পপ সংস্কৃতি থেকে আমি যোজন যোজন দূরে থাকা এক মানুষ। আধুনিক পপ সঙ্গীত সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা কতটা গভীর তা বোঝাতে একটা উদাহরণ দেই—গত গ্রীষ্মের আগে আমি “ব্যাড বানি” নামটা কানেও শুনিনি। আমার এক বন্ধু তার প্রিয় গানটি শোনানোর পর ঘণ্টাখানেক হেসেছিলেন এটা ভেবে যে, ‘ব্যাড বানি’ নামের এক গায়কের নাম আমার কানে পৌঁছায়নি (নাম শুনে ভেবেছিলাম তিনি বোধহয় খরগোশ খুব ভালোবাসেন!)। আজও আমি ওই বানি সাহেবের কোনো গানের নাম বলতে পারব না (সে কেনই বা ব্যাড?), আসলে গান শোনার ক্ষেত্রে আমি এখনো গত শতাব্দীর পুরনো দিনের গানেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
তবুও একজন পপ শিল্পী সবসময়ই আমার রাডারে ছিলেন—টেইলর সুইফট।
মিডল স্কুল ও হাইস্কুলের শুরুর দিকে, পৃথিবীর আর যেকোনো মানুষের চেয়ে আমি টেইলর সুইফটকে বেশি ভালোবাসতাম। সেই সময়টায় এই পপ তারকা নিজেকে “কান্ট্রি গায়িকা” হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং তখন তার বয়স সবে বিশের কোঠায়। তিনি গান গাইতেন ছেলেদের নিয়ে, হৃদয় ভাঙা নিয়ে এবং ২০১০-এর দশকের অনেক নারী পপ তারকার মতো তিনি স্বল্পবসনা হয়ে মঞ্চে আসতেন না। সুইফটের গান নিয়ে যার যা খুশি মত থাকুক—আমার মতে তিনি কখনোই আহামরি কোনো কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না—কিন্তু তিনি নিঃসন্দেহে একজন চমৎকার গীতিকার, যার গানের গভীর কথাগুলো সমসাময়িক অন্য শিল্পীদের একঘেয়ে কোরাস ও সস্তা চটকদার কথা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
তৃতীয় স্টুডিও অ্যালবাম স্পিক নাউ-এর প্রতিটি গানের কথা সুইফট একাই লিখেছিলেন—যা আজকের সঙ্গীতজগতে প্রায় শোনাই যায় না। বর্তমান সময়ে খুব কম পপ তারকারই অন্যের সাহায্য ছাড়া গান লেখার এমন প্রতিভা আছে।
তাই আমি এই ধারণা মানতে নারাজ যে টেইলর সুইফট মেধাহীন। গায়িকা হিসেবে তিনি অবশ্যই কিছুটা অতিরঞ্জিত এবং তার কণ্ঠের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়—কিন্তু সুইফট তো আর বিয়ন্সে, অ্যাডেল বা লেডি গাগার মতো বিশেষ কণ্ঠশৈলী বা চড়া স্কেলে গাওয়ার ক্ষমতার জন্য খ্যাতি পাননি। কোটি কোটি মানুষ তাকে ভালোবাসেন কারণ, অন্তত পপ তারকা হিসেবে তিনি দুর্দান্ত একজন গীতিকার।
২০১২ সালের “অল টু ওয়েল”-এর বর্ধিত লিরিক্স বা কথাগুলোর দিকে তাকান:
And I was never good at telling jokes, but the punchline goes
I’ll get older, but your lovers stay my age
From when your Brooklyn broke my skin and bones
I’m a soldier who’s returning half her weight
ব্রেকআপ নিয়ে লেখা একটি পপ গানের জন্য এই কথাগুলো বিস্ময়করভাবে গভীর ও জটিল। একই বিষয়ে অ্যাডেলের “রোলিং ইন দ্য ডিপ”-এর গীতিকারের দক্ষতার সঙ্গে এর তুলনা করলেই তফাতটা বোঝা যায়:
We could’ve had it all
Rolling in the deep
You had my heart inside of your hand
