skip to content
গুলবাহার
তিন বছরের মিথ: কর্পোরেট দুনিয়ায় অপেক্ষার ফাঁদ

তিন বছরের মিথ: কর্পোরেট দুনিয়ায় অপেক্ষার ফাঁদ

• ৬ মিনিট

চাকরিটা গেল। তাদের ভাষায়—‘পদের বিলুপ্তি’ বা রোল এলিমিনেশন। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনটা বেশ বিক্ষিপ্ত, আঘাতটা এখনো দগদগে। বসের অবস্থাও অনেকটা আমার মতোই মনে হলো, যদিও পার্থক্য হলো তাঁর বেতন-ভাতা ঠিকঠাকই আছে, নেই শুধু আমার। তবু, মন খারাপের এই সময়টাই ভাবার উপযুক্ত সময়—কী ঠিক ছিল, আর কী আরও ভালো করা যেত। মস্তিষ্কে এই ট্রমার রেশ পুরোপুরি গেঁড়ে বসার আগেই হিসাবটা কষে নেওয়া ভালো।

এই চাকরিতে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে, তা আসলে পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে ধীরে ধীরে বুঝে আসা একটা নির্মম সত্য। এর নাম দেওয়া যাক “তিন বছরের মিথ”। ঠিক করেছি, ভবিষ্যতে এই ফাঁদে আর কখনোই পা দেব না। কারণ ক্যারিয়ারে যতবার এই টোপ গিলেছি, ততবারই পুড়েছি। কোম্পানি বড় হোক বা ছোট, জটিল হোক বা ছিমছাম, বিশাল শিল্পগোষ্ঠী হোক বা ক্ষুদ্র উদ্যোগ—মিথ বা অলিক স্বপ্নটা সব জায়গায় একই রকম: আপনি কিছু চাইলেন—হোক তা পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি, বা কাজের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন। উত্তর আসবে, “এখন সম্ভব নয়, তবে দু-তিন বছর অপেক্ষা করুন, তখন প্রাকৃতিকভাবেই সব হয়ে যাবে।”

আপনি হয়তো পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চান না (rock the boat), আবার সফলও হতে চান। তাই যা বলা হয়, মেনে নেন। কাজ চালিয়ে যান, কাজের অগ্রগতি দেখান, কোথায় ঘাটতি আছে তা-ও তুলে ধরেন—কিন্তু সবটাই চুপচাপ, লোকচক্ষুর আড়ালে। আপনি সময়ের অপেক্ষায় থাকেন, সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, ঠিক যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই চলেন। ওদিকে অন্যরা এগিয়ে যায়, সফল হয়, পদোন্নতি পায়। এক বছর পর যখন খোঁজ নেন, মনে করিয়ে দেওয়া হয়—“ঐ যে বললাম, দু-তিন বছর”। আপনার পারফরম্যান্স রিভিউ দুর্দান্ত, কাজে কোনো খুঁত নেই, কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা মিলছে না। সহকর্মীদের মিটিংয়ের ব্যস্ততা বাড়ছে, আর আপনার শুধু কাজের ফর্দটাই লম্বা হচ্ছে। আপনার কাজের অগ্রগতি বস বা টিমের কাছে প্রশংসিত হচ্ছে, হয়তো আরও ওপর মহলেও—কিন্তু কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলছে না। তবু বাইরের দুনিয়াটা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বেশ কঠিন, আর বেকারত্বের লাইনে দাঁড়ানোর চেয়ে মাস শেষে নিশ্চিত বেতন ঢের ভালো—তাই আপনি মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন।

তারপর হুট করেই ছাঁটাইয়ের সেই গোলাপি চিঠি (Pink slip) আসে। এটা সবসময় হঠাৎই আসে। আপনি যা বলা হয়েছিল সব করেছেন, ধৈর্যের সাথে অপেক্ষাও করেছেন। বিশ্বাস করেছিলেন প্রতিষ্ঠান আপনাকে প্রতিদান দেবে—অথচ আজ আপনি চাকরিহারা।

বেরিয়ে যাওয়ার সময় কানে আসে গুঞ্জন—আরেকজন আপনার দেখিয়ে দেওয়া কাজটাই করেছেন, কিন্তু আপনার চেয়ে কয়েক বছর পর। অথচ কৃতিত্ব, বোনাস, পদোন্নতি, স্বীকৃতি—সব তাঁর পকেটে। তিনি এখন সিনিয়র, লিড, ডিরেক্টর কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্ট।

