skip to content
গুলবাহার

বিরক্তিই আমাকে লেখক বানিয়েছে: অ্যাগাথা ক্রিস্টির দুর্লভ সাক্ষাৎকার

• ৭ মিনিট

একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে অ্যাগাথা ক্রিস্টির লেখা খুনের রহস্য বা ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ পাঠকদের মন জয় করে আসছে। কিন্তু মৃত্যুর ৫০ বছর পরেও তিনি নিজেই রয়ে গেছেন এক রহস্যময়ী। ১৯৫৫ সালের একটি দুর্লভ বিবিসি সাক্ষাৎকারে উন্মোচিত হয়েছে তাঁর জীবনের কিছু অজানা অধ্যায়। জানা গেছে, নিজের গল্পের চরিত্রগুলোর মতোই জটিল ছিলেন এই লেখক।

সাদামাটা চেহারার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে ওস্তাদ ছিলেন ডেম অ্যাগাথা ক্রিস্টি। তাঁকে দেখলে মনে হতো পশমি কোট পরা, বাগান করতে পছন্দ করা এবং ভালো খাবার ও কুকুর ভালোবাসার এক বন্ধুসুলভ বৃদ্ধা। কিন্তু এই ছিমছাম ছদ্মবেশের আড়ালেই তিনি উপভোগ করতেন বিষপ্রয়োগ, বিশ্বাসঘাতকতা আর রক্তপাতের মতো সব রোমহর্ষক গল্প লিখতে। নিজের সৃষ্টিশীল মনের অন্দরমহল সম্পর্কে খুব কমই আভাস দিতেন তিনি। লাজুক স্বভাবের ক্রিস্টি ১৯৫৫ সালে লন্ডনের ফ্ল্যাটে বসে একটি বিরল রেডিও সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। সেখানে তিনি জানান, কীভাবে তাঁর বিচিত্র শৈশব তাঁর কল্পনাশক্তিকে শানিত করেছিল, কেন নাটক লেখা তাঁর কাছে উপন্যাসের চেয়ে সহজ মনে হতো, আর কীভাবে তিনি মাত্র তিন মাসে একটি বই শেষ করতেন।

১৮৯০ সালে এক ধনী পরিবারে অ্যাগাথা মিলার হিসেবে জন্ম নেওয়া ক্রিস্টির শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ে উঠেছিল মূলত বাড়িতেই। লেখালেখি শুরু করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, “আমি এর পুরো কৃতিত্ব দেব আমার প্রথাগত শিক্ষা না থাকার বিষয়টিকেই। হয়তো বলা ভালো, প্যারিসে ১৬ বছর বয়সে আমি স্কুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগে, সামান্য অঙ্ক শেখা ছাড়া আমি তেমন কোনো পড়াশোনাই করিনি।”

ক্রিস্টি তাঁর শৈশবকে বর্ণনা করেছিলেন “দারুণ অলস” একটি সময় হিসেবে, যদিও পড়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। “আমি কল্পনায় নিজেকে নানা গল্পে আর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে দেখতাম। আর লেখার জন্য একঘেয়েমির চেয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। তাই ১৬-১৭ বছর বয়সে আমি বেশ কিছু ছোটগল্প আর একটা দীর্ঘ, নিরস উপন্যাস লিখেছিলাম।” প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসটি তিনি শেষ করেছিলেন ২১ বছর বয়সে। বেশ কয়েকবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় দ্য মিস্টেরিয়াস অ্যাফেয়ার অ্যাট স্টাইলস—যেখানে প্রথম আবির্ভাব ঘটে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি এরকুল পোয়ারোর (হারকিউল পয়রো)।

গল্পে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতিটি এসেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। প্রথম স্বামী আর্চি ক্রিস্টি ফ্রান্সে মোতায়েন থাকাকালীন তিনি দেশে আহত সৈন্যদের হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী সেবিকা হিসেবে কাজ করেন। পরে হাসপাতালের ডিসপেনসারিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার সুবাদে ওষুধ আর বিষ সম্পর্কে তাঁর গভীর জানাশোনা তৈরি হয়। তাঁর গল্পে ৪১টি হত্যা, হত্যাচেষ্টা আর আত্মহত্যার ঘটনায় বিষের প্রয়োগ দেখা গেছে।

ক্রিস্টির স্বভাবসিদ্ধ ফর্মুলাটি শুরু হয় একই সামাজিক পরিমণ্ডলের একদল সন্দেহভাজনকে নিয়ে—যেন একটা বদ্ধ বৃত্ত। সেখানে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত গড়ায় চরম এক মুখোমুখি অবস্থানে। কেন্দ্রে থাকেন একজন গোয়েন্দা—পোয়ারো বা মিস মারপলের মতো—যিনি রহস্য উন্মোচন করেন আর শেষ দৃশ্যে সবার সামনে সত্যিটা তুলে ধরেন। এই পরিচিত কিন্তু অসীমভাবে পরিবর্তনযোগ্য কাঠামোই ক্রিস্টির লেখার চিরন্তন আকর্ষণের অন্যতম কারণ।

