skip to content
গুলবাহার

১৯৩০-এর দশকের কথা। দক্ষিণ সুদানের আপার নাইল অঞ্চলে মানবতাত্ত্বিক ই. ই. ইভান্স-প্রিচার্ড এক নুয়ার নারীর সাথে দেখা করেন। তিনি খড়ের ছাউনি দেওয়া একটি ঘরের সামনে বসে ছিলেন। তাঁর সন্তানেরা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। দূরে একজন পুরুষকে গরু চরাতে দেখা যাচ্ছিল। দেখে সাধারণ একটি পরিবার মনে হতে পারে। কিন্তু দূরের সেই পুরুষটি তাঁর স্বামী ছিলেন না। ওই নুয়ার নারী মূলত এক ভূতকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর সন্তানেরা আইনত সেই ভূতেরই সন্তান ছিল।

নুয়ারদের মধ্যে কোনো পুরুষ যদি উত্তরাধিকার ছাড়া মারা যান, তবে আত্মীয়রা তাঁর জন্য একজন স্ত্রী খুঁজে নেন। মৃত ব্যক্তির নাম যেন বেঁচে থাকে, সে জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, তা না হলে সেই ব্যক্তির ভূত অশান্ত হয়ে উঠবে এবং অসুস্থতা ডেকে আনবে। নুয়াররা বলেন, মৃত ব্যক্তির ভূত এটা ভাবতে পছন্দ করে যে লোকজন তাঁর সন্তানের পরিচয় জানতে চাইছে এবং উত্তরে তাঁর নামই শুনছে। এভাবেই তাঁর নাম মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে।

বেশ কয়েক বছর নুয়ারদের সাথে থেকে ইভান্স-প্রিচার্ড লক্ষ্য করেছিলেন জীবিতদের বিয়ের মতোই ভূতের সাথে বিয়েও সেখানে বেশ সাধারণ একটি ঘটনা ছিল। যুদ্ধ ও রোগব্যাধি প্রায়ই যুবকদের বাবা হওয়ার আগেই কেড়ে নিত। কখনো কখনো শৈশবেই ছেলেদের মৃত্যু হতো। এমন পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির কোনো ভাই, ছেলে বা ভাতিজা সেই ভূতের নামে বিয়ে করতেন। এটাকে তাঁরা “মৃতের আগুন জ্বালানো” বলতেন। সাধারণ বিয়ের মতোই এক্ষেত্রে কনের পরিবারকে গরু দেওয়া হতো। তবে একটি মূল পার্থক্য ছিল। এই বিয়ে থেকে জন্ম নেওয়া সন্তানেরা আইনত ওই ভূতেরই সন্তান হিসেবে পরিচিত হতো এবং তাঁর নাম বহন করত। মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় থাকা গরুগুলো তারাই উত্তরাধিকার সূত্রে পেত। বড় হলে এই সন্তানেরাই ভূত বাবার আচার-অনুষ্ঠান পালনের অধিকার লাভ করত।

এই ব্যবস্থা এক অদ্ভুত চক্র তৈরি করত। যে পুরুষ ভূতের নামে বিয়ে করতেন, তিনি মূলত স্ত্রী ও সন্তান পেতেন। তাই ওই পরিবারের গরু দিয়ে তাঁর ছোট ভাইদের বিয়ে দেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে জীবিত স্বামী নিজের আনুষ্ঠানিক বিয়ের আগেই মারা যেতেন। তখন আত্মীয়রা তাঁর জন্যও মৃত্যুর পর একজন স্ত্রী খুঁজে নিতেন। এভাবেই একটি ভূত বিয়ে থেকে আরেকটি ভূত বিয়ের জন্ম হতো।

নুয়ারদের এই উদাহরণ বিবাহ প্রথার বিশাল বৈচিত্র্যের একটি ছোট নমুনা মাত্র। দীর্ঘকাল ধরে এই জটিলতা পশ্চিমাদের চোখে পড়েনি। উত্তর-পশ্চিম ইউরোপীয়রা মনে করত তাদের পদ্ধতিই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাদের কাছে বিয়ে মানেই জীবনভর একগামী সম্পর্ক, ধর্মের আশীর্বাদ, একক পরিবার এবং পুরুষ উপার্জনকারী। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে মানবতাত্ত্বিকরা বিদেশি বিভিন্ন প্রথা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁদের এই কাজ প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল।

মার্গারেট মিডের ১৯২৮ সালের বই ‘কামিং অব এজ ইন সামোয়া’ এমন একটি সমাজের চিত্র তুলে ধরে। সেখানে প্রেমকে কেবল চমৎকার সময় কাটানোর উপায় হিসেবে দেখা হতো। যুবতীরা যত দিন সম্ভব বিয়ে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। তাঁরা কেবল সাময়িক সম্পর্কে জড়াতেন। একই সময়ে ব্রোনিস্লাও মালিনোভস্কির ১৯২৯ সালের ‘দ্য সেক্সুয়াল লাইফ অব স্যাভেজেস ইন নর্থ-ওয়েস্টার্ন মেলানেশিয়া’ বইয়ে ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপবাসীদের পরীক্ষামূলক বিবাহের কথা বলা হয়। সেখানে যুগলরা অবিবাহিতদের ঘরে কয়েক বছর একসাথে থাকতেন। সম্পর্ক ভালো চললে তাঁদের বিয়ে হতো। আর বনিবনা না হলে সহজেই আলাদা হয়ে যেতেন। এটি অনেকটা আজকের দিনের ডেটিংয়ের মতোই ছিল।

