নেপালের কুম্বু পর্বতমালার উপত্যকা আর পাহাড়ি ঢালে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য চা-ঘর। এখানে এক কাপ গরম চা শুধু আতিথেয়তার প্রতীক নয়—বরং এটি টিকে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ।
পূর্ব নেপালের বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে ২৭ দিনের দীর্ঘ যাত্রার মাত্র তিন দিন পেরিয়েছি তখন। নিচু মেঘ আর অবিরাম বৃষ্টি ঠেলে মেরা পিক ট্রেকিং ট্রেইল ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
“আমরা কি ঠিক পথেই এগোচ্ছি?”—গাইড অর্জুন রাইকে জিজ্ঞেস করলাম।
“মনে তো হয়,” টুপির কিনারা বেয়ে ঝরে পড়া বৃষ্টির পানির মধ্যেই তিনি বললেন। “আমি মোটামুটি নিশ্চিত।”
কুয়াশা এতটাই ঘন ছিল যে ৩০ মিটার দূরের কিছুও দেখা যাচ্ছিল না। সেপ্টেম্বর মাসটি ছিল অস্বাভাবিক রকমের বৃষ্টিবহুল—বর্ষা মৌসুমের একেবারে শেষ দিক। সংকীর্ণ, কাদামাখা খাদ বেয়ে নামতে নামতে আমাদের পথ আটকে দিল একটি পাহাড়ি ঝরনা। পাথুরে ঢালে আছড়ে পড়া স্রোতটি সরাসরি আমাদের রাস্তায় নেমে এসেছে। পার হতে হলে জুতা-মোজা খুলে খালি পায়ে সেই বরফশীতল স্রোত পেরোতে হবে—যার ডান পাশেই খাড়া খাদ।
অর্জুন রাই অনায়াসেই পার হয়ে গেলেন, পিচ্ছিল পাথর থেকে পাথরে হালকা পায়ে লাফ দিয়ে। আমি হাত দিয়ে পাথর আঁকড়ে টলতে টলতে পার হলাম; পা যাতে না কাটে বা ঝরনার পানিতে পড়ে না যাই, সেদিকেই ছিল মূল ধ্যান। ওপারে পৌঁছে অর্জুন একটা সিগারেট ধরালেন এবং বললেন, “এটাই তো আসল অ্যাডভেঞ্চার!” বৃষ্টির মধ্যে দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলাম—ক্ষণিকের জন্য ভুলেই গেলাম যে আমরা ভিজে একাকার হয়ে শীতে কাঁপছি আর কাদায় মাখামাখি হয়ে আছি।
এটাই নেপালিদের—বিশেষ করে পাহাড়ের আদি নেপালিদের—স্বভাব। হিমালয়ে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ানো চরম বৈরী পরিস্থিতিতেও মানিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলাই তাদের বৈশিষ্ট্য। নেপালের মাত্র সাত শতাংশ মানুষ এই উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে বাস করে। সলুখুম্বু জেলা—যেখানে এভারেস্টসহ দেশের সর্বোচ্চ চূড়াগুলো অবস্থিত, সেখানকার জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন, অনেক সময় নিষ্ঠুর: হাড়-জমানো ঠান্ডা, খাড়া পাহাড়, অনুর্বর মাটি, আর হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি চলার রাস্তা। অথচ এই দুর্গমতা আর কঠোর সৌন্দর্যই পর্যটকদের এখানে টেনে আনে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৫৬,০০০ পর্যটক সলুখুম্বু ভ্রমণ করেছেন, যাদের বেশিরভাগই বিদেশি।

পাঁচ ঘণ্টা বৃষ্টিতে হাঁটার পর শেষমেশ সেটা দেখতে পেলাম: পাহাড়ের ঢালে একটি ছোট্ট কুটির, যার চাল দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। একটি চা-ঘর। নিচু চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে মাথা নিচু করতে হলো, ভেতরে ঢুকে দেখি পেম্বাদোমা শেরপা (১৪) আর তার বোন মিংমাকাঞ্ছি (৭) আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে।
পেম্বাদোমা লাজুক হেসে একটা পাত্রে পো চা, বা শেরপা চা নাড়ছিল। এ অঞ্চলে এই ঘন, নোনতা পানীয় তৈরি হয় জোমো (ইয়াক ও গরুর সংকর প্রাণি)-এর মাখন, কালো চা আর ভাজা যবের আটা দিয়ে। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দের মাঝে সে কাঠের দণ্ড দিয়ে একটানা চা নাড়তে থাকে, হাতের নাড়াচাড়ায় বোঝা যায় এটা তার দৈনন্দিন অভ্যাস।

