skip to content
গুলবাহার

ভোগবাদ থেকে মুক্তির খোঁজে

·

• ৩ মিনিট

শোপেনহাওয়ার একবার লিখেছিলেন, “জীবন একটা দোলকের মতো—দুই প্রান্তের মাঝে দুলতে থাকে: অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণা আর তৃপ্তির একঘেয়েমি।”

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু নতুন একটি পণ্যের ব্যাপারে জানাল। সেটা আমাদের দুজনেরই পছন্দের ব্র্যান্ড। পণ্যটির মনোমুগ্ধকর ডিজাইন চোখে পড়তেই ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল—আরেকটি কিনতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমার এটার কোনো দরকার নেই। বর্তমানে যেটা আছে, সেটিও প্রায় ব্যবহার করি না। এর রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলাও পোহাতে চাই না। নতুনটি কিনলেও যে একই পরিণতি হবে, তা নিশ্চিত।

কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। ফেসবুক মার্কেটপ্লেস থেকে একজোড়া বুট কিনলাম। দোকানে গিয়ে আগেই সাইজ দেখে রেখেছিলাম, তারপর মাসের পর মাস ধরে মার্কেটপ্লেসে তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। অবশেষে পেয়েও গেলাম—একদম নতুন, কিন্তু দাম নতুনের চার ভাগের এক ভাগ। আপার ইস্ট সাইডে গিয়ে টাকা দিয়ে বুট জোড়া নিয়ে এলাম।

বাড়িতে এনে কয়েকদিন পরে রাখলাম। কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে পরলাম। কিন্তু মনে হলো কোথাও একটা গরমিল আছে। পায়ের আঙুলের জায়গাটা আরেকটু খোলামেলা হলে ভালো হতো, আর জুতো খোলার ঝামেলাতেও বিরক্তি লাগছিল। যে লুক বা দর্শনের জন্য এতোটা মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেটাও আর চোখে ধরল না। কয়েকদিনের মধ্যেই আবার মার্কেটপ্লেসে বিজ্ঞাপন দিলাম। হাতে পাওয়ার এক সপ্তাহও পার হয়নি, তার আগেই ওটা বিদায় করলাম।

এই ঘটনাটা আমার চোখ খুলে দিয়েছে। আমি এমন এক শহরে বাস করি যেখানে যা খুশি তা পাওয়া খুব সহজ—প্রায় সব ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর আছে, পুরনো জিনিস কেনাবেচার বাজারও জমজমাট। যতোই চেষ্টা করি না কেন, এই শহরের চাকচিক্যের ফাঁদে বারবার পা দিয়েছি। কী শিখলাম? যা চাই ভাবি তা কিনি; কেনার পর দেখি আসলে তা চাই না; তারপর বিক্রি করে দিই—এতে সময় আর টাকার নিদারুণ অপচয় হয়। এরপর মন আবার অন্য কিছুতে আটকে যায়, আর এই চক্র নতুন করে শুরু হয়।

বিষয়টা যে আগে বুঝতাম না, তা নয়। সব সময়ই এ নিয়ে নিজের কাছে অভিযোগ করি। কিন্তু এই শহরে থাকায় চক্রটা এতো দ্রুত ঘুরছে যে, এর অর্থহীনতা এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে জিনিস চাই না সেটা বুঝতে পেরে ছেড়ে দিতে পারছি, নিজেকে চিনতে পারছি—এটা মোটেও খারাপ দিক নয়। তবে যেটা আমাকে বেশি ভাবাচ্ছে তা হলো—কতোটা সময়, শক্তি আর মনোযোগ নষ্ট করছি এমন জিনিসের পেছনে, যা শেষ পর্যন্ত আমি চাই-ই না, এমনকি মালিকানার আনন্দও পাই না। ইশ, যদি এই আকাঙ্ক্ষাগুলো বশ করতে পারতাম! অথবা পড়াশোনা, লেখালেখি বা সংগীতের মতো সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারতাম! এখনো এর কোনো যুতসই সমাধান পাইনি। কিছু কিছু বিষয় সাহায্য করে—যেমন বিজ্ঞাপন এড়ানো বা শখ-সংশ্লিষ্ট ফোরামে আলোচনায় না যাওয়া। কিন্তু বিজ্ঞাপন থেকে তো আর চিরকাল পালানো যায় না। সুন্দর জিনিসের কথা একসময় মাথায় ঢুকেই যায়।

বুট কেনার পর আরেকটি বিষয় খেয়াল করলাম। বাইরে পরতে বা ব্যবহারে কোনো দাগ পড়ে যায় কি না, সেই ভয়ে খুব সাবধানে ব্যবহার করছিলাম। উদ্দেশ্য, যাতে পরে ভালো দামে বিক্রি করা যায়। যদি এমন কোনো জায়গায় থাকতাম যেখানে বিক্রি করার সুযোগ নেই, হয়তো আরও কিছুদিন পরতাম, ব্যবহার করে মানিয়ে নিতাম, তখন হয়তো জিনিসটা ভালোও লাগত। কিন্তু এখানে, এক ক্লিকেই পণ্যটি ছেড়ে দেওয়ার বা বিক্রি করার সুযোগ মাথায় থাকায়, বদলে ফেলার ঝোঁকটা বেশি কাজ করে। বোধহয় একেই ‘নির্বাচনের বিভ্রম’ বা প্যারাডক্স অফ চয়েস বলে।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. ইবন সিনা

    ইবন সিনার জীবনী: বংশপরিচয় থেকে শুরু করে শিক্ষা, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মৃত্যু পর্যন্ত একটি বিস্তৃত অনুসন্ধান।

    ইবন সিনাইসলামি স্বর্ণযুগদর্শন
  2. বিএমআই কি আসলেই আপনার স্বাস্থ্যের সঠিক পরিমাপক?

    বিএমআই অনেক সময় স্বাস্থ্যের ভুল চিত্র তুলে ধরে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন মেদ পরিমাপের জন্য বিএমআই-র বদলে আরও কার্যকর ও নিখুঁত পদ্ধতি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে।

    স্বাস্থ্যবিএমআইওজন
  3. ঠুনকো আকাঙ্ক্ষার ফাঁদে

    আধুনিক জীবনের কৃত্রিম প্রাপ্তি এবং গভীর জীবনবোধের তৃপ্তি ফিরে পাওয়ার উপায় নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ

    জীবনধারামনোবিজ্ঞানপ্রযুক্তি