ডার্ক ওয়েব ও ডিপ ওয়েবের পার্থক্য জেনে নিন
ডার্ক ওয়েব এবং ডিপ ওয়েব এক নয়। দুটির মধ্যে পার্থক্য কী, কীভাবে কাজ করে এবং কেন এগুলো নিয়ে ভুল ধারণা থাকে, তা জানুন।
• ৭ মিনিট
ডার্ক ওয়েব—এটি এমন এক ভার্চ্যুয়াল জগৎ, যা আমাদের নিত্যদিনের চেনা ইন্টারনেটের বাইরের এক দুনিয়া। গুগল বা বিং যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে যেতে চাইলে আপনার দরকার হবে বিশেষ কিছু টুল বা হাতিয়ার।
এই জগতে যেমন তথ্য ফাঁসের ঘটনা এবং অবৈধ লেনদেনের খবর পাওয়া যায়, তেমনি একই সঙ্গে এখানে চলে নানা বৈধ কার্যক্রমও। বিশেষ করে যারা সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করতে চান, তাদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণহীন এই ছায়াময় জগৎ ভালোর জন্যও হতে পারে, আবার মন্দের জন্যও।
আগ্রহ হচ্ছে? চলুন জেনে নিই কীভাবে ডার্ক ওয়েবে প্রবেশ করবেন এবং সেখানে কী কী পাবেন। তবে মনে রাখবেন, লাইফহ্যাকার কোনো অবৈধ কাজ সমর্থন করে না; তাই আমরা এমন কোনো পরামর্শ দেব না যা আইনবিরুদ্ধ।
ইন্টারনেটের জগতে বিচরণ করতে গেলে প্রায়ই এই দুটি শব্দ শুনতে পাবেন। অনেকের মনেই এ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রথমে জেনে নিই ডিপ ওয়েব কী—এটি এমন সব অনলাইন বিষয়বস্তুকে বোঝায়, যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে রয়েছে পেওয়ালের (paywall) পেছনের পেজ, ব্যক্তিগত ডাটাবেস, ইমেইল আর্কাইভ, কোম্পানির ইন্ট্রানেট ইত্যাদি।
সহজ কথায়, যেসব ওয়েবপেজ লগইন না করলে দেখা যায় না—অ্যাকাডেমিক জার্নাল থেকে শুরু করে নেটফ্লিক্স অ্যাকাউন্ট—সবই ডিপ ওয়েবের অংশ। কিছু হিসাব অনুযায়ী, সমগ্র ইন্টারনেটের প্রায় ৯০ শতাংশই ডিপ ওয়েবের অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, ডার্ক ওয়েব হলো ডিপ ওয়েবেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ। এটি এমন সব ওয়েবসাইট নিয়ে গঠিত, যেগুলো নিজেদের আড়াল করে রাখতে চায়। এসব পেজে ব্যবহারকারীর পরিচয় ও তথ্যের সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। সাধারণ ব্রাউজার (যেমন ক্রোম বা ফায়ারফক্স) দিয়ে এগুলো খোলা যায় না।
ডার্ক ওয়েবের নিজস্ব কিছু টুল এবং সার্চ ইঞ্জিন রয়েছে। এখানে সাধারণ ব্রাউজার কিংবা গুগল সার্চ কোনো কাজেই আসে না।
ইন্টারনেটে এমন একটি জায়গা যেখানে গোপনীয়তা ও নাম-পরিচয়হীনতা (anonymity) বজায় থাকে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই কিছু অবৈধ কার্যক্রম চলতে পারে। হ্যাকিং টুল, মাদক, ভুয়া পাসপোর্ট, অশ্লীল কনটেন্ট, অস্ত্র—এসবের লেনদেন হয় ডার্ক ওয়েবে। এখানে প্রবেশ করলে মনে হতে পারে যেন শহরের সবচেয়ে বিপজ্জনক কোনো এলাকায় ঢুকে পড়েছেন।
তবে গোপনীয়তা দরকার এমন অনেক বৈধ কাজের জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়। সাংবাদিক, গোপন তথ্য ফাঁসকারী (whistleblowers) ও রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করেন। ভালো বা মন্দ যে উদ্দেশ্যেই হোক, কোনো কাজ যদি গোপন রাখতে হয়, তবে তা এখানে করা সম্ভব।