১৯২৬ সালে তিনি প্রকাশ করেন দ্য মার্ডার অব রজার অ্যাক্রয়েড—যা তাঁর পেশাগত অবস্থান শক্ত করে, যদিও সেই বছর তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। প্রিয় মায়ের মৃত্যুর পর আর্চি স্বীকার করেন যে তিনি অন্য এক নারীর প্রেমে পড়েছেন এবং বিবাহবিচ্ছেদ চান। শোক আর ‘রাইটার্স ব্লক’-এ ভুগতে থাকা ক্রিস্টি নিজেই হয়ে ওঠেন এক রহস্যের বিষয়। ডিসেম্বরের এক হিমশীতল রাতে সারের (Surrey) এক নির্জন স্থানে তাঁর দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ি পাওয়া যায়—যা একটি খাদের কিনারে বিপজ্জনকভাবে ঝুলে ছিল। পুলিশ গাড়িতে তাঁর পশমের কোট আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়, কিন্তু তাঁর কোনো হদিস মেলে না।

ব্রিটেনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘নিখোঁজ ব্যক্তি অনুসন্ধান’ অভিযান শুরু হয়। সংবাদপত্রের জন্য এটি ছিল হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ঘটনা—রহস্যময় সব সূত্র রেখে উধাও হওয়া বিখ্যাত ক্রাইম ঔপন্যাসিক, সাত বছরের মেয়েকে ফেলে যাওয়া, আর সুদর্শন স্বামীর সঙ্গে অন্য নারীর সম্পর্ক। শার্লক হোমসের স্রষ্টা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল পর্যন্ত এতে জড়িয়ে পড়েছিলেন—তিনি এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম বা সাইকিক-কে ভাড়া করেছিলেন অ্যাগাথার একটি দস্তানা ব্যবহার করে তাঁর খোঁজ পেতে।

দশ দিন পর তাঁকে পাওয়া যায় দুর্ঘটনাস্থল থেকে ২৩০ মাইল দূরে নর্থ ইয়র্কশায়ারের হারোগেটের একটি হোটেলে। এ নিয়ে শুরু হয় নানা গুঞ্জন—স্মৃতিশক্তি হারানো, স্বামীকে বিব্রত করার পরিকল্পিত চেষ্টা, নাকি নিছক প্রচারণার কৌশল? ক্রিস্টি তাঁর আত্মজীবনীতে এই রহস্যের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি, শুধু লিখেছিলেন, “অসুস্থতার পর এল দুঃখ, হতাশা আর হৃদয়ভাঙা। এ নিয়ে বেশি বলার কিছু নেই।”

কাজের ধরন নিয়েও তিনি ছিলেন একই রকম সরল—১৯৫৫ সালে বিবিসিকে বলেছিলেন, “হতাশাজনক হলেও সত্যি যে, আমার কোনো বিশেষ পদ্ধতি নেই। বছরের পর বছর ধরে রাখা আমার পুরনো বিশ্বস্ত টাইপরাইটারে আমি নিজেই টাইপ করি। ডিক্টাফোন হয়তো ছোটগল্প বা নাটকের কোনো অংশ পুনর্লিখনে কাজে লাগে, কিন্তু উপন্যাসের জটিল কাজে নয়।”

ক্রিস্টির কাছে লেখার আসল আনন্দ ছিল জটিল প্লট তৈরিতে। তিনি বলেছিলেন, “আমার মনে হয় আসল কাজটা হলো গল্পের বিকাশ নিয়ে ভাবা এবং গল্পটা ঠিকঠাক না দাঁড়ানো পর্যন্ত সেটা নিয়ে চিন্তা করা। এতে বেশ সময় লাগতে পারে। তারপর যখন সব উপকরণ গুছিয়ে নেওয়া যায়, তখন শুধু সময় বের করে লেখাটা লিখতে হয়। তিন মাসে একটি বই শেষ করা আমার কাছে বেশ যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, যদি একেবারে মনোযোগ দিয়ে লেখা যায়।”

১৯৫৫ সালের সেই রেডিও প্রোফাইলে তাঁর বিখ্যাত নাটক দ্য মাউসট্র্যাপ-এর প্রযোজক ও থিয়েটার ব্যক্তিত্ব স্যার পিটার সন্ডার্স বলেছিলেন, ক্রিস্টির মাথায় দৃশ্যগুলো পুরোপুরি সাজানো থাকত এবং গল্প তৈরির এক অসাধারণ গুণ ছিল তাঁর। “আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘নতুন নাটকটা কেমন চলছে?’ তিনি বললেন, ‘শেষ’। কিন্তু পড়তে চাইলে তিনি বললেন, ‘ও, আমি ওটা লিখিনি।’ তাঁর কাছে নাটকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু মানসিকভাবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কাগজে-কলমে লেখাটা ছিল কেবল শারীরিক শ্রমের ব্যাপার।”

