চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ
চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প
হাজার হাজার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্থান বা উৎপাদনশীলতায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাঁদের এই স্বীকারোক্তি অর্থনীতিবিদদের ৪০ বছর আগের একটি বিখ্যাত ‘ধাঁধা’ বা প্যারাডক্সের কথা আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
১৯৮৭ সালে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সোলো তথ্যপ্রযুক্তি যুগের মন্থর বিকাশ নিয়ে একটি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৯৬০-এর দশকে ট্রানজিস্টর, মাইক্রোপ্রসেসর, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এবং মেমোরি চিপ আবিষ্কারের পর অর্থনীতিবিদ ও কোম্পানিগুলো আশা করেছিল, এই নতুন প্রযুক্তিগুলো কর্মক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ২.৯ শতাংশ ছিল, ১৯৭৩ সালের পর তা নেমে আসে ১.১ শতাংশে।
নতুন কম্পিউটারগুলো সেসময় প্রচুর তথ্য তৈরি করছিল, যা বিস্তারিত প্রতিবেদন হিসেবে স্তূপাকার কাগজে ছাপা হচ্ছিল। কর্মক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের সাফল্য আনার যে প্রত্যাশা ছিল, তা বেশ কয়েক বছর ধরেই ব্যর্থ হতে থাকে। অর্থনীতিবিদ রবার্ট সোলোর এই পর্যবেক্ষণের কারণেই অপ্রত্যাশিত এই ফলাফলকে “সোলোর উৎপাদনশীলতা প্যারাডক্স” (Solow’s Productivity Paradox) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৮৭ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ’-তে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সোলো লিখেছিলেন, “কম্পিউটার যুগকে আপনি সর্বত্রই দেখতে পাবেন, কেবল উৎপাদনশীলতার পরিসংখ্যানে ছাড়া।”
শীর্ষ নির্বাহীরা (সি-স্যুট এক্সিকিউটিভ) কীভাবে এআই ব্যবহার করছেন বা করছেন না, সে সম্পর্কিত নতুন তথ্য বলছে—ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কর্মক্ষেত্র ও অর্থনীতিতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে এটি এখন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর (S&P 500) অন্তর্ভুক্ত ৩৭৪টি কোম্পানি তাদের আয় সংক্রান্ত আলোচনায় (আর্নিংস কল) এআই-এর কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই জানিয়েছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণ ইতিবাচক। কিন্তু এই ইতিবাচক উদ্যোগ সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (NBER)-এর চলতি মাসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রত্যাশা সংক্রান্ত জরিপে অংশ নেওয়া ৬,০০০ সিইও, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা এবং অন্যান্য নির্বাহীদের বেশিরভাগই মনে করেন, তাদের কার্যক্রমে এআইয়ের প্রভাব খুবই সামান্য। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাহী এআই ব্যবহারের কথা জানালেও, তা সপ্তাহে গড়ে মাত্র ১.৫ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২৫ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে একেবারেই এআই ব্যবহার করছেন না। ওই গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, গত তিন বছরে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে যে এআই তাদের কর্মসংস্থান বা উৎপাদনশীলতায় কোনো প্রভাব ফেলেনি।
তবে কর্মক্ষেত্র ও অর্থনীতিতে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশা ছিল অনেক বড়। নির্বাহীরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, আগামী তিন বছরে এআই উৎপাদনশীলতা ১.৪ শতাংশ এবং আউটপুট (উৎপাদন) ০.৮ শতাংশ বাড়াবে। এই সময়কালে কর্মসংস্থান ০.৭ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে তাঁরা ধারণা করলেও, কর্মী পর্যায়ে করা জরিপে উল্টো ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
২০২৩ সালে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষকরা দাবি করেছিলেন, এআই ব্যবহার করেন না এমন কর্মীদের তুলনায়, এআই ব্যবহারকারী একজন কর্মীর কর্মক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির এমন কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় অর্থনীতিবিদরা এখন ভাবছেন, কর্পোরেট পর্যায়ের বিপুল বিনিয়োগ থেকে (যা ২০২৪ সালে ২৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে) এআই কবে বা কীভাবে সুফল এনে দেবে।
অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ টর্স্টেন স্লোক সাম্প্রতিক একটি ব্লগ পোস্টে লিখেছেন, “এআই সর্বত্রই আছে, কিন্তু সামগ্রিক অর্থনীতির পরিসংখ্যানে এর কোনো উপস্থিতি নেই।” তিনি প্রায় ৪০ বছর আগের সোলোর সেই পর্যবেক্ষণকে উদ্ধৃত করে বলেন, “আজ আপনি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা বা মূল্যস্ফীতির কোনো পরিসংখ্যানে এআইকে খুঁজে পাবেন না।”
স্লোক আরও যোগ করেন, শীর্ষ ৭টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের (ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন) বাইরে “অন্যান্য কোম্পানির প্রফিট মার্জিন বা আয়ের পূর্বাভাসেও এআইয়ের কোনো চিহ্ন নেই।”
এআই এবং উৎপাদনশীলতা নিয়ে স্লোক বেশ কিছু একাডেমিক গবেষণারও উল্লেখ করেছেন, যা এই প্রযুক্তির উপযোগিতা নিয়ে একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র তুলে ধরে। গত নভেম্বরে সেন্ট লুইস ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক তাদের ‘স্টেট অব জেনারেটিভ এআই অ্যাডপশন’ রিপোর্টে প্রকাশ করে যে, ২০২২ সালের শেষের দিকে চ্যাটজিপিটি আসার পর থেকে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিতে ১.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে। অথচ ২০২৪ সালের এমআইটির একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী এক দশকে উৎপাদনশীলতা বাড়বে মাত্র ০.৫ শতাংশ।
