skip to content
গুলবাহার
একাডেমিক জীবনে একটি ইমেইল ঠিকানার অদৃশ্য গুরুত্ব

একাডেমিক জীবনে একটি ইমেইল ঠিকানার অদৃশ্য গুরুত্ব

·

• ৪ মিনিট

আমি জানতাম আমার চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। আমি বিদেশে একটি পদের চূড়ান্ত ইন্টারভিউ শেষ করেছিলাম। সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। কিন্তু যখন একটি মেসেজ এলো, “আপনার বিশ্ববিদ্যালয় ইমেইল অ্যাকাউন্ট ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে,” তখন অদ্ভুতভাবে হতবিহ্বল লাগছিল।

আমার মতো ক্যারিয়ারের প্রারম্ভিক পর্যায়ে থাকা গবেষকদের জন্য বৈশ্বিক একাডেমিক পরিবেশ কখনো কখনো ভয়ঙ্কর মনে হয়। স্থায়ী পদ এখানে কম। প্রতিযোগিতা তীব্র। আমাদের অনেকেই দেশে দেশে, মহাদেশে মহাদেশে ঘুরে বেড়াই। এক অস্থায়ী পদ থেকে অন্য অস্থায়ী পদে ছুটে যাই। নিজের একটি বৈজ্ঞানিক পরিচয় গড়ার চেষ্টা করি। প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল ঠিকানা হারিয়ে ফেলাটা আমার কাছে নিজের বৈজ্ঞানিক পরিচয়ের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর মতো মনে হয়েছিল।

আমার একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়েছিল চীনে পিএইচডি করার মাধ্যমে। এরপর সৌদি আরবে পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ করেছি। তারপর অস্ট্রেলিয়ায় একের পর এক পদে কাজ করেছি। এর সবই ছিল অনুদানভিত্তিক বা অস্থায়ী। প্রতিটি স্থানান্তর নতুন গবেষণার দিক, বড় সহযোগিতা, বেশি দায়িত্ব এবং ছাত্রদের গভীর সম্পৃক্ততা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু কোনোটিতেই দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ছিল না। কখনো কখনো পথটা উত্তেজনাপূর্ণ মনে হতো। কখনো আবার গভীরভাবে অনিশ্চিত লাগত। পরিবারের জন্যও এই ধারাবাহিক স্থানান্তর বেশ কঠিন ছিল। নতুন শহরে, নতুন সম্প্রদায়ে মানিয়ে নিতে হতো। আর আমাকেও কাজের গতি ধরে রাখতে হতো।

২০২১ সালে সর্বশেষ পদে যোগ দেওয়ার সময় আমি নিজেকে প্রমাণ করতে উৎসুক ছিলাম। চুক্তিভিত্তিক ফ্যাকাল্টি পদে নিয়োগ পেয়েছিলাম। একটি ছোট গবেষণা দল পরিচালনার দায়িত্ব আমার কাঁধে ছিল। স্বাধীন গবেষণা কর্মসূচি গড়ে তুলতে হতো। দিনগুলো কেটে যেত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সমস্যা সমাধানে, গবেষণাপত্র লিখতে, অনুদানের প্রস্তাব তৈরিতে এবং প্রথম ছাত্রদের পরামর্শ দেওয়ার কাজে। সময়ের ব্যবধানে আমি সহযোগিতা গড়ে তুলতে শুরু করেছিলাম। আর প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল হয়ে উঠেছিল এই সম্পর্ক গড়ার মূল মাধ্যম।

সেই ঠিকানা দিয়েই গবেষণাপত্র জমা দিয়েছিলাম। প্রকল্প সমন্বয় করেছিলাম। পেপার রিভিউ করেছিলাম। ছাত্রদের রাতের বেলার প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছিলাম। তারা তখন তাদের প্রথম উচ্চাভিলাষী ধারণাগুলো পরীক্ষা করছিল। সম্ভাব্য পিএইচডি ছাত্রদের মেসেজ আসত সেখানে। তাদের কেউ কেউ পরে আমার দলে যোগ দিয়েছিল। আমার বৈজ্ঞানিক জীবন সেখানে জমা হচ্ছিল। একটু একটু করে।

গত বছরের শেষ দিকে যখন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলল, তখন আমি স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। ছাত্র ও গবেষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন পদ খোঁজায় সাহায্য করলাম। তবু অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয়করণের নোটিশটা একটা দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো লাগল। আমি এত দ্রুত এসবের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