এই সাদামাটা চা-ঘরটি হিমালয়ের শত শত পাহাড়ি আশ্রয়ের একটি—যেগুলো ট্রেকার, পর্বতারোহী, রাখাল আর গ্রামের মধ্যে চলাচলকারী পথিকদের জন্য যেন এক লাইফলাইন এবং অন্যতম মিলনকেন্দ্র। পর্যটকরা এখানে আসেন বিভিন্ন কারণে—বিশ্রাম নিতে, রাত কাটাতে, খেতে কিংবা আগুনের পাশে কাপড় শুকাতে—তবে প্রায়ই তারা খোঁজেন মানুষের সঙ্গ। চুলার পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প চলে, যা ভাষার বাধা পেরিয়ে, মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। এখানকার খাবারগুলো বেশ পুষ্টিকর ও শক্তিদায়ক: গরম ডাল-ভাত—মসুর ডালের তরকারি, ভাত, সবজি আর আচার নিয়ে নেপালের জাতীয় খাবার; মোমো—মাংস বা সবজি ভরা নরম ডাম্পলিং, সাথে ঝাল চাটনি; পাতলা রুটি; আর থুকপা—ঘন নুডলস স্যুপ। এই খাবারগুলোতে ভারতীয়, তিব্বতি ও চীনা প্রভাব মিলেমিশে আছে—সাদামাটা হলেও এগুলো দীর্ঘ পথচলার শক্তি যোগায়।

কিছু চা-ঘর চালান পর্বত গাইডদের স্ত্রীরা, কারণ স্বামীদের মাসের পর মাস অভিযানে থাকতে হয়। অনেকগুলোই পারিবারিক ব্যবসা, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। অনেক পরিবার ও নারীর কাছে চা-ঘর শুধু ব্যবসা নয়—এটি স্থিতিশীলতার উৎস। এটি শেরপাদের তাদের পৈতৃক ভিটার সাথে যুক্ত রাখে, সন্তানদের পড়ালেখার খরচ জোগায় এবং যেখানে অন্য কোনো আয়ের পথ নেই, সেখানে নিয়মিত রোজগারের ব্যবস্থা করে।
পরের গ্রাম রামাইলো দান্ডার চা-ঘরটি ফুর্তেম্বা শেরপার, যিনি পেশায় একজন অবসরপ্রাপ্ত মাউন্টেন গাইড। “আমার বাবা নিজে হাতে এটা তৈরি করেছিলেন,” বললেন তার ছেলে এবং লজ ম্যানেজার ছংবা শেরপা। “আগে এখানে জঙ্গল ছিল। বাবা নিজ হাতে পাহাড় কেটে সমতল জায়গা বানিয়েছিলেন। প্রথমে জায়গাটি ছিল ছোট্ট, মাত্র ছয়জনের। প্রতি বছর একটু একটু করে বাড়িয়েছেন, পাথরের পর পাথর সাজিয়ে।”
ফুর্তেম্বা গাইড হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন বিশ বছর বয়সে। পাঁচবার এভারেস্ট চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করেছেন, দুবার সফল হয়েছেন। অবসরের পর চা-ঘরের ব্যবসায় মনোযোগ দেন—কাজটা যে খুব একটা সহজ ছিল তা নয়। “সবচেয়ে কঠিন ছিল পানির ব্যবস্থা করা,” বললেন ফুর্তেম্বা। “এখানে কোনো প্রাকৃতিক উৎস নেই। উপত্যকার তিন কিলোমিটার উঁচুর কোনো স্থান থেকে পাইপ আনার চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি। শেষে প্রায় ৪৫০ মিটার নিচ থেকে পাম্প করে পাথরের ভেতর দিয়ে পানি আনলাম।” একটু থামলেন, তারপর হাসলেন। “এখন অবশ্য কাজ চলছে। এই মোটামুটি আরকি।”

ফুর্তেম্বার আরও একটি চা-ঘর আছে ট্রেইলের আরও ওপরে, ছাতরা খোলায়—মেরা রিভারসাইড লজ, যা একটি খাড়া পাহাড়ের কিনারে অবস্থিত। এর পাশেই গর্জনশীল নদী আর উপত্যকায় নেমে আসা একটি ঝরনা। সেখানে রান্নাঘরে কাজ করছিলেন রাচানা রাই নামে এক তরুণী—কখনো ডাল নাড়ছেন, আবার কখনো ময়দা মাখছেন। “এখানে ভালো লাগে,” বললেন তিনি। “জায়গাটা শান্ত, কিন্তু নিজেকে একা মনে হয় না। পাহাড়গুলো সঙ্গ দেয়।”
সলুখুম্বুর প্রতিটি বড় ট্রেক শুরু হয় লুকলাগামী ফ্লাইটের মাধ্যমে—পাহাড়ের কিনারে ছোট্ট একটা শহর এটি, যার রানওয়ে এত ছোট আর খাড়া যে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে এটি পরিচিত। সেখান থেকে পথ যায় উত্তর-পূর্বে, প্রায় ১০৩ কিলোমিটার ট্রেকিং করে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের দিকে, অথবা পূর্বে ৬৪ কিলোমিটার দূরের মেরা পিকের (২১,২৪৭ ফুট) দিকে।

