skip to content
গুলবাহার
ডলমার থালা

ডলমা: পৃথিবীর মন কাড়া স্টাফড খাবারের গল্প

• ৭ মিনিট

সৌদি আরবের রিয়াদে যখন ফাতিমা ওলিয়ান ঘরোয়া আয়োজনে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন, তখন তাঁর মেনুতে প্রায়শই থাকে ‘ওয়ারাক এনাব’-স্টাফড গ্রেপ লিফ বা ডলমা। নিপুণভাবে ভাঁজ করা এই আঙুর পাতায় ভরা থাকে সুগন্ধি চাল, মাংস ও সবজির মিশ্রণ। চওড়া থালায় সাজিয়ে তার ওপর লেবুর রস ছিটিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়।

“বাড়িতে ডলমা বানাতে আমার ভীষণ ভালো লাগে,” বলেন ওলিয়ান। “আমাদের পরিবারে বহু প্রজন্ম ধরে এই খাবার তৈরি হয়ে আসছে। কোনো উৎসবের খাবারের থালা এটি ছাড়া কল্পনাই করতে পারি না।” তাঁর কাছে ডলমা কেবল একটি খাবার নয়; এক কামড়েই যেন ভালোবাসা, ও আতিথেয়তার স্বাদ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বসবাসকারী এই লেখকের কাছেও টক স্বাদের গ্রেপ লিফ ডলমা বিশেষ পছন্দের। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে, যখন সূর্যাস্তের পর শহরের ভোজনরসিকরা জেগে ওঠেন। ইফতারে এক রেস্তোরাঁ থেকে অন্য রেস্তোরাঁয় ঘুরে, কিংবা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে প্রতি রাতে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের ডলমা চেখে দেখতে ভালো লাগে-কখনো ঝাল, কখনো টক, আবার কখনোবা নিরামিষ।

তবে রিয়াদের ডাইনিং টেবিলে এই ছোট ছোট ভিন্নতার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ইতিহাস। এটি এমন এক খাবার, যা মহাদেশ ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে উদারতা ও আতিথেয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ডলমার কালজয়ী বিশ্বজনীন গল্প

ডলমা-তুর্কি শব্দ ‘Dolmak’ (দোলমাক) থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ ‘ভর্তি করা’ বা ‘ঠাসা’। এটি মূলত খাবারের এমন একটি বিশাল পরিবারকে বোঝায়, যেখানে চাল, মাংস, সবজি ও মসলা আগে থেকে সেদ্ধ করা পাতায় মুড়িয়ে কিংবা ফাঁপা ফল-সবজিতে পুর হিসেবে ভরে বেক করা, রান্না করা বা সরাসরি পরিবেশন করা হয়। ধারণা করা হয়, পঞ্চদশ শতকে অটোমান সাম্রাজ্যের রান্নাঘরেই এই রন্ধনশৈলীর জন্ম।

‘বাউন্টিফুল এম্পায়ার: আ হিস্ট্রি অব অটোমান কুইজিন’ (Bountiful Empire – A History of Ottoman Cuisine) বইয়ের লেখক প্রিসিলা মেরি ইসিন বলেন, “অটোমানরা সত্যি সত্যিই কোনো কিছুর ভেতরে পুর ভরার কৌশলের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। সবজি ও প্রাণীর ভেতর পুর ভরা নতুন কিছু ছিল না; মানুষ বহু শতাব্দী ধরেই এটি করত। কিন্তু পঞ্চদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে ভেড়ার মাংস থেকে শুরু করে বন্য পাখি, ম্যাকেরেল মাছ, পেঁয়াজ, আপেল আর আঙুর পাতা-সবকিছুই পুরভরা খাবারে রূপান্তর করা হতো। এর ফলেই ডলমার এক অসাধারণ বৈচিত্র্যের জন্ম হয়।”

