skip to content
গুলবাহার

প্রথম ব্রিটিশ মুসলিম লর্ড

• ৬ মিনিট

প্রায় দুই শতাব্দী আগে জন্ম নিয়েছিলেন এক ব্রিটিশ অভিজাত, যিনি পরবর্তী সময়ে হাউস অব লর্ডসের প্রথম মুসলিম সদস্য হন। অথচ লর্ড হেনরি স্ট্যানলির নাম এখনও অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা। ১৮৫৯ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইতিহাসবিদ জেমি গিলহামের মতে, এই সিদ্ধান্তটি ছিল “তৎকালীন সমাজের রীতিনীতি ও পরিবারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে”।

স্ট্যানলির চিঠি ও ডায়েরির খুব কম অংশই এখন টিকে আছে। “এটি সত্যিই হতাশাজনক। তবে এর মাধ্যমে এটাও বোঝা যায় যে, তিনি ছিলেন বেশ নিভৃতচারী স্বভাবের মানুষ,” মন্তব্য করেন গিলহাম।

মধ্যযুগ থেকে বিদেশ ভ্রমণের সময় কিছু সংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু গিলহামের মতে, স্ট্যানলি ছিলেন ব্যতিক্রম—কারণ তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং চেশায়ার ও অ্যাঙ্গলসিরে নিজের জমিদারিতে তাঁর ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল।

১৮২৭ সালে জন্ম নেওয়া স্ট্যানলি ছিলেন দশ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। বাবা-মা সন্তানদের নিজেদের চিন্তা ও বিশ্বাস গড়ে তোলার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এই অভিজাত পরিবারের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস নরমান আমল পর্যন্ত বিস্তৃত। ভিক্টোরিয়ান যুগে এই পরিবারের সদস্যরা খ্রিস্টান ধর্মের বিভিন্ন মতবাদের অনুসারী ছিলেন এবং অন্তত একজন ইহুদি ধর্মাবলম্বী ছিলেন।

পরিবারের ইতিহাসবিদ ও বর্তমান লর্ড স্ট্যানলির স্ত্রী লেডি কার্লা স্ট্যানলি বলেন, তাঁরা ছিলেন “মুক্তচিন্তার” মানুষ। শিক্ষিত ও বিশ্বভ্রমণকারী মায়েদের সন্তান হিসেবে তাঁরা ছিলেন “কাজের মানুষ”। কার্লা বলেন, “তর্ক-বিতর্ক ছিল গ্রহণযোগ্য। চিন্তাভাবনা, বিতর্ক, আলোচনা—সবই চলত। ‘আমার জমি থেকে সরে যাও, আমি শিকারে যাচ্ছি’—এমন অমার্জিত মনোভাব তাঁদের ছিল না।”

অনেক শিক্ষিত ভিক্টোরিয়ানের মতো স্ট্যানলিও শৈশবে ভ্রমণকাহিনী ও আরব্য রজনীর গল্পে মুগ্ধ ছিলেন। তবে শ্রবণশক্তি কম থাকায় তাঁর স্কুলজীবন কিছুটা ব্যাহত হয়। ইটনে মাত্র এক বছর পড়ার পর তিনি গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেন।

সাংসদ পিতা এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী কলেজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী মায়ের “বড় ছেলের প্রতি ছিল অনেক প্রত্যাশা,” বলেন গিলহাম। তবে শ্রবণজনিত সমস্যার কারণে “পরিবার তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল”। গিলহাম আরও যোগ করেন, “কেমব্রিজে গিয়ে আরবি শেখার পরই তিনি সত্যিকার অর্থে নিজেকে প্রমাণ করতে শুরু করেন।”

মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০ বছর বয়সী স্ট্যানলি ১৮৪৭ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড পালমারস্টনের সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তী এক দশক তিনি কূটনৈতিক পেশায় কর্মরত ছিলেন—এ সময় তুরস্কভিত্তিক উসমানীয় সাম্রাজ্য, গ্রিস ও বুলগেরিয়ায় তাঁর পোস্টিং ছিল।

গিলহাম বলেন, “উসমানীয়দের জীবনে ইসলাম যে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব ফেলেছিল, স্ট্যানলি তা উপলব্ধি করতে শুরু করেন।” সেই সময় বিভিন্ন ইউরোপীয় সাম্রাজ্য সাফল্যের শিখরে থাকলেও তাদের অনেককেই প্রজাতন্ত্রী বা জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। “চিঠিপত্র থেকে দেখা যায়, স্ট্যানলি রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক—উভয় ধরনের সংকটে ভুগেছিলেন,” যোগ করেন গিলহাম।

“তিনি ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস হারাননি, কিন্তু তাঁর মনে ধর্মতাত্ত্বিক সন্দেহ দানা বেঁধেছিল। উদাহরণস্বরূপ, বাইবেলের আক্ষরিক নির্ভুলতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলতেন। বাবা-মায়ের চিঠিপত্র থেকে জানা যায়, জীবনে প্রথমবারের মতো তিনি গির্জায় যাওয়া বন্ধ করে দেন।”