আর আপনি বেকার।

অপেক্ষা করাটা ছিল একটা ধোঁকা। একটা ফাঁদ, আর আপনি তাতে পা দিয়েছিলেন।

প্রতিষ্ঠানগুলো ইচ্ছে করেই পরিবর্তনে দেরি করে। মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই স্থিতিশীলতা চায়। যেকোনো পরিবর্তন—তা ভালো বা মন্দ যাই হোক—যাদের বর্তমান ক্ষমতা বা স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি, তারা তা পছন্দ করেন না। এটা শুধু ব্যবসায় নয়; রাজনীতি, সরকার, প্রতিষ্ঠান—সবখানেই দেখা যায়। আমরা স্থিতিশীলতা পছন্দ করি।

নিরপেক্ষভাবে বলতে গেলে, পরিবর্তন না করার পেছনে তাদেরও কিছু ‘ভ্যালিড’ কারণ থাকে। হয়তো তাদের এমন কিছু ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি আছে যা রক্ষা করতে হলে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা জরুরি। হয়তো কোনো দাতা তাদের লাভজনক ফলাফলের জন্য টাকা ঢালছে, আর তার মাশুল দিচ্ছেন আপনি। অথবা সোজা কথায় তারা আপনাকে পছন্দ করে না—হয়তো আপনি তাদের ইগোতে আঘাত দিয়েছেন, কিংবা আপনার সফলতা তাদের ক্ষমতার জন্য হুমকি।

আপনাকে আটকে রাখার জন্য এগুলো সব হয়তো প্রযুক্তিগতভাবে বৈধ কারণ, কিন্তু মিথ্যা বলার কারণ নয়। মিথ্যা বলাটা একটা ‘চয়েস’ বা পছন্দ। এটা ইচ্ছাকৃত ক্ষতি।

আগের এক চাকরিতে ‘ফিন্যান্সিয়াল অপারেশনস’ (FinOps) চালু করার চেষ্টা করেছিলাম। তখন মুখের ওপর না করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ সে সময়ের মনোভাব ছিল “টাকা নিয়ে ভেবো না”। খরচের হিসাব রাখার বা জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করার আমার চেষ্টা তারা ভালোভাবে নেয়নি, যদিও আমি দেখিয়েছিলাম এতে আমার আওতাধীন এলাকাগুলোতেই লাখ লাখ ডলার সাশ্রয় হচ্ছে। প্রায় দু’বছর পর হঠাৎ সেই ফিনঅপস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল—কারণ তারা তখন মার্জিন বাড়াতে মরিয়া। ছাঁটাইয়ের কবলে পড়ে যেদিন আমার নেটওয়ার্ক অ্যাক্সেস বন্ধ হলো, সেদিনই লাইভস্ট্রিমে শুনলাম—অন্য বিভাগের এক সহকর্মী আমার আগের সেই আইডিয়াটাই হুবহু নকল করে বাহবা পাচ্ছেন। আমার পরিবর্তন বা প্রস্তাব ভুল ছিল না, কিন্তু সময়টা ছিল ক্ষমতার জন্য অসুবিধাজনক—আর সেটাই মনে রাখা হলো, আমি যে সময়ের আগে ভেবেছিলাম সেটা নয়।

কথায় আছে, “টাইমিং বা সময়ই সব”। অনেক সোর্স থেকে তথ্য নিই বলে প্রায়ই আমি অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকি; আমার ‘ওসিডি’ (OCD) স্বভাব আমাকে হাতের কাছে আসা সব কিছু অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করতে বাধ্য করে। সাম্প্রতিক এক উদাহরণ দিই—গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী একটা পণ্যের কম্পিউটিং অংশের আর্কিটেক্ট বা নকশা করতে বলা হয়েছিল। আমি লাইন বাই লাইন পড়েছিলাম (কোনো এআই সামারি নয়, নিজে পড়েছি!), এবং আমার কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে সেরা সমাধানটাই দিয়েছিলাম: একটা শক্তিশালী পিসি, পরিমিত মেমোরি, বেশ বড় এসএসডি এবং চারগুণ ক্ষমতাসম্পন্ন দ্রুতগতির সিপিইউ। আগের নকশায় যেখানে দুটো পিসি লাগত, আমি একটা দিয়েই সমাধান দিয়েছি—আধুনিক হার্ডওয়্যার এবং আসন্ন মেমোরি সংকটের কথা মাথায় রেখে (সেটা ছিল সেপ্টেম্বর/অক্টোবরের কথা, যখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়নি)। এটা কার্যকর এবং যুক্তিসংগত দামেই পাওয়া যাবে।

উল্টো আমাকে সতর্কবার্তা দেওয়া হলো। কারণ, এই প্রস্তাব (আমার অজান্তেই) এক সিনিয়র পরিচালকের ‘ভিশন’-এর পরিপন্থী ছিল—যা তিনি আমার মতামত নেওয়ার আগেই গ্রাহককে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, এবং আমি জানতে চাইলেও চেপে গিয়েছিলেন। বাজারের জন্য আমার টাইমিং বা সময়টা ছিল নিখুঁত, কিন্তু কোম্পানির ক্ষমতার কাঠামোর জন্য ছিল বড্ড খারাপ।

