skip to content
গুলবাহার

সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হলে নিজের কাজ নিয়ে এতটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে কিছুটা অপরাধবোধ কাজ করে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এখন কঠিন সময় যাচ্ছে। ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে যে কাজটা অনেকটাই চাপমুক্ত ছিল, এখন সেটা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিবর্তনে যারা বিচলিত হয়ে পড়েছেন, তাদের প্রতি আমার পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে। কাজ নিয়ে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। তারপরও, সবকিছুর শেষে কাজ করতে আমার ভালোই লাগে।

নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া, জটিল বাগ (Bug) খুঁজে বের করা, কোড লেখা—এর সবকিছুই আমার কাছে উপভোগ্য। কম্পিউটারের সামনে বসে সময় কাটাতেও ভালো লাগে। তবে সবচেয়ে বেশি যে ব্যাপারটা ভালো লাগে, তা হলো অন্যের ‘কাজে লাগা’ বা উপকারে আসা।

নিকোলাই গোগোলের ছোটগল্প ‘দ্য ওভারকোট’-এর প্রধান চরিত্র আকাকি আকাকিয়েভিচ। তার চাকরিজীবন বেশ নির্মম—আর্থিকভাবে ভবিষ্যৎহীন এক কপিস্টের কাজ, সহকর্মীদের কাছেও নেই কোনো সম্মান। তবু তিনি নিজের কাজকে এতটাই ভালোবাসেন যে, বাড়ি ফেরার পর কোনো কাজ না থাকলে নিছক আত্মতৃপ্তির জন্যই কপি করতে বসে যান। মানুষ হিসেবে আকাকি অনেকটা অকর্মণ্য। কিন্তু তার এই অকর্মণ্যতাই তাকে ওই চাকরির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত করে তুলেছে।

কোনো সমস্যা দেখলে তার সমাধান না করে আমি থাকতে পারি না। বিশেষ করে যখন দেখি আমিই একমাত্র ব্যক্তি বা সেই গুটিকয়েক মানুষের একজন, যে কি না এর সমাধান করতে পারবে, অথবা কেউ যখন সাহায্য চায়—তখন সমাধান না করা পর্যন্ত আমার ভেতরে একধরনের শারীরিক অস্বস্তি কাজ করে। আর সমাধান করে দেওয়ার পর যে তৃপ্তি মেলে, তার কোনো তুলনা হয় না। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার—বিশেষ করে স্টাফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিদিন অনেককে প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য আমার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই ব্যাপারটা আমার ব্যক্তিগত প্রবণতার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

অর্থাৎ, আকাকি আকাকিয়েভিচের মতোই আমি চাকরির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাই না। কারণ ব্যাপারটা আমার নিজের মানসিকতার—বিশেষ করে অন্যের কাজে লাগার যে আসক্তি—তার সঙ্গে মিলে যায়। অবশ্য, আকাকির চেয়ে আমার কর্মপরিবেশ অনেক ভালো হওয়ায় আমি একটা বাড়তি সুবিধাও পাই। আমার অবস্থা অনেকটা কাজের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কুকুরের (Working dog) মতো। কুকুর কাজের জন্য পুরস্কার পায় ঠিকই, কিন্তু সে পুরস্কারের আশায় কাজ করে না। কাজটা নিজেই তার কাছে তৃপ্তিদায়ক, আর সে কারণেই সে কাজ করে।

সব সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। তবে অনেককেই দেখেছি—কাজে লাগার আসক্তি না থাকলেও ধাঁধা সমাধানের নেশা, অথবা সফটওয়্যার বা গণিতের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের যে আনন্দ, তার প্রতি আসক্তি তাদের চালিত করে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার না হলে এরা হয়তো ‘ফ্যাক্টোরিও’ (Factorio) গেম নিয়ে মেতে থাকতেন, কিংবা ক্রসওয়ার্ড মেলাতেন, অথবা কোনো ইন্টারনেট কমিউনিটির অ্যাডমিন হিসেবে কঠোরভাবে নিয়মকানুন প্রয়োগ করে যেতেন।

কর্মজীবন নিয়ে আমি যে পরামর্শগুলো দিই, তার বেশিরভাগই মূলত নিজের ‘কাজে লাগার’ চাহিদাকে কীভাবে বাস্তব সুবিধায় রূপান্তরিত করেছি এবং এই চাহিদার নেতিবাচক ফাঁদ এড়াতে আমি কী কী করি—সেসবের গল্প। উদাহরণস্বরূপ, ‘বড় প্রযুক্তি কোম্পানিতে সময়খেকোদের হাত থেকে বাঁচানো’ শিরোনামের লেখাটিতে আমি তুলে ধরেছি, কীভাবে কিছু মানুষ আমার মতো লোকদের চিনে নিয়ে নিজেদের স্বার্থে শোষণ করে। আবার ‘জিরা (Jira) টিকিট শেষ করাই কৌশল বা প্রভাব বিস্তারের পথ নয়’ লেখাটি বোঝায় যে, শুধু টিকিট কিউ (Queue) কমালেই হবে না, ম্যানেজমেন্টের কাছেও নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তুলতে হবে। ‘যাদের সম্মান করি না, তাদের কাছে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা’ লেখাটি মূলত সেই রূঢ় বাস্তবতার মোকাবিলা নিয়ে—যাদের আমরা পছন্দ করি না বা সম্মান করি না, তাদের কাছেও দরকারী হয়ে ওঠার যে মানসিক তাগিদ, সেটি নিয়ে।

ইন্টারনেটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কোন বিষয়টি অনুপ্রাণিত করে—তা নিয়ে অনেক আলোচনাই হয়। অর্থ ও ক্ষমতা, প্রকৃত ভ্যালু বা মান তৈরি করা, এআই (AI)-এর আগমন—ইত্যাদি নানা কথা শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ ইঞ্জিনিয়ারকেই চালিত করে ভেতর থেকে আসা একধরনের তাগিদ বা নেশা। আপনিও যদি এই দলে থাকেন—এবং আমার ধারণা বেশিরভাগই আছেন—তবে নিজের ভেতরের এই তাগিদকে কীভাবে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বের করে নেওয়াটা জরুরি।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. সবকিছু বদলে যাচ্ছে, কিছুই বদলাচ্ছে না

    এআইয়ের যুগে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরিবর্তন এবং অপরিবর্তিত মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে একজন ইঞ্জিনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ।

    সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাক্যারিয়ার
  2. ইঞ্জিনিয়ারিং নোটবুক: সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের অজানা অস্ত্র

    হাতে লেখা ইঞ্জিনিয়ারিং নোটবুক ব্যবহার করে কীভাবে কাজের দক্ষতা বাড়ানো যায়। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ।

    প্রযুক্তিসফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংপ্রোডাক্টিভিটি
  3. চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ

    চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প

    এআইমানসিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি