skip to content
গুলবাহার
শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া মূল্যায়নের জন্য ইনডেক্স কার্ড ব্যবহার

শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে তা বুঝতে আমার এক অভিনব পরীক্ষা

·

• ৪ মিনিট

একজন রসায়ন শিক্ষক হিসেবে আমি কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারতাম না যে আমার শিক্ষার্থীরা আসলে কতটুকু শিখছে। তাই আমি একটি পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন ক্লাস শেষে আমি সব শিক্ষার্থীকে একটি করে ইনডেক্স কার্ড দিলাম। তারপর বোর্ডে আমি যে বিষয়গুলো পড়িয়েছিলাম সেগুলো লিখলাম। শিক্ষার্থীদের বললাম কার্ডে সেই বিষয়গুলো লিখতে এবং পাশে সবুজ, হলুদ বা লাল রং দিতে। সবুজ মানে ছিল বিষয়টি আমি ভালো বুঝেছি। হলুদ বোঝাত আমি কিছুটা অনিশ্চিত। আর লাল ছিল সতর্কতার সংকেত। যার অর্থ আমি বিভ্রান্ত বা পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমি জানতাম না এই পদ্ধতি কাজ করবে কিনা। কার্ডগুলো সংগ্রহ করে দেখার জন্য আমি উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করলাম। আমি চেয়েছিলাম ক্লাসের বাস্তব চিত্র দেখতে এবং কে কতটুকু বুঝেছে সেটি জানতে।

বছরখানেক আগে যখন আমি প্রথম গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পড়াতে শুরু করি তখন আমি শুধু লেকচার দিতাম। আমার পদ্ধতি কার্যকর কিনা সেটি নিয়ে ভাবতাম না। তখন কেউ হাত না তোলা মানেই সবাই বুঝেছে বলে ধরে নিতাম। কিন্তু সময়ের সাথে বুঝতে পারলাম এই ধারণাটি ভুল। পরীক্ষার পর দেখতাম অনেক শিক্ষার্থী ভুল বুঝে বসে আছে। তখন মনে হতো বিষয়টি যদি আগে জানতে পারতাম। কিছু প্রাথমিক ধারণা না বুঝলে পরের বিষয়গুলো বোঝাও কঠিন হয়ে যায়। সমস্যাগুলো শুরুতেই ধরতে না পারলে ভুল ধারণাগুলো ক্রমে বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞানী হিসেবে আমাকে সবসময় প্রমাণ খুঁজতে শেখানো হয়েছে। হাইপোথিসিস পরীক্ষা করার পাশাপাশি ডেটার ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে হয়। কিন্তু ক্লাসরুমে আমি কোনো ফিডব্যাক ছাড়াই পড়াচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি যেন শূন্যে কথা বলছি। কোনো কিছু ঠিক করার মতো সুযোগও পাচ্ছিলাম না।

আমার দরকার ছিল শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া মূল্যায়ন করার একটি কার্যকর উপায়। আমি চাইলে নিয়মিত কুইজ নিতে পারতাম। কিন্তু আমি আসলে আমার নিজের শিক্ষাদান পদ্ধতিটি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম একদম চাপমুক্ত উপায়ে ফিডব্যাক নিতে। তাই রসায়ন ইনস্ট্রাক্টর হওয়ার পরপরই আমি ইনডেক্স কার্ড নিয়ে পরীক্ষা শুরু করি। প্রতিটি ক্লাস শেষে কার্ডগুলো সংগ্রহ করতাম। দেখতাম কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি হলুদ আর লাল দাগ পড়েছে।

রংগুলোর এই বণ্টনকে আমি ট্রাফিক সিগন্যাল বলি। এর ফলাফল ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো। যে বিষয়গুলো আমার কাছে সহজ মনে হয়েছিল সেখানেও হলুদ আর লালের মিশ্রণ দেখলাম। প্রথমবারের মতো আমি পুরো ক্লাসের বোঝাপড়ার একটি পরিষ্কার চিত্র পেলাম। আর এটি আমার শিক্ষাদানের ধরন বদলে দিল। আমি লেকচারকে কেবল পারফরম্যান্স নয় বরং একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখতে শুরু করলাম। এখানে আমি নতুন কিছু পরীক্ষা করতে পারি। ভুল থাকলে ঠিক করতে পারি এবং শিক্ষার্থীদের সাথে মিলে শিখতে পারি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হলুদ আর লাল সিগন্যালগুলো আমাকে বুঝিয়ে দিল যে আমার আরও ধীরে এগোনো প্রয়োজন। একদিন ফ্রিজিং পয়েন্ট ডিপ্রেশন নামে একটি ধারণা পড়ালাম। দেখা গেল অনেক শিক্ষার্থীই বিষয়টা বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে। কিছু সবুজ কার্ড পেলেও বেশিরভাগই ছিল হলুদ আর লাল। তাই পরের ক্লাসে আমি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আবার আলোচনা করলাম। একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে রাস্তায় বরফ গলাতে লবণ কেন দেওয়া হয় সেটি ব্যাখ্যা করলাম। যাদের মনে তখনও প্রশ্ন ছিল তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে বললাম।

কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে শিক্ষাদান অনলাইনে চলে গেল। তখন সশরীরে কার্ড ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করলাম। প্রতিটি লেকচার শেষে আমি স্ক্রিনে প্রধান বিষয়গুলো দেখাতাম। শিক্ষার্থীদের চ্যাটে তাদের বোঝাপড়ার মাত্রা লিখে পাঠাতে বলতাম। তখন একজন শিক্ষার্থী হয়তো লিখত সবুজ, সবুজ, লাল, হলুদ, সবুজ।

কার্ডগুলো ব্যবহার করতে করতে দেখলাম এগুলো শুধু আমাকেই সাহায্য করছে না। এটি শিক্ষার্থীদেরও বেশ সাহায্য করে। তারা নিজেদের কতটুকু উন্নতি হয়েছে সেটি নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এর ফলে তারা নিজেদের ঘাটতিগুলো বুঝতে পারে। একজন শিক্ষার্থী আমাকে বলেছিল যে রং বেছে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সে জানত না যে সে কতটুকু বুঝেছে। অন্যরা স্বীকার করেছিল যে সবার উত্তরের ধরণ দেখে তারা স্বস্তি পেয়েছে। তারা যে একাই সমস্যায় নেই সেটি তারা বুঝতে পারে।

প্রতিটি ব্যাচই আলাদা হয়। তাই আমি কার্ডগুলো নিয়মিত ব্যবহার করে যাচ্ছি এবং পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছি। যদিও এই কৌশল আমি রসায়ন ক্লাসের জন্য তৈরি করেছিলাম তবে এটি যেকোনো জায়গায় ব্যবহার করা সম্ভব। ল্যাব মিটিং, প্রফেশনাল ওয়ার্কশপ কিংবা রিসার্চ সেমিনারে এটি দারুণ কাজ করবে। আমার বড় শিক্ষা হলো বিজ্ঞান যোগাযোগও বিজ্ঞানের মতো প্রমাণ আর সচেতনতার উপর টিকে থাকে।

আপনার কি শেয়ার করার মতো একটি আকর্ষণীয় ক্যারিয়ারের গল্প আছে? আপনার গল্পটি contact@gulbahar.tech-এ ইমেইল করে পাঠান।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?