এই অভ্যাসের পেছনে ধর্মীয় চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাম্রাজ্যে বাইজান্টাইন খ্রিস্টানদের বড় একটি জনগোষ্ঠী বসবাস করত, যারা বছরে প্রায় ১৮০ দিন উপবাস বা রোজা রাখত এবং প্রাণীজ খাবার এড়িয়ে চলত। “এই সময়েই স্টাফড বা পুরভরা পাতা ও সবজির প্রচলন বাড়তে থাকে,” ব্যাখ্যা করেন ইসিন। রাঁধুনিরা মাংস ছাড়া পেটভরা খাবার বানানোর ‘সৃজনশীল’ (Creative) উপায় খুঁজে বের করেছিলেন।

সাম্রাজ্যের রাজদরবারও এই নতুনত্বের চালিকাশক্তি ছিল। ‘মাতবাহ-ই আমিরে’ বা রাজকীয় রান্নাঘর প্রতিষ্ঠার ফলে এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে রাঁধুনিরা সুলতান ও তাঁর পরিষদকে মুগ্ধ করতে নিরন্তর স্বাদ ও কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। অটোমান সাম্রাজ্যের বিশালতা এই সৃজনশীলতাকে আরও ত্বরান্বিত করে-পশ্চিমে আলজেরিয়া থেকে উত্তরে ভিয়েনা, পূর্বে পারস্য উপসাগর থেকে দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত এই সাম্রাজ্য ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক ও কৃষি ঐতিহ্যকে একসুতোয় গেঁথেছিল। ইসিন বলেন, “এই অঞ্চলগুলোর সবজি ইস্তাম্বুলের রান্নাঘরে আসত, যেখানে সেগুলো ফাঁপা করা হতো, পুর ভরা হতো এবং নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হতো।”

নতুনত্বের গতি এতটাই তীব্র ছিল যে, খাদ্য ইতিহাসবিদ চার্লস পেরি একে সাম্রাজ্যজুড়ে “ডলমা রেসিপির সৃজনশীল বিস্ফোরণ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সপ্তদশ শতকে ডলমা প্রিয় খাবারের পাশাপাশি মর্যাদার প্রতীকও হয়ে ওঠে। ইসিন জানান, “ধনী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিশেষজ্ঞ ‘ডলমা’ রাঁধুনি নিয়োগ করতে শুরু করেন। এমনকি এই সময়ে ইস্তাম্বুলে শুধু ডলমার জন্য নিবেদিত রেস্তোরাঁও গড়ে ওঠে।”

উৎসবের সঙ্গে এর সংযোগ ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ডলমার পুর তৈরিতে ব্যবহৃত চাল অটোমান রন্ধনশৈলীতে বিলাসিতা হিসেবে বিবেচিত হতো এবং প্রায়শই তা উচ্চবিত্তের জন্য সংরক্ষিত থাকত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোলাও ও ডলমার মতো চাল-ভিত্তিক খাবার ঈদ ও রমজানের সন্ধ্যার বিশেষ খাবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যায়-যা প্রাচুর্য ও উৎসবের প্রতীক হয়ে ওঠে।

কীভাবে ডলমা অটোমান বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে

অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডলমা সীমানা পেরিয়ে ভূমধ্যসাগর, ককেশাস, বলকান, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ঠিকানা খুঁজে নেয়। যাত্রাপথে এটি পায় নতুন নাম ও নতুন পরিচয়।

স্টাফড গ্রেপ লিফ উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘ওয়ারাক এনাব’, কুর্দিস্তানে ‘ইয়াপরাখ’, আজারবাইজানে ‘ইয়ারপাক ডলমাসি’ ও গ্রিসে ‘ডলমাদেস’ নামে পরিচিতি পায়। স্টাফড বা পুরভরা সবজি লেভান্ট ও মিশরে ‘মাহশি’ নামে পরিচিত। শীতপ্রধান অঞ্চলে আঙুর পাতার পরিবর্তে বাঁধাকপি ব্যবহার করা শুরু হয়-এভাবেই পোল্যান্ডের ‘গোওয়াবকি’ ও বুলগেরিয়ার ‘সারমি’-র জন্ম হয়।