জর্জ মারডক এবং ডগলাস আর হোয়াইট এই গবেষণাকে আরও সুসংগঠিত করেন। ১৯৬৭ সালে তাঁরা ‘এথনোগ্রাফিক অ্যাটলাস’ প্রকাশ করেন। সেখানে ১২০০-এর বেশি সংস্কৃতির তথ্য লিপিবদ্ধ ছিল। দুই বছর পর তাঁরা একটি আদর্শ ক্রস-কালচারাল নমুনা তৈরি করেন। এর জন্য ভৌগোলিকভাবে ছড়ানো এবং সাংস্কৃতিকভাবে স্বাধীন ১৮৬টি সমাজ বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্যে মাত্র ৩১টি সমাজ ছিল একগামী। অন্যদিকে ১৫৩টি সমাজ ছিল বহুবিবাহী, যেখানে এক পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকত। মাত্র ২টি সমাজ ছিল বহুপত্নীবাদী, যেখানে এক নারীর একাধিক স্বামী থাকত।

কোথাও বিবাহ মূলত ধর্ম বা রাষ্ট্র দ্বারা পবিত্র বলে স্বীকৃত। আবার কোথাও দুজন একসাথে থাকা শুরু করলেই তা বিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। কোনো সমাজে মানুষ নিজের সঙ্গী বেছে নেয়, আবার কোথাও বাধ্য করা হয়। কোনো সমাজ একগামীতাকে মূল্য দেয়, আবার কোনো সমাজ বহুবিবাহকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু এর কোনোটাই বিশ্বস্ততার শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না। কোথাও নারী ও পুরুষ উভয়ই স্বাধীনভাবে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহ করতে পারেন। আবার কোথাও কেবল পুরুষদেরই এই অধিকার দেওয়া হয়।

প্রাণীজগতের সাথে তুলনা করলে মানুষের বিবাহ প্রথাকে আরও বেমানান মনে হয়। আমরা সেই অল্প সংখ্যক প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত, যারা দীর্ঘ সময়ের জন্য জোড়া বাঁধে। পাখিরাও আমাদের মতো এই আচরণ করে। কিন্তু স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মাত্র নয় শতাংশ এমন দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে। বেশিরভাগ প্রাণীর সম্পর্ক কেবল সঙ্গমের সময়কাল পর্যন্তই স্থায়ী হয়।

কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা আরও অদ্ভুত। আমরাই একমাত্র প্রাণী যাদের বিবাহের সিদ্ধান্তে তৃতীয় পক্ষ নিয়মিত হস্তক্ষেপ করে। মা-বাবা, ভাইবোন কিংবা বড় পরিবার প্রায়ই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বা তাতে বাধা দেয়। কোনো সমাজে জন্মের সাথে সাথেই শিশুর বিয়ে ঠিক করে দেওয়া হয়। আবার কোনো সমাজে দীর্ঘ পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। কোথাও কোথাও ছেলেমেয়েদের আলাদা রাখা হয়, যাতে বিয়ের আগে তারা একে অপরের সংস্পর্শে আসতে না পারে।

নারীদের আলাদা রাখার বিষয়টি বেশ পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার পর্দা প্রথা এর একটি বড় উদাহরণ। এটি নির্দিষ্ট পোশাক পরা থেকে শুরু করে প্রায় সম্পূর্ণ গৃহবন্দীত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তবে পুরুষদের বিচ্ছিন্ন করে রাখার প্রথা তুলনামূলক কম পরিচিত। পাপুয়া নিউ গিনির এঙ্গা সমাজে ছয় বছর বয়সী ছেলেদের পুরুষদের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। সেখানে তারা ব্যাচেলর কাল্টে যোগ দিত এবং শৃঙ্খলা শিখত। নিজেকে প্রমাণ করার পরই কেবল তাদের বিয়ের অনুমতি মিলত। শেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুধু কুমারী ছেলেরাই অংশ নিতে পারত। জলপ্রপাতের নিচে খোলা চোখে শুয়ে থাকার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো। তারা বিশ্বাস করত, এর ফলে কোনো নারীর গোপনাঙ্গ দেখার পাপ ধুয়ে যায়। এ সময় মেয়েরা কাছেই দাঁড়িয়ে গান গাইত। গানে গানে তারা ছেলেদের উপহাস করে বলত, তারা এই ঝর্ণার উপরে প্রস্রাব করেছে এবং ছেলেরা সেখানে চোখ শুদ্ধ করছে।

উপহাস, শিক্ষা বা বাধ্য করার এই পদ্ধতিগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। বিবাহ কখনোই কেবল ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপার নয়। এর সাথে পরিবার এবং সম্প্রদায়ের গভীর স্বার্থ জড়িত থাকে। বারবার এটি একই মৌলিক উদ্দেশ্যে কাজ করে এসেছে। আর তা হলো সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জোট গঠন।

তাহলে একেক সমাজে বিয়ের কৌশল এত ভিন্ন কেন?