And you played it to the beat
ভুল বুঝবেন না—“রোলিং ইন দ্য ডিপ” দারুণ একটি গান, যা শুনলে আমি আজও হাইস্কুলের দিনগুলোতে ফিরে যাই। কিন্তু গীতিকার হিসেবে সুইফট সহজেই তার সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যান। তার কথাগুলো সত্যিই কাব্যিক এবং তাতে জটিল সাহিত্যিক কৌশলের ছাপ স্পষ্ট—প্রেমিকের “ব্রুকলিন” শহরের বর্ণনায় সিনেকডোখে (synecdoche) এবং নিজেকে আহত সৈনিক হিসেবে তুলে ধরতে রূপকের ব্যবহার তারই প্রমাণ।
মাত্র ২০ বছর বয়সেই সুইফট তার গানে সাহিত্যিক পরিপক্বতার ছাপ রেখেছিলেন—যেমন ২০১০-এর “স্পিক নাউ”-এ:
Fond gestures are exchanged
And the organ starts to play
A song that sounds like a death march
And I am hiding in the curtains
It seems that I was uninvited by your lovely bride-to-be
সুইফট নিজেও তার এই প্রতিভা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন—হয়তো একটু বেশিই। ২০১৬ সালে ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, স্কুলে যদি কোনো বিষয় পড়াতে হতো, তবে তিনি ইংরেজিই পড়াতেন। কয়েক বছর পর এলএল-এ একটি লেখায় তিনি তার গান লেখা বা গীতিকবিতা নিয়ে আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে এফ. স্কট ফিটজেরাল্ডকে অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং শেক্সপিয়ারের প্রতি তার ভালোবাসার কথা জানান।
আর তর্কসাপেক্ষ হলেও বলা যায়, সাহিত্যিক রেফারেন্সগুলোই তাকে বিখ্যাত করেছে। ২০০৮-এর চার্ট-কাঁপানো গান “লাভ স্টোরি” শুধু শেক্সপিয়ারের রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট-কেই নয়, নাথানিয়েল হথর্নের দ্য স্কারলেট লেটার-ও উল্লেখ করে:
‘Cause you were Romeo, I was a scarlet letter
And my daddy said, “Stay away from Juliet”
But you were everything to me
I was beggin’ you, “Please don’t go, “ and I said
Romeo, take me somewhere we can be alone
I’ll be waiting, all there’s left to do is run
You’ll be the prince and I’ll be the princess
It’s a love story, baby, just say, “Yes”
আমার কিশোর বয়সের প্রেমঘটিত সমস্যা আর উদ্বেগের পাশাপাশি, হয়তো এই সাহিত্যিক অনুষঙ্গগুলোই আমাকে প্রথম সুইফটের দিকে টেনেছিল। লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এবং ক্লাসিক বইপোক হিসেবে, আমি সাহিত্যের প্রতি সুইফটের এই অনুরাগ দেখে মুগ্ধ হতাম এবং তার গানের কাব্যিক কথাগুলোতে বুঁদ হয়ে থাকতাম।
কিন্তু ১২ বছর বয়সে আমি রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট বা দ্য স্কারলেট লেটার—কোনোটাই পড়িনি। আমি বুঝতেই পারিনি যে আমার প্রিয় নাট্যকার শেক্সপিয়ারকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে সুইফট আসলে মূল রচনা থেকে কতটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, তার গানে দুই বিরহী প্রেমিকের সুখী পরিণতির কথা শুনে আমি দশম শ্রেণিতে রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম।