ক্ষমতাবান কেউ যখন আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেন, তখন তিনি মূলত দুটি কাজ করেন:

  • ১. আপনার উন্নতি ও সফলতার বিনিময়ে নিজের ক্ষমতা রক্ষা করেন।
  • ২. নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার সময় দেন, যাতে আপনি হেরে যান বা পড়ে যান।

মানুষের মিথস্ক্রিয়ায় ‘গেম থিওরি’ বিষয়টা আমি যতটা ঘৃণা করি (বিশদ বিবরণে না গিয়ে বলি—আমি প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতায় বিশ্বাসী মানুষ), ততই বুঝছি ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য এটা এখন প্রাসঙ্গিক। শুধু কারিগরি দক্ষতা দিয়ে আর বেশি দূর এগোনো যাবে না। যদি কর্পোরেট সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাই এবং বর্তমান নড়বড়ে অর্থনীতির বাজারে চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই, তবে নেতৃত্বের দক্ষতা নতুন করে শিখতে হবে। এর মানে গেম থিওরি বোঝা, ব্যক্তিগত, কারিগরি ও ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব করা এবং এগিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজা। ভেবেছিলাম বিভাগীয় স্বাধীনতা এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়ে এমন একটা পথ পেয়েছি, কিন্তু সেটা বুমেরাং হলো—স্টেকহোল্ডাররা যেকোনো পরিবর্তনে এতটাই হুমকি অনুভব করলেন যে, যেকোনো মূল্যে তা আটকাতে হবে।

তাই যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি—যখনই আমাকে অপেক্ষা করতে বলা হবে, সেটাকে আমি ক্যারিয়ারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখব এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। ফিডব্যাক ভালো, কাজের প্রশংসা হচ্ছে, কিন্তু তবু অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে—বিশেষ করে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, কোনো সদুত্তর ছাড়া—তাহলে বুঝতে হবে আপনাকে আর সম্পদ (asset) হিসেবে নয়, হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পেছন ফিরে তাকালে বুঝি, পদোন্নতির জন্য সব শর্ত পূরণ করার পরও “অপেক্ষা করুন” বলাটা ছিল একটা সংকেত—যে তখনই অন্য জায়গা খোঁজা শুরু করা উচিত ছিল। প্রক্রিয়া পরিবর্তনে সময় লাগবে বলা, কিন্তু ‘কেন’ তা না বলাটা ছিল একটা বিশাল সতর্কবার্তা বা ধোঁয়া—যা বলছিল আগুন শিগগিরই আমাকে গ্রাস করবে। জুনিয়র সিস-অ্যাডমিন থেকে পদোন্নতির জন্য তিন বছর ধরে “পদ খালি হবে” আশায় বসে থাকা, অথবা বিনা বেতনে-বিনা সুবিধায় এক বছর ম্যানেজারের কাজ করা ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার পদের আশায়—এই শিক্ষাগুলো তখনই নেওয়া উচিত ছিল। আমি স্বভাবতই সাহায্যপরায়ণ ও সহযোগিতামূলক, আর ভালো-মন্দ সব ধরনের মানুষই এর সুযোগ নেয়।

আসল কথা হলো—এখন আমি শিখেছি, এবং (আশা করি) আর এই ফাঁদে পা দেব না।

তাই চাকরির বাজারে ফিরে আসা এই সেকেলে ‘ডাইনোসর’-এর কথাটা মনে রাখুন: আজ যা আপনার অধিকার, তা আগামীকালের আশায় ছেড়ে দেবেন না।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. সন্ধ্যা বাঁচাতে এই ছোট অভ্যাসটি যথেষ্ট

    সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আলিক খিলাজেভ জানাচ্ছেন, কীভাবে কাজের সময় শেষে মাত্র ২০ মিনিটের একটি সহজ অভ্যাস সন্ধ্যা ও পরের দিনের কর্মদক্ষতা উভয়ই বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

    ক্যারিয়ারটিপসকর্পোরেট কালচার
  2. গুগলে ১৪ বছরে শেখা ২১টি বড় শিক্ষা

    গুগলের ১৪ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে অ্যাডি ওসমানি শেয়ার করেছেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ ২১টি শিক্ষা।

    ক্যারিয়ারপ্রযুক্তিগুগল
  3. চাকরিতে পদোন্নতির সেরা পরামর্শ

    পদোন্নতি পেতে চান? আপনার বসের কাজ নিজের ওপর নিয়ে নিন। এই কার্যকর পরামর্শই অনেককে নিয়ে গেছে সাফল্যের শীর্ষে।

    ক্যারিয়ারলিডারশিপচাকরি