বিবর্তনীয় মানবতাত্ত্বিকদের মতে এর উত্তর চার্লস ডারউইনের তত্ত্বে লুকিয়ে আছে। মানুষ স্বভাবতই তাদের বংশধরের সংখ্যা বাড়াতে চায়। পরিবেশ বদলে গেলে টিকে থাকার সেরা উপায়ও বদলে যায়। প্রায়শই একজনের জন্য যা সেরা, তা অন্যের জন্য সেরা নাও হতে পারে। এই মতপার্থক্য থেকেই নারী-পুরুষ, পরিবার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়।

হোমো স্যাপিয়েন্স হিসেবে আমাদের ইতিহাসের প্রায় ৯৫ শতাংশ সময় আমরা শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে বেঁচে ছিলাম। প্রায় ২৮০,০০০ বছর ধরে চলা এই জীবনধারার কিছু গোষ্ঠী আজও টিকে আছে। তবে হাজার বছরের পুরনো এই জীবনের শেষ প্রতিধ্বনি হয়তো খুব শীঘ্রই মিলিয়ে যাবে।

কঙ্গোর রেইনফরেস্টের গভীরে বসবাসকারী বায়াকারা তেমনই একটি গোষ্ঠী। মানবতাত্ত্বিক হানিউল জ্যাং দশ বছরের বেশি সময় ধরে তাদের সাথে কাজ করেছেন। তিনি বায়াকাদের বিয়ের ধরন অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। সেখানে একজন কিশোর ও কিশোরী প্রেমে পড়লে তারা সোজা বনে চলে যায়। কয়েকদিন পর ফিরে এসে তারা একটি ঘর বানায়। সেখানে কোনো অনুষ্ঠান বা শপথ গ্রহণ হয় না। শুধু পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই তারা একসাথে থাকতে শুরু করে। জ্যাংয়ের মতে, এর মধ্যে এক ধরনের দারুণ রোমান্টিকতা রয়েছে।

এরপর যুবকটি বিয়ের সেবা হিসেবে এক বছর তার প্রেমিকার পরিবারের সাথে থাকে। এ সময় সে শ্বশুরের সাথে শিকার করে এবং মধু সংগ্রহ করে। তবে তাদের এই সম্পর্ক ভেঙেও যেতে পারে। এমনকি ছোট সন্তান থাকলেও বিচ্ছেদ হওয়া সম্ভব। ঠিক যেভাবে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, শেষটাও সেভাবেই হয়। একজন বনে চলে যায় এবং পরে অন্য কারও সাথে নতুন ঘর বানায়।

এই নমনীয়তা কেবল বায়াকাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত শিকারি-সংগ্রাহক সমাজগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এই দলগুলো প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করে এবং সমাজ বেশ সমতাভিত্তিক হয়। শিকারের মাংস দ্রুত সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয় এবং তাদের জমানো কোনো ভৌত সম্পদ থাকে না। বাবারা সন্তানদের দেখাশোনা করলেও তাঁরা কখনোই প্রাথমিক যত্নদাতা নন। ৪৫টির বেশি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সন্তানের বেঁচে থাকার পেছনে বাবাদের প্রভাব আশ্চর্যজনকভাবে কম। বরং দাদি ও ভাইবোনের মতো অন্যান্য সাহায্যকারীরা মায়ের জন্য অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

মারডকের এথনোগ্রাফিক অ্যাটলাসে বেশিরভাগ শিকারি-সংগ্রাহককে বহুবিবাহী হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। জমানো কোনো সম্পদ না থাকায় বেশিরভাগ পুরুষই একের বেশি স্ত্রী পোষণ করতে পারেন না। সেখানে বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহ প্রায়ই ঘটে। কারণ একটি বড় সহায়ক পরিবার নারীদের নিরাপত্তা দেয়, ফলে তাঁদের একা সন্তান লালন করতে হয় না। উত্তরাধিকারের কোনো সম্পদ না থাকায় একাধিক সঙ্গীর সন্তান নিয়েও কোনো সংঘাত তৈরি হয় না। প্রতিনিয়ত বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে যে কেউ চাইলে সহজেই একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে সেখানকার নারীরা প্রায়শই জীবনে দুই বা তিনজন পুরুষের সাথে সন্তান নেন।

প্রায় ১২,০০০ বছর আগে কৃষিকাজের আবির্ভাব মানবসমাজের প্রায় সবকিছু বদলে দেয়। এর প্রভাব পড়ে বিবাহ প্রথার ওপরও। পশুপালন এবং ফসল রক্ষা করা মানুষের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। মানুষের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ানো কমে যায়। ইতিহাসের পাতায় প্রথমবারের মতো মানুষ সম্পদ জমা করতে শুরু করে এবং সমাজে বৈষম্যের উদ্ভব হয়।

