দুর্লভ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ‘অচেনা মানুষের সাথে কথা বলা’ নিয়ে যেসব ভিডিও দেখি, সেগুলো প্রায়ই নাটকীয় বা লোকদেখানো মনে হয়। অনেক সময় ক্যামেরা অন রেখে কাউকে সাহায্য করা বা কথা বলাটা কেবল ভিউ পাওয়ার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আন্তরিকতার অভাব স্পষ্ট।

আসল কথা হলো, কথা শুরু করতে গেলে প্রত্যাখ্যানের যে ভয় আমরা পাই, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা খারাপ হয় না। গবেষণা বলছে, মানুষ যেমনটা ভাবে, কথোপকথন তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয়।

অচেনা কারও সাথে কথা বলা মানেই তাকে জীবন বদলে দেওয়ার মতো কিছু বলা নয়। স্রেফ “আজ খুব ঠান্ডা, তাই না?”—এটুকু বলাটাই যথেষ্ট। কেউ যদি জবাব না দিতে চায়, বিনয়ের সাথে সরে আসুন। হয়তো তার মুড ভালো নেই, আর সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার এক ছোট উদ্যোগ কারও বিষণ্ণ দিনটাকে বদলে দিতে পারে।

দোকানে বৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললে হয়তো দুনিয়া উল্টে যাবে না, কিন্তু এই ছোট মানবিক যোগাযোগগুলোই আমাদের সমাজকে বাঁচিয়ে রাখে। আমরা এখন এক বিভাজিত পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে সবাই নিজের ফোনের ভেতরে বন্দি। তাই দেরি হওয়ার আগেই, ফোনের আড়াল থেকে বেরিয়ে একে অপরের সাথে কথা বলা শুরু করা দরকার।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. রোমান্টিক দক্ষতা বাড়ানোর উপায়

    সুস্থ প্রেমের সম্পর্ক গড়তে রোমান্টিক কম্পিটেন্স বা রোমান্টিক দক্ষতা কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এটি বিকাশ করা যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।

    সম্পর্কমানসিক স্বাস্থ্যযোগাযোগ
  2. চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ

    চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প

    এআইমানসিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি
  3. আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী সময়

    একটি যুব বাস্কেটবল দলের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করে আমি যেভাবে সত্যিকারের সুখ খুঁজে পেয়েছিলাম, এবং কেন তা আজকের প্রযুক্তি জগতের জন্য প্রাসঙ্গিক।

    ব্যক্তিগত উন্নয়নকোচিংবাস্কেটবল