মেরার হাই ক্যাম্পে, প্রায় ১৯,০০০ ফুট উচ্চতায়, নেপালের সর্বোচ্চ চা-ঘরটি অবস্থিত। চারদিকে বরফের স্তূপ, কর্নিস আর খাড়া হিমবাহের মাঝে শেরপা রাঁধুনিরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ সেখানে থেকে কাজ করেন, হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায়। “বেশি পাই না—মাসে হয়তো ৩০,০০০ রুপি [প্রায় ২১০ ডলার],” একজন দোভাষীর মাধ্যমে জানালেন সেখানকার এক কর্মী। মূলত টিপসের ওপর নির্ভর করতে হয়। “পর্যটকরা সদয়। কম বেতনেও খুশি থাকি। তারা হেসে ধন্যবাদ জানালেই মনে হয় অনেক পেয়েছি।”
শেরপা জাতির নামটি এসেছে তিব্বতি শব্দ ‘শার’ (পূর্ব) আর ‘পা’ (মানুষ) থেকে। তারা উচ্চতায় সহনশীলতা ও দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিব্বত থেকে দক্ষিণে পাড়ি জমানো যাযাবর পূর্বপুরুষদের উত্তরসূরি হয়ে তারা সলুখুম্বু অঞ্চলে শত শত বছর আগে বসতি গড়েন এবং হিমালয়ান পর্বতারোহণের মেরুদণ্ড হয়ে ওঠেন। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পর্বতারোহীরা এই চূড়াগুলোতে গৌরব অর্জনে আসেন, কিন্তু পথ দেখানো, দড়ি বাঁধা, ট্রেইল তৈরি করা, মালপত্র বহন করা এবং প্রয়োজনে মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার কাজটি করেন এই শেরপারাই। মেরায় আমার অভিযানের সময়েও এমন ঘটনা ঘটেছিল—একজন কোরিয়ান পর্বতারোহী মারা যান, আর একটি শেরপা উদ্ধারকারী দল তার মৃতদেহ খুঁজে পেয়ে পর্বত থেকে নিয়ে আসে।
:::লক্ষণীয় শেরপা সংস্কৃতি বৌদ্ধ ধর্মের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। ট্রেইলের ধারে ধারে দেখা যায় মানি পাথর—যেখানে প্রার্থনা, মন্ত্র বা ধর্মীয় প্রতীক খোদাই করা থাকে; আর স্তূপ—গম্বুজাকৃতির বৌদ্ধ মন্দির। নীল, সাদা, লাল, সবুজ আর হলুদ রঙের প্রার্থনা পতাকা বাতাসে পত্পত্ করে ওড়ে। :::
চা-ঘরের ভেতরে জীবনের ছন্দ ধীর হয়ে আসে: চুলায় কাঠ পোড়ার মটমট শব্দ শোনা যায়, চা টগবগ করে ফোটে, অপরিচিত মানুষেরা সহজেই গল্পে মেতে ওঠে। চা-ঘরের কর্মীদের কাজ নিরলস—রান্না করা, পরিষ্কার করা, অক্সিজেন স্বল্পতার মাঝেও আগুন জ্বালানো—কিন্তু আমি যত মালিকের সাথে কথা বলেছি, তারা কেউ ক্লান্তির কথা বলেননি, বরং গর্বের কথা বলেছেন। “সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসে,” বললেন খোটের হিমালয়ান লজ অ্যান্ড ক্যাফের মালিক লাকপা শেরপা। “আমরা তাদের পরিবারের মতোই দেখি। এটাই আমাদের স্বভাব।”
চূড়ায় ওঠার শেষ সকালে রাত তিনটায় হাই ক্যাম্প থেকে বের হলাম। ভোর হওয়ার সাথে সাথে তুষারশুভ্র ঢালে ভোরের লালচে আলো (অ্যালপেনগ্লো) ছড়িয়ে পড়ল। আমাদের হাঁটার গতি ছিল ধীর ও স্থির। যতই ওপরে উঠছিলাম, সূর্য পর্বতচূড়াগুলোর আড়াল থেকে উঁকি দিল, আর হিমালয়ের বিস্তৃত দৃশ্য চোখের সামনে উন্মোচিত হলো: উত্তরে এভারেস্ট, উত্তর-পূর্বে মাকালু, চারদিকে ঝলমলে চূড়ার সারি, আর অনেক নিচে ফেলে আসা গ্রামগুলোকে বিন্দুর মতো ছোট্ট দেখাচ্ছে।

যাত্রার ২১তম দিনে প্রায় এক ডজন চা-ঘর পেরিয়ে এসেছি, শত শত কথোপকথন হয়েছে, পান করেছি অগণিত কাপ শেরপা চা। লুকলার দিকে ফিরে যেতে যেতে মনে হলো, এই অভিযানটি কতটা নির্ভর করেছিল সেই পরিবারগুলোর ওপর, যারা পথে আমাদের জন্য তাদের দরজা খুলে দিয়েছিল আর হাড় কাঁপানো শীতে উষ্ণতার পরশ যুগিয়েছিল। নেপালের পাহাড়গুলো প্রকৃতির সৃষ্টি হলেও এর ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা সম্ভব হয় মূলত নেপালি মানুষ আর তাদের এই চা-ঘরগুলোর কারণেই।