কিন্তু আসল নাটকটি পড়ার পর, স্বাভাবিকভাবেই আমি চরম হতাশ হলাম। রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট কোনোভাবেই সব বাধা পেরিয়ে দুই প্রেমিকের সুখী হওয়ার গল্প ছিল না। শেক্সপিয়ার রাজকীয় পোশাক পরে প্রিয় রোমিওর সঙ্গে বিয়ে করতে ছুটে যাওয়া কোনো রাজকন্যার গল্প লেখেননি। তিনি লিখেছিলেন দুই অপরিণত ছেলেমেয়ের গল্প, যারা এক বোকামির খেলায় মেতেছিল এবং তার মাসুল হিসেবে পেয়েছিল মৃত্যু। সুইফট আমাকে ধোঁকা দিয়েছেন! তিনি কি আদৌ নাটকটি পড়েছিলেন? বারো বছর বয়সী আমার মতো তিনিও হয়তো ধরে নিয়েছিলেন যে রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট মানেই পারিবারিক বাধা পেরিয়ে প্রেমের জয়। কিন্তু তিনি পুরোটাই ভুল বুঝেছিলেন! নাটকটির মূল সুর এটা ছিল না।
নিজেকে তখন বুঝিয়েছিলাম, বিষয়টা অত গুরুতর নয়—পপ সংস্কৃতিতে তো প্রায়ই সাহিত্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, এটা তো শুধুই একটা গান। হয়তো শেক্সপিয়ারের নাটকের সঙ্গে এর গভীর কোনো সম্পর্ক খোঁজা বোকামি। কিন্তু আমি টেইলর সুইফটকে আদর্শ মেনেছিলাম, আর তিনি আমাকে নাটকটি সম্পর্কে ভুল বার্তা দিয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকে শত শতবার “লাভ স্টোরি” শোনার পর, দশম শ্রেণির ক্লাসে শেক্সপিয়ার পড়তে গিয়ে আমার কড়া মেজাজের ইংরেজি শিক্ষক যা পড়ালেন, তার সঙ্গে সুইফটের গানের আকাশ-পাতাল তফাত দেখে আমি ধাক্কা খেয়েছিলাম। সুইফটের প্রতি আমার মোহভঙ্গ হলো, তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম—এটা শুধুই একটা গান। তিনি নিশ্চয়ই সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে এমন ভুল গান আর করবেন না।
কিন্তু সুইফট সাহিত্য সম্পর্কে যতটা ভুল ছিলেন, সুইফট সম্পর্কে আমার ধারণাটাও ছিল ততটাই ভুল।
নড়বড়ে শেক্সপিয়ার রেফারেন্স ব্যবহার করে তিনি কতটা লাভবান হয়েছেন তা বুঝতে পেরে, সুইফট সাহিত্যকে তার সঙ্গীত পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুললেন।
র্যাবিট হোল আর চেশায়ার ক্যাটের হাসি দিয়ে সাজানো ১৯৮৯ অ্যালবামের “ওয়ান্ডারল্যান্ড” ছিল লুইস ক্যারলের প্রতি তার শ্রদ্ধাঞ্জলি; রেপুটেশন-এর “গেটঅ্যাওয়ে কার” শুরু হয় ডিকেন্সের বিখ্যাত সেই লাইনের অনুকরণে (“এটি ছিল সেরা সময়/সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ”); এবং ফোকলোর-এর “দ্য লেকস” ছিল লেক কবিদের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত। শীঘ্রই টিকটক ভিডিও থেকে শুরু করে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে টেইলর সুইফটের গানের সাহিত্যিক সমালোচনায় সয়লাব হয়ে গেল। কয়েকজন অধ্যাপক তো এমন যুক্তিও দিলেন যে আমাদের শেক্সপিয়ারের পাশাপাশি সুইফটকেও পড়া উচিত! এমনকি হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড ও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাঘা বাঘা প্রতিষ্ঠান তাদের ইংরেজি বিভাগে টেইলর সুইফটের ওপর পুরো সেমিস্টার কোর্স চালু করে বসল।