সবকিছু ব্যক্তিগত এবং পূর্ববর্তী পেশাদারি ঠিকানায় সরিয়ে নিতে হুড়োহুড়ি শুরু করলাম। নতুন অ্যাক্সেস না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলল। অবশ্যই এই প্রক্রিয়ায় কিছু কিছু জিনিস বাদ পড়ে গেল। একটি বিশেষ সংখ্যায় অবদান রাখার আমন্ত্রণ প্রায় মিস করে গিয়েছিলাম। কয়েকটি গবেষণাপত্র রিভিউয়ের অনুরোধ লক্ষ্য করিনি। জমা দেওয়ার পোর্টালে এসে সেগুলো কাকতালীয়ভাবে দেখেছি। এক সাবেক সহকর্মীর রেফারেন্স লেটারের অনুরোধ দেরিতে দেখেছি। কিছু সহযোগীর মেসেজ আমার কাছে কখনোই পৌঁছায়নি। এক সাবেক ছাত্রী জরুরিভাবে তাঁর গবেষণাপত্র নিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে খুঁজে বের করেন।

প্রতিটি বিঘ্ন আমাকে মনে করিয়ে দিল, একাডেমিক জীবন কতটা নির্ভর করে শুধু যোগাযোগে যুক্ত থাকার ওপর। সাধারণ ঠিকানা থেকে মেইল লেখাটা অন্যরকম লাগত। মনে হতো আমার পেশাদার মর্যাদা যেন কমে গেছে। ন্যায্য বা অন্যায্য যাই হোক না কেন, একটি প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল ঠিকানা এক ধরনের অন্তর্ভুক্তি বোঝায়। এটি একটি বিভাগের, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং একটি বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার প্রতীক।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায়শই আজীবন শিক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কথা বলে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আমি দেখেছি, এই মূল্যবোধগুলো সবচেয়ে ছোট বিষয়ে প্রসারিত হলে তা কতটা অর্থবহ হয়। বেশ কয়েক বছর আগে প্রথম পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ শেষ করার পর আশা করেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় আইডি কার্ড বন্ধ হয়ে গেলেই হয়তো ইমেইল অ্যাক্সেস চলে যাবে। কিন্তু এর পরিবর্তে তা বছরের পর বছর সক্রিয় ছিল। মাঝে মাঝে পূর্ববর্তী সহকর্মীরা ছুটির দিনের শুভেচ্ছা পাঠাতেন। ভালো খবরগুলো শেয়ার করতেন। পাঠকরা সেই ইমেইলের সাথে যুক্ত প্রকাশনা নিয়ে প্রশ্ন লিখে পাঠাতেন। সেই মেসেজগুলো আমাকে মনে করিয়ে দিত যে, চুক্তি শেষ হয়ে গেলেও এই সম্প্রদায়ে আমার স্থান শেষ হয়ে যায়নি।

গবেষকদের চাকরি শেষ হওয়ার পর কমপক্ষে ৬ মাস তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক ইমেইল ঠিকানা রাখার অনুমতি দিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের মতো অনিশ্চিত প্রারম্ভিক পর্যায়ের একাডেমিক ক্যারিয়ারের মানুষদের আরও ভালোভাবে সহায়তা করতে পারবে।

আমি এখন চীনে একটি টেনিউর-ট্র্যাক পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই এই মুহূর্তে একাডেমিক কাজের জন্য ব্যক্তিগত এবং পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে নতুন একটি পেশাদারি ইমেইলের মাধ্যমে আবারও নতুন সম্পর্ক গড়ার অপেক্ষায় আছি। আসলে গবেষক হিসেবে আমাদের প্রতিনিয়তই কোথাও না কোথাও নিজেদের জন্য একটু জায়গা তৈরি করে নিতে হয়; আর বারবার সেই একই কাজ নতুন করে করতে হয়।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আপনার কতটা চিন্তা করা উচিত?

    মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ভাইরাল হওয়া ভয়াবহ দাবিগুলোর পেছনের সত্যি কী? বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে জানুন আসলে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া প্রয়োজন।

    স্বাস্থ্যপরিবেশবিজ্ঞান
  2. ইতিহাসের পাতায় ব্ল্যাক ডেথ: একটি মহামারির অবসান

    মধ্যযুগের ভয়াবহ ব্ল্যাক ডেথ মহামারি নিয়ন্ত্রণে কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক পরিবর্তন এবং জৈবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল তা জানুন।

    ইতিহাসস্বাস্থ্যমহামারি
  3. সবকিছু বদলে যাচ্ছে, কিছুই বদলাচ্ছে না

    এআইয়ের যুগে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিবর্তন এবং অপরিবর্তিত মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে একজন ইঞ্জিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ।

    সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাক্যারিয়ার