ডলমার এক অপ্রত্যাশিত যাত্রা তাকে উত্তরে সুইডেন পর্যন্ত নিয়ে যায়। ১৭০৯ সালে পোলতাভার যুদ্ধে রাশিয়ার কাছে হারের পর সুইডিশ রাজা দ্বাদশ চার্লস (Charles XII) পাঁচ বছর অটোমান ভূমিতে নির্বাসনে কাটান। স্টাফড খাবারের স্বাদ নিয়ে তিনি যখন দেশে ফেরেন, সঙ্গে নিয়ে আসেন একদল রাঁধুনি। তারা স্টাফড ক্যাবেজ রোল বা বাঁধাকপির রোল তৈরি করে স্থানীয় স্বাদে খাপ খাইয়ে নেন-এভাবেই জন্ম হয় সুইডিশ ডিশ ‘কোলডলমার’-এর।

“আমরা তুর্কি ডলমার চেয়ে কোলডলমার মিষ্টি সংস্করণটি বেশি পছন্দ করি,” বলেন স্টেফান একেংরেন-যিনি একাধারে রাঁধুনি, রেস্তোরাঁ মালিক ও রান্নার বইয়ের লেখক। “আমাদেরটা প্রায়শই ‘লুস সিরাপ’ (Ljus Sirap)-বেকিং ও স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী সুইডিশ সিরাপ-দিয়ে সাজানো হয় এবং লিংগনবেরি দিয়ে পরিবেশন করা হয়।”

পূর্ব দিকে ডলমা ভারতেও নতুন ঠিকানা খুঁজে পায়। ষোড়শ শতকে কলকাতায় বসবাসকারী আর্মেনিয়ান বণিকরা স্টাফড সবজির ধারণা স্থানীয় রান্নাঘরে নিয়ে আসেন। বাংলার রাঁধুনিরা এক ধাপ এগিয়ে পটল-এ অঞ্চলের স্থানীয় সবজি-মাছ, চিংড়ি, আলু, পোস্তদানা বাটা, কিশমিশ ও ছানা দিয়ে ভর্তি করে সুগন্ধি তরকারিতে রান্না করেন। ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয় ‘পটলের ডলমা’-যা পশ্চিমবঙ্গের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।

উৎসবের খাবার

রোলিং ডলমা

ডলমা যেখানেই গেছে, সেখানকার আবহাওয়া, ফসল ও সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কিন্তু যা অপরিবর্তিত থেকেছে, তা হলো উৎসব ও পারিবারিক আয়োজনে এর বিশেষ স্থান-ভালোবাসা ও একত্রিত হওয়ার প্রতীক হিসেবে।

আজও রমজানে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যে ইফতারের থালার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ওয়ারাক এনাব। কুর্দিস্তানে নওরোজ উৎসবে ইয়াপরাখ অবিচ্ছেদ্য অংশ। একেংরেন বলেন, “সুইডেনে পরিবারের সবাই যখন টেবিলে একত্রিত হয়ে দুপুরের খাবার খায়, তখন এই হৃদয়গ্রাহী খাবারটি খেতে ভালোবাসে।”

বুলগেরিয়ায় বড়দিনের আগের রাত ও নববর্ষে ‘সারমি’ তৈরি করা হয়; আর ভারতে দুর্গাপূজা-অঞ্চলটির সবচেয়ে বড় হিন্দু উৎসবে-পটলের ডলমা প্রায়শই পারিবারিক ভোজের অন্যতম আকর্ষণ।

“পটলের ডলমা ছাড়া কোনো ভোজের কথা ভাবতেই পারি না,” বলেন কলকাতার বাসিন্দা ও ভ্রমণ ব্লগ ‘শু-স্ট্রিং ট্রাভেল’ (Shoestring Travel)-এর প্রতিষ্ঠাতা তনয়েশ তালুকদার। তাঁর এই উক্তি প্রমাণ করে, অটোমান-অনুপ্রাণিত এই খাবারটি কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে মিশে গেছে।

