২০২৫ সালের সেরা ২০ অ্যানিমে সিরিজ
২০২৫ সালে পশ্চিমা দর্শকদের মন কেড়েছে যে অ্যানিমে সিরিজগুলো। ডেমন স্লেয়ার থেকে দান দা দান—পড়ুন বছরের সেরা ২০ অ্যানিমের তালিকা।
চরম একাকীত্বে বন্দী জীবন কাটালে মানুষের মনে কী ঘটে? রবার্ট এগার্স তাঁর সিনেমা ‘দ্য লাইটহাউস’-এ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। সাদাকালোয় ধারণ করা এই মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার দর্শককে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অন্ধকারে টেনে নিয়ে যায়।
উনিশ শতকের শেষভাগের ঘটনা দিয়ে গল্প শুরু হয়। বৃদ্ধ লাইটহাউস রক্ষক থমাস ওয়েক (উইলেম ডিফো) এবং তাঁর সহকারী এফ্রেম উইনস্লো (রবার্ট প্যাটিনসন) একটি নির্জন দ্বীপের বাতিঘরে এক মাস কাটান। সেখানে কেবল এই দুজন মানুষ আর একটিমাত্র বাতিঘর। চারদিকে শুধু সীমাহীন সমুদ্র।
দ্বীপে পা রাখার পরপরই অদ্ভুত সব ঘটনা শুরু হয়। নতুন কর্মী উইনস্লো একটি সিরেনের মূর্তি খুঁজে পান। এরপর থেকেই তিনি এক অদ্ভুত সুন্দরী প্রাণীকে দেখতে শুরু করেন। প্রাণীটি দেখতে মানুষের মতো হলেও এর উপস্থিতি ছিল একইসঙ্গে আকর্ষণীয় ও ভয়ংকর। একদিন উইনস্লো দেখেন ওয়েক বাতিঘরের টাওয়ারে নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর থেকে রাতে তাঁর ঘুমে ভয়ংকর সব স্বপ্ন আসতে থাকে।
যুক্তরাজ্যের সেন্ট্রাল ল্যাংকাশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী সরিতা রবিনসন বলেন, একাকীত্বে মানুষের মনে বিভ্রম দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন এর সাথে সংবেদনহীনতা যুক্ত হয়। অন্ধকার ঘরে একা সময় কাটালে মানুষের এমন অনুভূতি হতে পারে।
১৯৫০-এর দশকে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে একটি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের ছোট একটি ঘরে একা রাখা হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁরা নানা বিভ্রম দেখতে শুরু করেন। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে গবেষণাটি আগেভাগেই বন্ধ করে দিতে হয়। রবিনসন জানান, মানুষ মূলত সামাজিক প্রাণী। আমরা স্বভাবতই অন্যদের সঙ্গ পেতে চাই। সামাজিক একাকীত্ব শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সিনেমার গল্প যতই এগিয়ে যায়, ওয়েকের সঙ্গ উইনস্লোর ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে তা স্পষ্ট হতে থাকে। ওয়েক বেশ ক্ষমতাশালী এবং উগ্র স্বভাবের মানুষ। একদিন রাতের খাবার খাওয়ার সময় তিনি উইনস্লোর মাথায় চড় মেরে বসেন। তিনি চিৎকার করে বলেন, সমুদ্রপাখি মারা অত্যন্ত অশুভ লক্ষণ। এতে উইনস্লো হতবাক হয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁর মনে ক্ষোভ জমতে থাকে।
দ্বীপে উইনস্লোর থাকার মেয়াদ শেষ হতে চলেছিল। ঠিক এমন সময় হঠাৎ বাতাসের গতিপথ বদলে যায়। উইনস্লোর জন্য কোনো ফেরি আসে না এবং প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়। আটকে পড়া এই দুজন মানুষ ধীরে ধীরে বাস্তবতার জ্ঞান হারাতে থাকেন। একসময় উইনস্লো বাতিঘরের টাওয়ারের প্রতি তীব্রভাবে আকৃষ্ট হন। ওয়েক তাঁকে সেখানে যেতে কড়া নিষেধ করেছিলেন। এরপর তাঁরা দুজনেই অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েন।
রবিনসন বলেন, চরম মানসিক চাপের পরিস্থিতিতে মানুষের শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এই হরমোন মূলত সামাজিক বন্ধন তৈরিতে সাহায্য করে। এর ফলে মানুষ সহায়তা ও নিরাপত্তার খোঁজে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে। সিনেমাটিতেও মদের নেশায় দুজনের মধ্যে বেশ কিছু মুহূর্তে স্নেহের আভাস দেখা গেছে। তাঁরা নিজেদের ভাগ্যের সঙ্গে এই দ্বীপের ভাগ্যকে গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলেন।
উইনস্লোর ভঙ্গুর চরিত্রে প্যাটিনসন অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনয়ে ধর্মীয় বেদনা থেকে শুরু করে যন্ত্রণাময় পরম সুখের অনুভূতি ফুটে উঠেছে। এমনকি স্বমেহনের একটি দৃশ্যে তাঁর একাকীত্বের চরম মুহূর্তটি গভীরভাবে ধরা পড়ে। এটি সম্ভবত সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম তীব্র একটি দৃশ্য। অন্যদিকে ওয়েকের চরিত্রে ডিফো একেবারে নিখুঁত অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্রটি ততটা উগ্র না হলেও সমানভাবে বিপর্যস্ত ছিল।
পরিচালক এগার্স সিনেমাটিতে এক সুন্দর অথচ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জগৎ তৈরি করেছেন। উদ্দাম ঢেউ আর বিশাল পাথরের কঠোর দৃশ্যের ফাঁকে মাঝে মাঝেই অক্টোপাসের শুঁড় এবং রক্তের দৃশ্য ভেসে ওঠে। বাতিঘরের কুয়াশার সতর্ক সংকেত বারবার বাজতে শোনা যায়। এই শব্দ দর্শককেও চরিত্রগুলোর মানসিক যন্ত্রণার গভীরে টেনে নিয়ে যায়। তবে সেই যন্ত্রণা কখনোই অতিরিক্ত মনে হয় না। সবকিছুই যেন একেবারে পরিমিত মাত্রায় তুলে ধরা হয়েছে।