উত্তর কেনিয়ার শুষ্ক অঞ্চলে এখনো কয়েকটি গোষ্ঠী গরু বা উট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ১৯৪৮ সালে ইমানা নামের এক তুর্কানা পুরুষের চারজন স্ত্রী ছিলেন। তাঁরা সবাই একসাথে বসবাস করতেন এবং তাঁদের ১৩ জন সন্তান ছিল। ইমানার পালের গরুর সংখ্যা ছিল শতাধিক। এত গরু থাকায় তাঁর পক্ষে একাধিক সংসার চালানো সম্ভব হয়েছিল। অন্যদিকে তাঁর এক প্রতিবেশীর মাত্র দশটি গরু ছিল। তাই তাঁকে একজন স্ত্রী এবং কম সন্তান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল।

সম্পদের আগমন কীভাবে বিবাহ প্রথাকে নতুন রূপ দেয়, তা সহজেই বোঝা যায়। গরু বাড়লে বউও বাড়ে। কিন্তু এই পরিবর্তনের একটি কম স্পষ্ট দিক হলো, এটি নারীদের পছন্দের ওপরও প্রভাব ফেলে। বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষরা সবসময়ই একাধিক স্ত্রী পেয়ে লাভবান হয়। পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতার কোনো সীমা নেই, কিন্তু নারীদের তা আছে। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের সামনে সাধারণত দুটি পথ খোলা থাকে। ধনী পশুপালকের দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হওয়া, অথবা কোনো দরিদ্র পুরুষের প্রথম স্ত্রী হওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম বিকল্পটি নারীদের জন্য বেশি লাভজনক হতে পারে।

চরম পরিস্থিতিতে কিছু পুরুষ এত শক্তিশালী ও ধনী হয়ে ওঠেন যে তাঁরা দশজন নয়, শতাধিক স্ত্রী রাখতে পারেন। আজান্দেরা গবদোয়ে নামের এক কিংবদন্তি রাজার গল্প বলেন। একবার তিনি তাঁর প্রদেশে হাঁটতে গিয়ে এক সুন্দরীকে দেখে তাকে স্ত্রী করতে চান। তিনি থেমে পরিচয় জানতে চাইলে জানতে পারেন, মেয়েটি আগে থেকেই তাঁর একজন স্ত্রী।

পুরুষদের লাভের কথা বিবেচনা করলে এটা পরিষ্কার যে সব বহুবিবাহ নারীরা স্বাধীনভাবে বেছে নেন না। মালির ডোগনদের বহুবিবাহী পরিবারগুলোতে শিশুমৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এতে বোঝা যায় যে নারীদের অনেক সময় এমন বিয়েতে বাধ্য করা হয়। তবে উত্তর তানজানিয়ায় বহুবিবাহী বাবাদের সন্তানেরা বেশ ধনী এবং স্বাস্থ্যবান হয়। সমাজে যখন কিছু পুরুষের অনেক স্ত্রী থাকে, তখন নারীরা এক ধরনের সীমিত সম্পদে পরিণত হন। তখন পুরুষদের প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। কন্যারা তাদের মা-বাবার কাছে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হয়ে ওঠে। তখন তাঁরা মেয়ের বিয়ের জন্য যৌতুক দাবি করতে পারেন, যা কয়েকটি গরু থেকে শুরু করে ছোটখাটো সম্পদ পর্যন্ত হতে পারে। কিছু পুরুষকে এই যৌতুক মেটাতে বড় পারিবারিক নেটওয়ার্কের সাহায্য নিতে হয় এবং বছরের পর বছর ধরে কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হয়। ঔপনিবেশিক সময়ে তানজানিয়ার চাগ্গাদের মধ্যে বিয়ের এই সম্পদকে একটি নির্দিষ্ট মানে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন বিয়ের সম্পদ হিসেবে ৬২টি বিয়ারের পাত্র ও ৪টি জবাই করা ছাগল দেওয়ার নিয়ম করা হয়। এর সাথে ৩টি জীবন্ত ছাগল, ১৫টি দুধের কলসি এবং অর্ধেক গরু দিতে হতো। এটি ছিল কেবল অগ্রিম জমা, বিয়ের পর আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হতো। গরু ও ছাগল কনের বাবাকে দেওয়া হতো। এছাড়া মা, মামা, নানি ও ভাইদের জন্য আরও পশু ও বিয়ার দিতে হতো। ছেলেদের মধ্যে বিবাদ এড়াতে কখনো কখনো বাবারা প্রত্যেক ছেলের জন্য একজন বোন বরাদ্দ করে দিতেন। সেই বোনের বিয়ের সম্পদ দিয়েই ভাইয়ের বিয়ে দেওয়া হতো।