বুঝতেই পারছেন, একটা পর্যায়ে এসে আমি বিরক্ত হতে শুরু করলাম।
দেখুন, যার যা প্রাপ্য সম্মান তা আমি দিই। আমি আগেই বলেছি, সুইফট একজন স্বীকৃত গীতিকার এবং সম্ভবত আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা গীতিকার, যার তুমুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। তা সত্ত্বেও, সুইফট কোনো সাহিত্যিক প্রতিভার অধিকারী নন এবং তাকে সেভাবে বিবেচনা করাও উচিত নয়। শেক্সপিয়ারকে কেন সুইফট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত নয়, তা নিয়ে আমি আগেই লিখেছি। তাই আজ আর সেই সব অধ্যাপকদের সমালোচনা করব না যারা সুইফটকে কাব্যের জন্য পুলিৎজার পুরস্কার দিতে চান। বরং, বর্তমান সুইফটের সঙ্গে আমার সমস্যা হলো—তার এই সাহিত্যিক পরিচয়টা আগাগোড়াই মেকি। তিনি তার গানে অহেতুক সাহিত্যিক রেফারেন্স ব্যবহার করে এক ধরনের কৃত্রিম পাণ্ডিত্য জাহির করেন, অথচ তিনি যে মহান সাহিত্যকর্মগুলোর উল্লেখ করেন, সেগুলোর মূল ভাবটাই বুঝতে ব্যর্থ হন।
আমি বলছি না যে সুইফটকে সাহিত্যিক রেফারেন্স ব্যবহার করা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে—আমার প্রিয় কবি টি.এস. এলিয়টের মতো আমিও সাহিত্যিক অনুষঙ্গের ব্যবহার পছন্দ করি। কিন্তু সুইফটের ক্ষেত্রে যা আমাকে পীড়া দেয় তা হলো, তিনি সাধারণ শ্রোতাদের—যাদের সাহিত্যের অলিগলি সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই—সফলভাবে বিশ্বাস করিয়েছেন যে তিনি যেন এক সাহিত্য-প্রতিভাধর ইংরেজি শিক্ষক। এই ধারণাটি তিনি ২০২৪-এর দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট এবং তার সাম্প্রতিক বাগদানের পোস্টে আরও পোক্ত করেছেন। আমার কিছুটা আশা ছিল যে দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট হয়তো তথাকথিত যন্ত্রণাকাতর কবিদের প্রতি সুবিচার করবে, কিন্তু অ্যালবামে ডিলান থমাসের মতো কবিদের নাম ভাঙানো ছাড়া আর কিছুই নেই, যার সঙ্গে ওই কবিদের কাজের কোনো সম্পর্কই নেই।
অ্যালবামের সবচেয়ে স্পষ্ট সাহিত্যিক উল্লেখ পাওয়া যায় “দ্য অ্যালবাট্রস” গানে, যা নিশ্চিতভাবেই কোলরিজের দ্য রাইম অফ দ্য এনশিয়েন্ট মেরিনার-এর রেফারেন্স। তবে সুইফটের গানের কথাগুলো, সেই “লাভ স্টোরি”-র মতোই, কোলরিজের অ্যালবাট্রসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না—এমনকি রূপক অর্থেও নয়। তিনি অ্যালবাট্রসকে একজন “ফেম ফাতাল” বা সর্বনাশী নারী হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যে “তোমাকে ধ্বংস করতে এসেছে”। সুইফটের গানে অ্যালবাট্রস হয়ে দাঁড়ায় কেবল তিক্ততার প্রতীক, যেখানে মূল কবিতায় অ্যালবাট্রস পাপের ভয়াবহ ওজনের প্রতীক। কোলরিজের অ্যালবাট্রস হলো এক নিষ্পাপ প্রাণী, যাকে নিষ্ঠুর নাবিক হত্যা করে এবং পরে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। অন্যদিকে, সুইফট জটিল সাহিত্যিক রেফারেন্স ব্যবহার করে কেবল এক প্রতিশোধপরায়ণ নারীর ছবি এঁকেছেন, যা মূল রূপকের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না।