ডার্ক ওয়েবে প্রবেশের প্রধান দরজা হলো টর (Tor)। এই ব্রাউজারটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করার জন্যই তৈরি। এটি দিয়ে সাধারণ ওয়েবসাইটও ব্রাউজ করা যায়। টর মূলত ট্র্যাকার ব্লক করে, ব্যবহারকারীর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ মুছে দেয়, তথ্য এনক্রিপ্ট করে এবং ব্রাউজিং রুট বা পথ বদলে দেয়—যাতে কেউ জানতে না পারে আপনি কোথা থেকে ব্রাউজ করছেন।
ডার্ক ওয়েবে ঢোকার জন্য টর-ই সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস (iOS)-এর জন্যও এর মোবাইল অ্যাপ রয়েছে। অন্য ব্রাউজার থাকলেও সুবিধা ও সহজ ব্যবহারের দিক থেকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য টরই সেরা।
টরের কার্যপদ্ধতির মূলে রয়েছে ‘অনিয়ন রাউটিং’ প্রযুক্তি। পেঁয়াজের খোসার মতো এখানে তথ্যের একাধিক স্তর থাকে। আপনার ইন্টারনেট ট্রাফিক একাধিক নোড বা পয়েন্ট ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছায়। এতে ব্রাউজিং কিছুটা ধীর হতে পারে, তবে আপনি কে বা কোথায় আছেন, তা কেউ সহজে শনাক্ত করতে পারে না।
ডেস্কটপে প্রথমবারের মতো ব্রাউজারটি চালু করলে দুটি অপশন পাবেন—‘কনফিগার কানেকশন’ অথবা শুধু ‘কানেক্ট’। প্রথমটি বেছে নিলে নোড বা ‘ব্রিজ’ নিয়ন্ত্রণে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর জন্য টরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কানেক্ট করতে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অনলাইনে গেলে সবকিছু সাধারণ ব্রাউজারের মতোই কাজ করবে। টর দিয়ে সাধারণ ওয়েবেও ঢোকা যায় এবং অতিরিক্ত গোপনীয়তার সুবিধা নেওয়া যায়। এর একটি বিশেষ সুবিধা হলো ‘নিউ আইডেন্টিটি’ বোতাম (ব্রাউজারের ওপরে ডানদিকে ঝাড়ুর আইকন)—এতে ক্লিক করলে বর্তমান সেশনের সবকিছু মুছে টর নতুন করে শুরু হয়।
মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করাও বেশ সহজ। অ্যান্ড্রয়েডের জন্য অফিশিয়াল টর অ্যাপ রয়েছে। আইওএসে সরাসরি এর সমতুল্য কিছু না থাকলেও ওপেন সোর্স ‘অনিয়ন ব্রাউজার’ একটি ভালো বিকল্প। ‘অনিয়নাইজ’ করার বোতাম অ্যান্ড্রয়েডে ওপরে বাঁয়ে এবং আইওএসে ওপরে ডানদিকে থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই ‘অরবট’ (Orbot) ভিপিএন সার্ভিস ইনস্টল করে নিতে পারেন, যা টর প্রকল্পেরই অংশ।
তবে মনে রাখবেন, টর ও অনিয়ন রাউটিং ব্যবহার করলেই আপনি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যাবেন না। নোডে প্রবেশ ও বের হওয়ার পয়েন্টে কিছু তথ্য ধরা পড়তে পারে। এ ছাড়া ‘এন্ড-টু-এন্ড কোরিলেশন অ্যাটাক’-এর ঝুঁকিও থাকে। তাই টর অনেক নিরাপদ হলেও শতভাগ নিশ্ছিদ্র নয়।