এই মতকে সমর্থন করেছিলেন পেঙ্গুইন বুকসের প্রতিষ্ঠাতা স্যার অ্যালান লেন। ২৫ বছরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে তিনি কখনোই “তাঁর টাইপরাইটারের শব্দ শোনেননি… অবিশ্বাস্য পরিমাণ ও মানসম্মত লেখা উপহার দেওয়া সত্ত্বেও।” তিনি বলেছিলেন, মেসোপটেমিয়ার মরুভূমিতে প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানের দৈনন্দিন কাজ সামলানো বা সন্ধ্যায় সেলাই-বুননের কাজ—“এই সব করতে করতেই তাঁর মাথায় নতুন কোনো নাটক বা উপন্যাসের কাঠামো তৈরি হতো।”

ক্রিস্টি মনে করতেন উপন্যাস তিন মাসে শেষ করা যায়, কিন্তু নাটক “দ্রুত লেখা ভালো”। ১৯৫৫ সালের বিবিসি প্রোফাইলের সময় তাঁর তিনটি নাটক লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডে মঞ্চস্থ হচ্ছিল। দ্য মাউসট্র্যাপ তখনই বক্স অফিসে রেকর্ড গড়ছিল—মঞ্চায়নের মাত্র তিন বছরের মাথায়। এই নাটকটি শুরু হয়েছিল বিবিসি রেডিওর নাটক থ্রি ব্লাইন্ড মাইস হিসেবে, যা ১৯৪৭ সালে রানি মেরির ৮০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে সম্প্রচারিত হয়।

নাটক লেখা “বই লেখার চেয়ে অনেক বেশি মজার”, ছিল ক্রিস্টির মত। তিনি বলেছিলেন, “স্থান বা মানুষের দীর্ঘ বর্ণনা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, উপাদানের বিন্যাস নিয়েও ভাবতে হয় না। আর মেজাজ ধরে রাখতে এবং সংলাপ যেন স্বাভাবিকভাবে এগোয়—সেজন্য বেশ দ্রুত লিখতে হয়।”

১৯৭৩ সালে লন্ডনের সাভয় হোটেলে দ্য মাউসট্র্যাপ-এর ২১তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ক্রিস্টি। সেখানে ছিলেন নাটকের মূল অভিনেতা রিচার্ড অ্যাটেনবরো, যিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এটি “আরও ২১ বছর চলতে পারে”। তিনি যোগ করেছিলেন, “আমি একে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের সঙ্গে তুলনা করব না, কিন্তু নিশ্চয়ই আমেরিকানরা মনে করে লন্ডনে এলে দ্য মাউসট্র্যাপ দেখাটাই করণীয়।” ১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় ধরে চলা নাটকে পরিণত হওয়ার পর একে থামাতে পেরেছিল শুধু ২০২০ সালের কোভিড মহামারি। ২০২৫ সালের মার্চে এর ৩০,০০০তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, আর আজও তা চলমান।

অ্যাটেনবরোকেও ১৯৫৫ সালের বিবিসি প্রোফাইলে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায়, যেখানে তিনি বলেছিলেন ক্রিস্টি ছিলেন “পৃথিবীর শেষ ব্যক্তি, যাকে অপরাধ বা হিংস্রতার সঙ্গে মেলানো যায়”। তাঁর চিরন্তন রহস্যের সারাংশ টেনে তিনি বলেছিলেন, “আমরা কেবল এই ভেবেই অবাক হতাম যে, এই শান্ত, নিখুঁত ও মর্যাদাশীল নারী কীভাবে আমাদের শিহরিত করতে পারেন, আর গোটা পৃথিবীকে তাঁর থ্রিলারের দক্ষতা আর ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির গুণে মুগ্ধ করতে পারেন।”

ক্রিস্টির বিবিসি সাক্ষাৎকার তাঁর লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে এক আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি দেয়—বাঁধাধরা নিয়মের অভাব, কল্পনার ওপর নির্ভরশীলতা, প্লট বানানোর আনন্দ—কিন্তু এই নারীর রহস্য আজও অমলিন।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. টেইলর সুইফটের ইংরেজি শিক্ষক পরিচয়

    টেইলর সুইফটের সাহিত্যিক রেফারেন্স নিয়ে এক সময়কার ভক্তের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। কীভাবে ইংরেজি শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় তার সঙ্গীতের মান কমিয়েছে।

    টেইলর সুইফটসঙ্গীতসাহিত্য
  2. মৃত্যুর আগে পড়তে হবে এমন ১০০টি ক্লাসিক উপন্যাসের নির্ভরযোগ্য তালিকা

    স্টিফেন থমাসের বিতর্কিত বইয়ের তালিকার জবাবে লিজা প্রস্তুত করেছেন ১০০টি ক্লাসিক উপন্যাসের নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত তালিকা। রয়েছে দস্তয়েভস্কি, টলস্টয়, ফকনারসহ বিশ্বসাহিত্যের সেরা কীর্তি।

    সাহিত্যবইপড়াক্লাসিক উপন্যাস
  3. সাহিত্যকে একা ছেড়ে দিন

    কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীর চোখে আধুনিক সাহিত্য পাঠের সংকট। রাজনীতি আর তত্ত্বের জালে আটকা সাহিত্যচর্চার কথা।

    সাহিত্যশিক্ষাসংস্কৃতি