কেউ হয়তো ভেবেছিলেন দ্য টর্চার্ড পোয়েটস ডিপার্টমেন্ট-এর মিশ্র প্রতিক্রিয়া (যা সম্ভবত সুইফটের সবচেয়ে জঘন্য অ্যালবাম) তাকে এই ‘সদ্য পাস করা ইংরেজি অধ্যাপকের’ অভিনয় থেকে সরে আসার শিক্ষা দেবে। কিন্তু গতকাল, দ্য লাইফ অফ আ শোগার্ল-এ সুইফট আবারও ভুলভাল সাহিত্যিক রেফারেন্স নিয়ে হাজির হলেন। অ্যালবামটা খুলেই যখন “দ্য ফেট অফ অফেলিয়া” গানটা দেখলাম, তখনই বুঝলাম—এ নিয়ে একটা লেখা লিখতেই হবে।
আপনাদের জন্য “দ্য ফেট অফ অফেলিয়া”-র লিরিক্স তুলে ধরছি:
All that time
I sat alone in my tower
You were just honing your powers
Now I can see it all
Late one night
You dug me out of my grave and
Saved my heart from the fate of
Ophelia
ঠিক আছে, বুঝলাম। “অফেলিয়ার ভাগ্য” মানে তার আত্মহত্যা, তাই সুইফট এখানে দেখাচ্ছেন কীভাবে একজন পুরুষ (সম্ভবত তার বাগদত্তা ট্রাভিস কেলসি) তাকে সেই একই পরিণতি থেকে উদ্ধার করেছেন। কিন্তু এই সমান্তরালটুকু বাদ দিলে, এই গানের সঙ্গে হ্যামলেট-এর কী সম্পর্ক তা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। শেক্সপিয়ার নাটকের কোন অঙ্কে অফেলিয়াকে টাওয়ারে বন্দি রেখেছিলেন? তার পুরনো গানগুলোর—যেমন চমৎকারভাবে লেখা “অল টু ওয়েল”-এর—কথার সঙ্গে তুলনা করলে মনে হয়, সুইফট তার গান লেখার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। একজন সাবস্ট্যাক লেখক ইতিমধ্যেই অ্যালবামটিকে “হাস্যকর রকমের জঘন্য” বলে অভিহিত করেছেন, আর অন্যরা “উড” গানের নিচের লাইনগুলোর অসারতা নিয়ে কথা বলেছেন (যা নিয়ে আমি আর নতুন করে কিছু বলব না):
Redwood tree
It ain’t hard to see
His love was the key
That opened my thighs
টেইলর সুইফটের প্রতি আমার এই হতাশা বা বিরক্তি ঘৃণা থেকে আসেনি। আমি দুবার টিকেট কেটে তার লাইভ কনসার্ট দেখতে গেছি। হাইস্কুলে আমার কাছে টেইলর সুইফট-ব্র্যান্ডের নোটবুক আর অসংখ্য ট্যুর টি-শার্ট ছিল। আমি এমনকি এও বলতে পারি যে, আমার উত্তাল কৈশোরে লেখা কাঁচা কবিতার অনেকগুলোই হয়তো সুইফটের গানের অনুপ্রেরণায় লেখা। হাইস্কুল জীবনের প্রতিটি ক্রাশ এবং সেই সব বিনিদ্র রাত, যখন নিজেকে খুব তুচ্ছ আর একা মনে হতো—সবই আমি পার করেছি সুইফটের গান শুনে। আসলে আমি সুইফটের কাছ থেকে অনেক বেশি কিছু আশা করি, কারণ এই ব্যাপক খ্যাতির আগে তিনি এখনকার চেয়ে অনেক ভালো কাজ করেছেন। তার সেরা লিরিক্স এবং গীতিকার হিসেবে তার সাফল্য তখনই এসেছে, যখন তিনি জোর করে সাহিত্যিক রেফারেন্স ঢোকানোর চেষ্টা করেননি, বরং “অল টু ওয়েল”-এর মতো নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন। কিন্তু যেদিন থেকে তিনি নিজেকে ইংরেজি