আপনার ইন্টারনেট সেবাদাতা (ISP) দেখতে পাবে যে আপনি টর নোডে যুক্ত হচ্ছেন, যদিও আপনি ভেতরে কী করছেন তা তারা জানতে পারবে না। অনেকে এর সঙ্গে ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করেন, তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে তৃতীয় আরেকটি পক্ষের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা শুধু সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর করে না, আপনার কম্পিউটারের কায়িক বা ফিজিক্যাল নিরাপত্তাও জরুরি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারি কর্তৃপক্ষ চাইলে আপনার যন্ত্রটি জব্দ করতে পারে। তাই সম্পূর্ণ অদৃশ্য হতে চাইলে টর ব্রাউজার একটি বড় ধাপ, তবে একমাত্র ধাপ নয়।
টর চালু করলেই যে ডার্ক ওয়েব আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠবে, তা কিন্তু নয়। শুধু ব্রাউজার থাকলেই হবে না, দরকার হবে ডার্ক ওয়েব সার্চ ইঞ্জিন। অবশ্য সরাসরি ওয়েব ঠিকানা জানা থাকলে সেখানেও যাওয়া যায়।
টরের ডিফল্ট সার্চ ইঞ্জিন হলো ডাকডাকগো (DuckDuckGo)। সার্চ বক্সে ‘অনিয়নাইজ’ টগল চালু করলে ডার্ক ওয়েব লিংক খুঁজে পাওয়া যাবে। সাধারণ “.com”-এর বদলে এসব লিংকের শেষে থাকে “.onion”। ডার্ক ওয়েবে ব্যবহারকারীকেই বেশি কসরত করতে হয়—অন্য ব্যবহারকারী বা ফোরাম থেকে লিংক সংগ্রহ করে বুকমার্ক করে রাখাটা জরুরি।
অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিনের মধ্যে আছে আহমিয়া (Ahmia), টর্চ (Torch), নটইভিল (NotEvil) এবং অনিয়ন ইউআরএল ডিরেক্টরি। কিছু সাইট সাধারণ ব্রাউজারেও খুঁজে পাওয়া যায়, তবে অনিয়ন লিংকগুলোতে প্রবেশ করতে হলে টর ব্যবহার করতেই হবে।
ডার্ক ওয়েবের সাইটগুলো দেখতে সাধারণ ওয়েবসাইটের মতোই, যদিও অনেক সাইট ততটা গোছানো বা চকচকে নয়। যেকোনো লিংকে ক্লিক করলেই সাইট খুলবে এবং ওপরে ঠিকানা দেখা যাবে।
উল্লেখযোগ্য কিছু সাইটের মধ্যে রয়েছে বিবিসি ও মেদিয়াপার্ট-এর ডার্ক ওয়েব সংস্করণ। মূলত যেসব দেশে ইন্টারনেট সেন্সরশিপ বা কড়াকড়ি রয়েছে, সেখানকার মানুষের কথা ভেবেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। নিরাপদ ইমেইলের জন্য আছে প্রোটন মেইল (Proton Mail)। কোনো সাধারণ সাইটের ডার্ক ওয়েব (.onion) সংস্করণ থাকলে টরের ওপরে ডানদিকে একটি বার্তা দেখা যাবে—“ভিজিট দ্য .অনিয়ন” বোতামে ক্লিক করলেই সেখানে চলে যাবেন।
ডার্ক ওয়েবের দুর্নাম এবং অবৈধ কার্যক্রমের ঝুঁকির কারণে বড় ব্র্যান্ডগুলো এখানে খুব একটা থাকে না। এখানকার বেশিরভাগ সাইট, উইকি ও ফোরাম স্বেচ্ছাসেবকদের তত্ত্বাবধানে চলে। তবুও এখানে দেখার মতো অনেক কিছু আছে।
আগেই বলেছি—এটি ইবে বা অ্যামাজনের মতো নয়। যা সচরাচর ডাউনলোড বা কেনা উচিত নয়, তা-ই এখানে পাওয়া যায়।
বিস্তারিত বলছি না—আপনাদের বা আমাকে, কাউকেই বিপদে ফেলতে চাই না। এখানকার অধিকাংশ লেনদেন হয় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে, যেমন বিটকয়েন—যা অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত ও নাম-পরিচয়হীন। আরেকটি প্রাইভেট ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো মনেরো (Monero), যা নিজেকে ট্রেস করা যায় না বা ‘আনট্রেসেবল’ বলে দাবি করে।