ডলমার এত বিশেষ স্থান ধরে রাখার অন্যতম কারণ হলো এটি তৈরিতে যে পরিশ্রম লাগে। তালুকদার বলেন, “পুর তৈরি করা, সবজির ভেতরের অংশ সাবধানে বের করা এবং তাতে পুর ভরা-সবই ধৈর্যের কাজ। তাই আমরা একে বিশেষ উৎসব ও অনুষ্ঠানের জন্য তুলে রাখি।”

রমজানে ওলিয়ান প্রায়শই একা ডলমা তৈরি করেন না। তিনি বলেন, “শাশুড়ি ও আমি সাধারণত টেবিলে বসি। একজন পাতা প্রস্তুত করে, অন্যজন পুর বানায়, আর বাকিরা ভাঁজ করে। সবাই মিলে এটি করা বেশ মজার এবং এর ফলে আমাদের গল্প করার ও সময় কাটানোর সুযোগ হয়।”

সবাই মিলে ডলমা তৈরির এই প্রথা-যা আজারবাইজানে ইউনেস্কোর বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত-সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। প্রায়শই পরিবারের মুরব্বিরা উৎসবের আয়োজনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেন।

অনেকের কাছে ডলমা নস্টালজিক বা স্মৃতিকাতর অনুভূতির জন্ম দেয়। “মাছ ও কিশমিশ দিয়ে ভর্তি পটলের ডলমা আমার ভীষণ পছন্দ; এটি আমার দাদিমা বানাতেন,” বলেন তালুকদার। “তাঁকে দেখতে গেলে আমি বাড়তি খাবার চাইতাম এবং অন্য খাবার থাকলেও শুধু এটিই ভাতের সঙ্গে খেতাম।”

কয়েক বছর আগে দাদি মারা গেলেও তাঁর হাতের ডলমার স্মৃতি এখনো তালুকদারের মনে অমলিন। তিনি যোগ করেন, “আমি এখনো সেই একই স্বাদ খুঁজে বেড়াই।”

ইসিনের কাছে এই খাবার তাঁর শাশুড়ি ও খালুর স্মৃতি জাগায়, যারা ইস্তাম্বুলে প্রথম আসার সময় তাঁকে ডলমা বানানোর কলাকৌশল শিখিয়েছিলেন।

‘সুইডিশ স্পুন’-এর খাদ্যবিষয়ক লেখক ইসাবেল ফ্রেডবর্গের কাছে এটি তাঁর দাদুর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। তাঁর দাদু একবার এক স্কুলবন্ধুর সঙ্গে কোলডলমার খাওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন। “বমি বমি ভাব না আসা পর্যন্ত দুজনেই ১২টি করে কোলডলমার খেয়েছিলেন,” হাসিমুখে বলেন তিনি। “অবশ্য এরপর দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।”

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সীমানা পেরিয়ে নতুন নতুন ভূখণ্ডে খাপ খাইয়ে নিলেও ডলমা তার মূল কাজটি ঠিকই বজায় রেখেছে: মানুষকে একত্রিত করা এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি জাগানো। রমজানের ইফতারে, বড়দিনের ভোজে কিংবা পারিবারিক পুনর্মিলনে-ডলমার থালার পেছনের বার্তাটি সহজ ও শাশ্বত: “আপনাকে জানাই স্বাগতম এবং ভালোবাসা।”

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

২টি লেখা
  1. রমজানে ইংলিশ ফুটবলে ইফতারের জন্য বিরতির ব্যবস্থা

    প্রিমিয়ার লিগ ও ইংলিশ ফুটবল লিগে রমজানে মুসলিম খেলোয়াড়দের ইফতারের জন্য ম্যাচে সংক্ষিপ্ত বিরতির ব্যবস্থা চলমান থাকবে।

    ফুটবলপ্রিমিয়ার লিগরমজান
  2. সাহিত্যকে একা ছেড়ে দিন

    কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক ছাত্রীর চোখে আধুনিক সাহিত্য পাঠের সংকট। রাজনীতি আর তত্ত্বের জালে আটকা সাহিত্যচর্চার কথা।

    সাহিত্যশিক্ষাসংস্কৃতি