বহুবিবাহের দ্বিতীয় বড় পরিণতি হলো, সম্পদ ধীরে ধীরে সন্তানদের হাতে চলে যায়। ছেলেরা উত্তরাধিকার সূত্রে সেই সম্পদ পেয়ে আরও স্ত্রী কিনতে পারে এবং বংশবৃদ্ধি করতে পারে। কিন্তু মেয়েরা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি সন্তান জন্ম দিতে পারে না। তাই যেখানেই গরু বা পশুপালনের প্রথা গৃহীত হয়েছে, সেখানেই বহুবিবাহ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কালক্রমে মাতৃসূত্রীয় পরিবারের জায়গা দখল করেছে পিতৃসূত্রীয় পরিবার।

এই ধরনের বিবাহ ব্যবস্থায় বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহ তুলনামূলকভাবে কম ঘটে। কারণ বিচ্ছেদ হলে মা-বাবাকে বিয়ের সম্পদ ফেরত দিতে হয়। আর যখন সন্তানেরা উত্তরাধিকার পায়, তখন বাবারা নিশ্চিত হতে চান যে সন্তানটি তাঁরই। এই কারণে সমাজগুলো নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করার নানা উপায় আবিষ্কার করে। মালির ডোগনদের উদাহরণ নেওয়া যাক। তাদের সমাজে ঋতুস্রাবের জন্য আলাদা ঘর আছে, যেখানে নারীদের নির্দিষ্ট সময়ে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। এই ব্যবস্থা পুরুষ ও সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেয় যে ওই নারী কখন উর্বর। এরপর যদি তাঁর সাথে স্বামীর দেখা না হয় কিন্তু তিনি গর্ভবতী হন, তবে স্বামী সহজেই বুঝতে পারেন যে সন্তানটি তাঁর নয়। অদ্ভুত হলেও এই ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। ডোগনদের মধ্যে মূলত তিনটি ধর্ম প্রচলিত আছে। এগুলো হলো খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম এবং আদিবাসী ডোগন বিশ্বাস। আদিবাসী বিশ্বাসে ঋতুস্রাবের ঘর ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। বাবা ও ছেলেদের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সমাজে অপিতৃত্ব বা পিতৃপরিচয়হীন সন্তানের হার এমনিতেই কম। তবে যারা এই ঘর ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার আরও কম। খ্রিস্টানদের মধ্যে এই হার কিছুটা বেশি, কারণ তাদের নারীদের ঋতুস্রাবের কথা জানানো বাধ্যতামূলক নয়। মুসলমানদের ক্ষেত্রে হারটি ডোগন ধর্মের মতোই। কারণ তাদেরও ঋতুস্রাবের বিষয়টি ঘোষণা করতে হয় এবং ওই সময়ে নামাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। এটি মূলত উর্বরতার একটি স্পষ্ট সংকেত হিসেবে কাজ করে।

এই নিয়ন্ত্রণ বিবাহিত এবং অবিবাহিত উভয় নারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অবিবাহিত ডোগন মেয়েরাও ঋতুস্রাবের ঘর ব্যবহার করে। এর ফলে অজান্তেই গর্ভবতী কাউকে বিয়ে করার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। একসাথে থাকার কারণে মেয়েদের এই নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠানে সহজেই অভ্যস্ত করা হয়।

বাধ্য এবং পবিত্র কন্যাদের জন্য মা-বাবারা বেশি বিয়ের সম্পদ দাবি করতে পারেন। কিছু পণ্ডিত মনে করেন, উপ-সাহারান আফ্রিকায় প্রচলিত নারী যৌনাঙ্গ কর্তনের প্রথা কুমারীত্বের সংকেত হিসেবে কাজ করে। ভালো বিয়ের শর্ত নিশ্চিত করতেই এটি করা হয়। তবে এর প্রমাণ বেশ মিশ্র। যাদের যৌনাঙ্গ কাটা হয়েছে, তারা সবসময় বেশি বিয়ের সম্পদ পায় না। কিন্তু তারা তাদের না-কাটা সহপাঠীদের তুলনায় একাধিক যৌন সঙ্গীর কথা অনেক কম স্বীকার করে। এতে বোঝা যায় যে প্রথাটি মূলত তাদের যৌন স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই তৈরি হয়েছে।

একটি সাধারণ নিয়ম হলো, পশুপালক সমাজগুলো অসমতাভিত্তিক হয়। এই বৈষম্য বহুবিবাহকে চালিত করে এবং বহুবিবাহ পুরুষদের দ্বারা নারী নিয়ন্ত্রণকে উসকে দেয়। তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও আছে। নামিবিয়ার হিম্বারা এমনই এক ব্যতিক্রমী গোষ্ঠী। চর্বি ও লাল মাটির প্রলেপে মোড়ানো চুলের জন্য পরিচিত এই পশুপালকদের মধ্যে বহুবিবাহ বেশ সাধারণ। কিন্তু তারা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ শিথিল। অনেক নারীরই বিবাহের বাইরে প্রেমিক থাকে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তান জিনগতভাবে স্বামীর ছিল না। এখানে কোনো প্রতারণা নেই, কারণ হিম্বারা জানে কোন সন্তান কার। তবুও স্বামী তাদের লালনপালন করেন এবং বিয়ের খরচ জোগান। মনে হয় তাঁরা এই বিষয়টি নিয়ে মোটেও মাথা ঘামান না। তাঁরা জানেন যে একই আচরণ তাঁদের নিজেদের ঘরেও চলছে। পুরুষরা চান তাঁদের স্ত্রীরা অনুপস্থিতিতে প্রেমিকদের সময় দিক, তবে তা চোখের সামনে নয়। এক হিম্বা পুরুষ জানিয়েছিলেন, সকালে চা খাওয়ার সময় অন্য কাউকে দেখলে তাঁর কেবল খারাপ লাগে।