তবে ভুলেও ভাববেন না যে এসব লেনদেন কখনোই ধরা পড়বে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন প্রযুক্তিতে বেশ দক্ষ। প্রাইভেট ক্রিপ্টো ওয়ালেট ব্যবহার করলেও অন্য উপায়ে পরিচয় ফাঁস হতে পারে—ইন্সট্যান্ট মেসেজে অসাবধানতাবশত একটি ব্যক্তিগত তথ্য বলে ফেলাই আপনার পরিচয় প্রকাশের জন্য যথেষ্ট।
সব মিলিয়ে, বৈধ কেনাকাটার জন্য ডার্ক ওয়েবে যাওয়ার তেমন কোনো যুক্তি নেই। এখানে প্রচুর প্রতারক ও হ্যাকার ওঁৎ পেতে থাকে, আর একবার ঠকে গেলে কোনো আইনি সুরক্ষাও পাবেন না।
ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করা নিজে কোনো অবৈধ কাজ নয়, কিংবা সেখানে শুধু ঘুরে দেখলেও আইনি বিপদ নেই। তবে সমস্যা হলো, এখানে প্রচুর অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা কঠিন।
সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ডার্ক ওয়েব সংক্রান্ত অপরাধের খবর দেখা যায়। এর কিছু অন্ধ গলিতে যা ঘটে, তা সাধারণ মানুষ ও কোম্পানিকে দূরে রাখার মতোই। পুলিশি অভিযানে ডার্ক ওয়েবের অনেক অংশ মাঝে মাঝেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তাই ব্রাউজ করতে গেলে অবশ্যই সতর্ক থাকুন—কোন সাইটে যাচ্ছেন এবং কার সঙ্গে কথা বলছেন, সে বিষয়ে খেয়াল রাখুন। মনে রাখবেন, দেশভেদে বাক্স্বাধীনতা ও সেন্সরশিপ আইন ভিন্ন হতে পারে, যার কারণেই মূলত ডার্ক ওয়েবের অস্তিত্ব টিকে আছে।
হ্যাকাররা ডার্ক ওয়েবে প্রচুর সময় ব্যয় করে। হ্যাকিং টুল এবং ডেটা লিক (তথ্য ফাঁস) সংক্রান্ত ফাইল পেতে এখানে আসা তাদের জন্য সহজ। তবে যারা এসব আপলোড বা ডাউনলোড করছে, তাদের ধরা বেশ কঠিন।
পাসওয়ার্ড ম্যানেজার ব্যবহার করলে হয়তো ‘ডার্ক ওয়েব মনিটরিং’ সুবিধা পেতে পারেন—আপনার ইমেইল, পাসওয়ার্ড বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে এটি আপনাকে সতর্ক করবে। এই সুবিধা না থাকলেও অন্য উপায় আছে। আর যদি কখনো তথ্য ফাঁস হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে কী করণীয়, তা জেনে রাখা জরুরি।
ডার্ক ওয়েব ও ডিপ ওয়েবের পার্থক্য জেনে নিন
ডার্ক ওয়েব এবং ডিপ ওয়েব এক নয়। দুটির মধ্যে পার্থক্য কী, কীভাবে কাজ করে এবং কেন এগুলো নিয়ে ভুল ধারণা থাকে, তা জানুন।
OpenAI বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সবচেয়ে মোহনীয় চ্যাটবট
ওপেনএআইয়ের জনপ্রিয় চ্যাটবট GPT-4o বন্ধের ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোক। অনেকে বলছেন, "এভাবে চলতে পারব না।"
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর বয়স ন্যূনতম ১৬ কেন হওয়া উচিত
অস্ট্রেলিয়ার ১৬ বছর বয়সসীমা আইন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃসন্ধির সময় সোশ্যাল মিডিয়া মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।