শিক্ষক ভাবতে শুরু করলেন, সেদিন থেকেই তিনি তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেললেন। তিনি এমন সব রেফারেন্স ব্যবহার করতে শুরু করলেন যা তিনি নিজেই পুরোপুরি বোঝেন না, এবং ব্রেকআপ গানের সঙ্গে সাহিত্যের গভীরতা মেশাতে গিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেললেন। বলাই বাহুল্য, এতে তার সঙ্গীতের মান ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার শুরুর দিকের অ্যালবামের গানগুলোর বৈচিত্র্যের তুলনায়, দ্য লাইফ অফ আ শোগার্ল-এর গানগুলো সব একই রকম শোনায়।
হয়তো আমি এখন সেই বয়স পার করে এসেছি যেখানে প্রেমিকের হাতে হৃদয় ভাঙাই জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা, তাই ভক্ত হিসেবে আমি সুইফটকে হারিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয় আমার এই মোহভঙ্গ—এবং আমার মতো অনেক প্রাক্তন ‘সুইফি’র হতাশা—আরও গভীর। সহজ কথায়, সুইফট যখন নিজের মতো থাকেন, তখনই তিনি সেরা। কিন্তু ইংরেজি শিক্ষকের মুখোশ পরে সুইফট এমন একজন সাজার চেষ্টা করছেন, যা তিনি নন। সুইফট একজন গায়িকা, একজন গীতিকার এবং একজন বিলিয়নেয়ার পপ তারকা। তিনি সাহিত্যের শিক্ষক নন, আর কখনও হবেনও না। তার গানে অহেতুক সাহিত্যিক রেফারেন্সের ভার চাপাতে গিয়ে সুইফট একজন প্রতিভাবান গীতিকার হিসেবে তার সেই জাদুকরী স্পর্শ হারিয়েছেন। এটা সত্যিই দুঃখজনক, কারণ যেসব তরুণী তার গান গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে, সুইফটের আরও পরিপক্ব লেখার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সত্যিকারের কাব্যবোধ জাগত পারত। তার বদলে, সুইফট এখন সাহিত্যিক মোড়কে এমন সব সস্তা কথা লিখছেন—যা অনেক সময় অশ্লীলতার পর্যায়ে চলে যায়।
অঢেল খ্যাতি আর অর্থের জোয়ারে ভেসে যাওয়া যেকোনো তরুণ প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পীর ভাগ্যেই এমনটা ঘটতে পারে। কিন্তু সুইফট এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার মধ্যেও নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেছিলেন প্রায় তিন-চার বছর আগ পর্যন্ত, যখন থেকে তার সঙ্গীতের মান হঠাৎ করেই কমতে শুরু করে। আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি যে, নিজেকে ‘ইংরেজি শিক্ষক’ হিসেবে জাহির করার এই চেষ্টার সঙ্গে তার গানের মান পড়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কিনা। তবে কারণ যা-ই হোক, এটা স্পষ্ট যে তার এই অবিরাম সাহিত্যিক রেফারেন্সের ব্যবহার তার সঙ্গীতের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই করছে বেশি।
সুইফট তখনই সেরা, যখন তিনি শুধুই সুইফট—কোনো অধ্যাপক নন। যদি তিনি প্রাসঙ্গিক থাকতে চান, তবে তাকে এই ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীর অভিনয় বাদ দিতে হবে এবং সেদিকেই মনোযোগ দিতে হবে যা তিনি সবসময় সবচেয়ে ভালো করে এসেছেন—হৃদয় নিংড়ে গান লেখা।