হিম্বারা এত ভিন্ন কেন তার পেছনের কারণগুলো বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রথমত, অন্যান্য পশুপালক গোষ্ঠীর তুলনায় তাদের বিয়ের সম্পদ অনেক কম থাকে। সাধারণত এক বা দুটি গরু এবং কিছু ছাগল দিয়েই বিয়ে হয়। দ্বিতীয়ত, তাদের বেশিরভাগ উত্তরাধিকার মাতৃসূত্রীয়। সম্পদ এক পুরুষ থেকে তাঁর বোনের ছেলেদের কাছে হস্তান্তর হয়। সেই রক্তের সম্পর্ক নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকে না। একজন পুরুষ জানেন যে তিনি ও তাঁর বোন একই মায়ের সন্তান। তাই বোনের সন্তানও তাঁর আপন রক্তের। অন্য পুরুষের সন্তানে সামান্য বিনিয়োগ এবং মাতৃসূত্রীয় রক্তরেখার নিশ্চয়তার মতো দুটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো পুরুষদের বিয়েতে উচ্চ অপিতৃত্ব মেনে নিতে সাহায্য করে।

বহুবিবাহ কেবল আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাবের পর কুরআনের আইনে পুরুষদের চার স্ত্রীতে সীমিত করার চেষ্টা করা হয়। এই নির্দিষ্ট সীমা থেকেই বোঝা যায় যে প্রথাটি সে সময় বেশ বিস্তৃত ছিল, অন্তত ধনীদের জন্য। আজও এই একই যুক্তি ভিন্ন রূপে কাজ করে। পাপুয়া নিউ গিনিতে একসময় বড় নামধারী পুরুষরা শুকর ও সামুদ্রিক খোলস ব্যবহার করে একাধিক স্ত্রী পেতেন। কিন্তু খনিজ উত্তোলনের উত্থানের ফলে সম্পদের ধরন বদলে গেছে। আজ সেখানে কালো কাঁচের গাড়ি থাকা পুরুষরাই একাধিক নারীকে আকর্ষণ করেন। পশুপালকদের মতোই কখনো কখনো একজন ধনী পুরুষের দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়া, দরিদ্র কারও প্রথম স্ত্রী হওয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক হয়।

তাহলে ইউরোপ এবং এশিয়ার বিশাল অংশকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? সেখানে বৈষম্য থাকলেও প্রধানত একগামিতা প্রচলিত। একগামিতার এই বিস্তারের জন্য প্রায়ই খ্রিস্টধর্মকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বহুবিবাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা তার চেয়েও অনেক পুরনো। ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হামুরাবির আইনে ব্যবিলনীয় পুরুষদের কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় স্ত্রী নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো। উদাহরণস্বরূপ, প্রথম স্ত্রী বন্ধ্যা হলে তারা আরেকটি বিয়ে করতে পারত। প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে একগামী বিবাহই ছিল একমাত্র আইনগতভাবে স্বীকৃত সম্পর্ক।

যদিও রোমান পুরুষদের একজন স্ত্রী রাখার প্রত্যাশা ছিল, তবু তাঁরা প্রায়ই রক্ষিতা রাখতেন। তাঁরা দাসীদের গর্ভে অনেক সন্তানের বাবা হতেন। একইভাবে কনফুসীয় পারিবারিক আইনে বংশরক্ষা এবং আচার-অনুষ্ঠানের জন্য একজন প্রধান স্ত্রীকে স্বীকৃতি দেওয়া হতো। তবে উপপত্নী রাখারও অনুমতি ছিল। এই ব্যতিক্রমগুলো একত্রে প্রমাণ করে যে, মানবতাত্ত্বিক দিক থেকে একগামী ও বহুবিবাহী সমাজে পুরুষদের প্রজনন সফলতার হার প্রায় একই রকম।

অনেক একগামী সংস্কৃতিতে ধনী পুরুষদের উপপত্নী এবং রক্ষিতা রাখার অনুমতি থাকে। এটি সঙ্গম ব্যবস্থা এবং বিবাহ ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে। বিবাহ হয়তো কার সাথে সঙ্গম করা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি সম্পদ ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পর্কিত। একগামী ব্যবস্থা তাই মূলত সম্পদ হস্তান্তর সীমিত করার জন্যই বিবর্তিত হতে পারে, একগামী সঙ্গম ব্যবস্থা হিসেবে নয়।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরুষরা একাধিক স্ত্রীর অধিকার তখনই ত্যাগ করেন যখন সম্পদের মোট মূল্য তার অংশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সম্পদ অনেক উত্তরাধিকারীর মধ্যে ভাগ করলে তার মোট মূল্য কমে যায়। কৃষিকাজে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। জমি ছোট খণ্ডে ভাগ করলে উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। পশুর পাল ভাগ করার ক্ষেত্রে এই সমস্যা হয় না। নতুন উর্বর জমি দখলের সুযোগ না থাকলে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়। মধ্যযুগীয় ইউরোপে ঠিক এমন পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিল। এই কারণেই সম্ভবত সেখানে এক উত্তরাধিকারী প্রথার উত্থান ঘটেছিল।