ওই গবেষণার লেখক ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ দারোন অ্যাসেমোগ্লু সে সময় বলেছিলেন, “আমার মনে হয় না আগামী ১০ বছরে ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধিকে আমাদের ছোট করে দেখা উচিত। এটি শূন্যের চেয়ে তো ভালো। কিন্তু প্রযুক্তি শিল্প ও সাংবাদিকতায় মানুষ এআই নিয়ে যে ধরনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তার তুলনায় এটি সত্যিই হতাশাজনক।”
সাম্প্রতিক অন্যান্য কিছু গবেষণা এর পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘ম্যানপাওয়ারগ্রুপ’-এর ২০২৬ সালের গ্লোবাল ট্যালেন্ট ব্যারোমিটার দেখায়, ১৯টি দেশের প্রায় ১৪,০০০ কর্মীর মধ্যে নিয়মিত এআই ব্যবহারের হার ২০২৫ সালে ১৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই প্রযুক্তির উপযোগিতার ওপর তাঁদের আস্থা ১৮ শতাংশ কমে গেছে, যা এআইয়ের প্রতি দীর্ঘস্থায়ী আস্থাহীনতারই ইঙ্গিত দেয়।
আইবিএমের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা নিকল লামোরো গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি জায়ান্ট তাদের প্রতিষ্ঠানে তরুণ বা নবীন কর্মী নিয়োগের হার তিনগুণ বাড়াবে। এর মানে হলো, কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার ক্ষমতা এআই-এর থাকলেও, এন্ট্রি-লেভেলের কর্মীদের পুরোপুরি সরিয়ে দিলে ভবিষ্যতে মিডল ম্যানেজারের ঘাটতি তৈরি হবে; যা শেষ পর্যন্ত কোম্পানির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
তবে, উৎপাদনশীলতার এই মন্থর ধারাটি ভবিষ্যতেও পাল্টে যেতে পারে। ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকের আইটি বুম (প্রযুক্তির প্রসার) মূলত ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে উৎপাদনশীলতা ব্যাপক বৃদ্ধির পথ তৈরি করেছিল। এক দশকব্যাপী মন্দার পর, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিতে ১.৫ শতাংশ উল্লম্ফন দেখা গিয়েছিল।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল ইকোনমি ল্যাবের পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ এরিক ব্রিনজলফসন ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি মতামত কলামে লিখেছেন যে, এই প্রবণতা ইতিমধ্যে বদলাতে শুরু করেছে। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, গত সপ্তাহের জবস রিপোর্টে নতুন কর্মসংস্থান ১৮১,০০০-এ সংশোধন করা হলেও, চতুর্থ প্রান্তিকে জিডিপি ৩.৭ শতাংশ হারে বাড়ছে—যা উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির একটি ইঙ্গিত। তাঁর নিজস্ব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা ২.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এআই খাতে বিনিয়োগের ফলে প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলো ছড়িয়ে পড়ার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। পিমকো-এর (Pimco) সাবেক সিইও এবং অর্থনীতিবিদ মোহামেদ এল-এরিয়ানও লক্ষ্য করেছেন যে, ১৯৯০-এর দশকে অফিস অটোমেশনের সময় যেমনটি ঘটেছিল, বর্তমানে এআই গ্রহণের ফলেও চাকরির প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি একে অপরের থেকে আলাদা (Decoupled) হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ টর্স্টেন স্লোকও এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাবকে একটি সম্ভাব্য “জে-কার্ভ” (J-Curve) হিসেবে দেখছেন। এই মডেলে, প্রাথমিকভাবে কর্মক্ষমতা ও ফলাফলে মন্দা দেখা যায়, কিন্তু পরবর্তীতে তা সূচকীয় হারে (Exponentially) বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, এআইয়ের উৎপাদনশীলতাও এই ধারা অনুসরণ করবে কি না, তা নির্ভর করবে এআই নতুন কী ধরনের ভ্যালু বা মূল্যবোধ তৈরি করতে পারছে তার ওপর।
স্লোক লক্ষ্য করেছেন, এখন পর্যন্ত এআই তার আইটি পূর্বসূরিদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটছে। ১৯৮০-এর দশকে, আইটি খাতে কোনো নতুন উদ্ভাবকের একচ্ছত্র মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল—যতক্ষণ না প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই ধরনের পণ্য বাজারে আনতে পারত। কিন্তু আজ, ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (LLM) নির্মাতাদের মধ্যে “তীব্র প্রতিযোগিতার” কারণে এআই টুলগুলো অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে এবং এগুলোর দামও দ্রুত কমছে।
তাই স্লোক মনে করেন, এআই উৎপাদনশীলতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে কোম্পানিগুলোর এই প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ এবং কর্মক্ষেত্রে এর ধারাবাহিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর। স্লোক বলেন, “অন্য কথায়, সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভ্যালু ক্রিয়েশন মানে শুধু পণ্য তৈরি করা নয়; বরং জেনারেটিভ এআই-কে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে একে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।”
চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ
চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প
এআই যুগে বই পড়ার প্রয়োজন কী?
এআই সব জানলেও কেন বই পড়া জরুরি? জানুন কীভাবে প্রযুক্তি ও পাঠকের সম্পর্ক বদলাচ্ছে।
কীভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আফ্রিকাকে দরিদ্র রাখে
আফ্রিকার ব্যয়বহুল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংস্কৃতি কীভাবে পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয় এবং কেন এই প্রথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়