সম্পদ টিকিয়ে রাখার এই কৌশলে পুরুষদের নিশ্চিত হতে হতো যে জন্ম নেওয়া ছেলেটি তাঁরই। তাই নারীরা বিশ্বস্ততার বিনিময়ে একধরনের অলিখিত চুক্তি করতেন। কেবল তাঁদের সন্তানই সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী হতে পারত। কুমারীত্বকে তখন প্রবলভাবে মূল্যায়ন করা হতো এবং বিবাহবিচ্ছেদ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। বিশ্বজুড়ে পৈতৃক সম্পদের পরিমাণ যত বেশি হয়, যৌন ঈর্ষাও তত তীব্র হয়।

নারীদের যৌনতা কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পুরুষরা কিন্তু বিশ্বস্ত ছিলেন না। অনেকেই বিয়ের বাইরে সন্তানের বাবা হতেন। তবে এই অবৈধ সন্তানদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বাদ দিতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বহুবিবাহের বিপরীত চিত্র দেখা যায় এখানে। বহুবিবাহে নারীরা সীমিত সম্পদে পরিণত হলেও, অসমতাভিত্তিক একগামিতায় ধনী পুরুষরাই সীমিত সম্পদে পরিণত হন। তখন কন্যারা সম্পদের বদলে ব্যয়ে পরিণত হয়। মা-বাবারা বড় অঙ্কের যৌতুক দিয়ে কয়েকজন ধনী উত্তরাধিকারী পুরুষের জন্য প্রতিযোগিতায় নামেন।

এতকিছুর পরও অনেক সমাজে সম্পদ ভাগাভাগি হওয়ার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও একগামিতা টিকে থাকে। ফরাসি বিপ্লবের পর সরকার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সমানভাবে সম্পদ ভাগ করে দিতে বাধ্য করেছিল। এক উত্তরাধিকারী বেছে নিতে না পেরে এবং সম্পদ অতিরিক্ত ভাগ হয়ে যাওয়ার ভয়ে পরিবারগুলো সন্তানের সংখ্যা সীমিত করতে শুরু করে। সম্ভবত এটিই ব্যাখ্যা করে কেন ফ্রান্স প্রথম ইউরোপীয় দেশ হিসেবে জন্মহার হ্রাসের মুখোমুখি হয়েছিল। উপ-সাহারান আফ্রিকাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। যেসব জাতিগত গোষ্ঠীতে উত্তরাধিকার সব সন্তানের মধ্যে ভাগ হয়, তাদের জন্মহার অন্যান্যদের তুলনায় অনেক কম থাকে।

নিয়মগুলো সময়ের সাথে আঁটসাঁট হয়ে যায় এবং অনেক সময় মূল কারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একবার বিবর্তিত হওয়ার পর মানুষের আচরণ নতুন কোনো উদ্দেশ্য গ্রহণ করতে পারে। এক নারীর সন্তানদের মধ্যে উত্তরাধিকার সীমিত করা মূলত সেই নারীর জন্যই লাভজনক। তাই একগামিতা বজায় রাখতে তিনি সবসময় আগ্রহী থাকেন। এটি কেবল বড় কৃষিজমির জগতেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যদিকে, বঞ্চিত সন্তানরা সবসময় অসুবিধায় থাকে। তারা সংখ্যায় বেড়ে গেলে পুরো ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

আধুনিক পশ্চিমা সমাজে পরিস্থিতি আবারও বদলেছে। আদিম কৃষি পূর্বপুরুষদের মতো অনেকেই এখন একগামী এবং এক সঙ্গীর সাথেই সন্তান নিচ্ছেন। কিন্তু আবার অনেকেই শিকারি-সংগ্রাহকদের মতো বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহ করছেন। সামোয়ানদের পরীক্ষামূলক বিবাহের মতো যুগলরা প্রায়ই প্রতিশ্রুতির আগে একসাথে থাকা শুরু করেন। সত্যিকারের বহুবিবাহ এখন সাধারণত অবৈধ। কিন্তু কিছু ধনী, বিবাহবিচ্ছেদকৃত বা বিপত্নীক পুরুষ নতুন সন্তানের আশায় যুবতী দ্বিতীয় স্ত্রীকে আকর্ষণ করতে পারেন। সমাজে নৈতিক অ-একগামিতার হারও বাড়ছে। এটি একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হলেও বেশ সরব। বাইরের কারও কাছে মনে হতেই পারে যে tader আসলে নির্দিষ্ট কোনো বিবাহ ব্যবস্থাই নেই।

বিবাহের ওপর ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেছে। যুগলরা এখন নিজেদের সঙ্গী নিজেরাই বেছে নেয় এবং সাধারণত ভালোবাসার টানেই তা করে। বিয়ের সম্পদ, যৌতুক এবং আত্মীয়দের ঠিক করা বিয়ের অবসান হওয়ায় পরিবারের হস্তক্ষেপ কমেছে। পশ্চিমাদের কাছে এটি একটি দীর্ঘ এবং ধীর পরিবর্তন মনে হলেও, বিশ্বের অনেক অংশে এটি খুব দ্রুত ঘটছে।

রাষ্ট্র শিক্ষার বিস্তার ঘটালে ছেলেমেয়েরা অবাধে মেলামেশার সুযোগ পায়। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তারা ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে পারে। গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের ফলে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী একসাথে আসার সুযোগ পায়। বিয়ে করলে কোনো ঐতিহ্যই আর পুরোপুরি প্রযোজ্য হয় না। তৃতীয় পক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ না থাকায় বিয়ে এখন সহজেই করা যায় এবং ভেঙেও ফেলা যায়। কেনিয়ার তুর্কানা হ্রদের তীরে বসবাসকারী ছোট মৎস্য সম্প্রদায় এল মোলোর এক নারী খুব স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “আমার সময়ে স্বামী আপনাকে খারাপভাবে মারধর করলেও আপনি থাকতেন। আজ ছোটখাটো বিষয়েও বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়।”

মজার ব্যাপার হলো মিশনারিরাও এই ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেন। মেলানেশিয়ায় তাঁরা ব্যাচেলর কাল্ট নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা মিশ্র গির্জা চালু করেন এবং পবিত্রতার প্রচার করেন। একই সাথে তাঁরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সেসব আদিবাসী ব্যবস্থা দুর্বল করে দেন, যা আগে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত।

সম্পদ এবং উত্তরাধিকারের পরিবর্তন কীভাবে বিবাহকে আরও নমনীয় করে তোলে, তা খুব একটা স্পষ্ট নয়। আধুনিক পশ্চিমা সমাজে একজন নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারী বেছে নেওয়াকে ভুল বা অবৈধ বলে মনে করা হয়। সন্তানেরা এখন মা-বাবা উভয় পক্ষ থেকেই উত্তরাধিকার পায়। নারীরা আর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বিশ্বস্ততা নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্য করেন না। পুরুষরা এখন আগের মতো নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক স্থানে আবদ্ধ থাকেন না। পশ্চিমা বিশ্বে অপিতৃত্বের হার মাত্র এক থেকে তিন শতাংশের মধ্যে। নারীরা পূর্ণাঙ্গ কর্মশক্তির একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছেন এবং স্বামীদের মতোই বেতন পাচ্ছেন। তাই অসন্তুষ্ট কোনো সম্পর্কে জোর করে টিকে থাকার মতো কোনো বাধ্যবাধকতা তাঁদের নেই। যে বাবারা বিবাহবিচ্ছেদ চান, তাঁরা ধরেই নেন যে সন্তানের মা পরিবার, রাষ্ট্র এবং নিজের বেতনের সাহায্যে একাই সন্তান লালন করতে পারবেন।

বিবাহের স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তির স্বাধীনতার মধ্যে সবসময়ই একধরনের টানাপোড়েন ছিল। বিবাহবিচ্ছেদের হার সন্তান হলে কমে যাওয়ার পেছনে এবং উচ্চ আর্থসামাজিক শ্রেণীতে তা কম থাকার পেছনে এটি একটি বড় কারণ। এমন একটি সামাজিক পরিবেশ, যেখানে বাড়ি কেনার জন্য দুজনের আয় প্রয়োজন এবং সন্তান লালনপালন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাদের বিশ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা এবং সহায়তার প্রয়োজন হয়। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একধরনের পরিপূরক ভূমিকার সৃষ্টি হয়। কিন্তু যদি বাড়ি কেনার সুযোগ কম থাকে এবং সন্তানের শিক্ষায় বিনিয়োগের ফল আশানুরূপ না হয়, তবে সহজেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

একজন বা অনেক সঙ্গী। একজন বা একাধিক উত্তরাধিকারী। নিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতা। এই টানাপোড়েনগুলো মানুষের অস্তিত্বের শুরু থেকেই বিবাহ প্রথাকে আকার দিয়েছে। এই টানাপোড়েনই বিশ্বজুড়ে সম্পর্কের এত বিশাল বৈচিত্র্যের ব্যাখ্যা দেয়। বিবাহ কোনো স্থির বিষয় নয়। এটি সংযোগ গড়ার, সম্পদ নিরাপদ রাখার এবং সর্বোপরি জিন ছড়িয়ে দেওয়ার একটি উপায় মাত্র। যদি বিবাহের নিজস্ব কোনো স্বভাব থেকে থাকে, তবে তা হলো এটি পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়। যে পৃথিবীতে পরিচিত অনেক বাধাই এখন মিলিয়ে গেছে, সেখানে হয়তো আমাদের কেবল ভালোবাসাই একসাথে ধরে রাখছে।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?