মধ্য-ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনের প্রেক্ষাপটে যা ছিল বেশ অস্বাভাবিক, স্ট্যানলি উসমানীয় তুর্কিদের ধর্ম—ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৮৪৯-৫০ সালের দিকে তিনি প্রতীকীভাবে মদ্যপান ছেড়ে দেন।

ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী বিস্তারে হতাশ হয়ে স্ট্যানলি ১৮৫৮ সালে কূটনৈতিক পেশা থেকে অবসর নেন এবং পরের বছর আরব ভ্রমণের সময় মুসলিম হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। গিলহাম বলেন, “তাঁর ধর্মান্তরিত হওয়া ও বিশ্বাস সম্পর্কে খুব কম বিবরণই পাওয়া যায়। পরিবারের কিছু চিঠিপত্রে যা উল্লেখ আছে, তা থেকেই বিষয়টি বোঝা যায়।”

১৮৫৯ সালে শ্রীলঙ্কা সফরের সময় স্ট্যানলির ধর্মান্তরিত হওয়ার খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে। এই খবর চেশায়ারে পৌঁছালে স্থানীয় ‘ম্যাকলেসফিল্ড কুরিয়ার’ এবং পরে লন্ডনের জাতীয় সংবাদপত্রেও তা প্রকাশিত হয়।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি মক্কায় ইসলামের পবিত্রতম স্থানে হজ পালন করেছিলেন এবং “আবদুর রহমান”—অর্থাৎ “দয়াময় প্রভুর দাস”—নাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে এর কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই বলে জানান গিলহাম।

“চিঠিপত্র সাক্ষ্য দেয়, তাঁর বাবা-মা ছেলের খ্রিস্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় যেমন ক্ষুব্ধ ছিলেন, তেমনই ছিলেন লজ্জিত ও হতভম্ব। বাবা মাকে লিখেছিলেন, ‘সে কি পাগল? আমাদের উপনিবেশগুলোতে নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করে সে কী বোঝাতে চায়?’ এই চিঠির জবাবে মা লিখেছিলেন, ম্যাকলেসফিল্ড কুরিয়ারের সংবাদটি পড়ে ‘আমার গা গুলিয়ে উঠছে।’”

পরে তাঁরা প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন যে তাঁদের ছেলে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু স্ট্যানলি এক ভাইকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি সবসময় মন থেকেই মুসলমান ছিলাম।”

১৮৬৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি ‘তৃতীয় লর্ড স্ট্যানলি অব অল্ডারলি’ এবং ‘দ্বিতীয় ব্যারন এডিসবেরি’ উপাধি লাভ করেন। এরপর ইংরেজ আইন অনুযায়ী তিনি তাঁদের বিয়ে নিবন্ধন করেন। গিলহাম ব্যাখ্যা করেন, “সেই স্প্যানিশ স্বামী ১৮৭০ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন, তাই আদতে তাঁদের প্রথম বিয়েটি বৈধ ছিল না। কিন্তু ১৮৭৪ সালে তাঁরা রোমান ক্যাথলিক রীতিতে পুনরায় বিয়ে করলে তা বৈধতা পায়—যা অনেকেরই চোখ কপালে তুলেছিল। মনে হয় স্ত্রীর ধর্মের প্রতি সম্মান দেখাতেই তিনি এটি করেছিলেন।”

পৈতৃক জমি ও উপাধি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর ১৮৬৯ সালে তিনি হাউস অব লর্ডসে নির্দলীয় ‘ক্রসবেঞ্চ পিয়ার’ হিসেবে যোগ দেন এবং প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। গিলহাম বলেন, “আমি জানি না তাঁর সহকর্মীদের কতজন জানতেন যে তিনি মুসলিম। তবে আমার ধারণা তাঁরা জানতেন, কারণ তাঁরা খবরের কাগজ পড়তেন এবং জানতেন যে তিনি ওরিয়েন্টালিস্ট সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত।”

লর্ড স্ট্যানলি উত্তর চেশায়ারের জমির মালিকানা পান, যার মধ্যে ছিল অল্ডারলি এজ গ্রাম। ম্যানচেস্টারের কাছের এই এলাকাটি এখন একটি অভিজাত এলাকা এবং প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলারদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। গিলহাম যোগ করেন, “একটি আলোচিত বা সমালোচিত ঘটনা হলো, তিনি অল্ডারলি পার্ক এস্টেটের আওতাধীন কিছু মদের দোকান (পাব) বন্ধ করে দিয়েছিলেন।”

জ্যামিতিক নকশা লর্ড স্ট্যানলি অ্যাঙ্গলসিরের সেন্ট প্যাট্রিকস চার্চসহ (উপরের ছবি) গির্জার জানালায় জ্যামিতিক নকশার ব্যয়ভার বহন করেছিলেন

১৮৮৪ সালে এক চাচার মৃত্যুর পর লর্ড স্ট্যানলি উত্তর ওয়েলসের অ্যাঙ্গলসির পেনরহোস এস্টেটের মালিকানা পান। সেখানে তিনি স্থানীয় গির্জার রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখেন। তবে প্রাণীর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে ইসলামি বিধিনিষেধ মেনে তিনি গির্জার জানালায় প্রথাগত চিত্রের পরিবর্তে জ্যামিতিক নকশা ব্যবহারের খরচ বহন করেছিলেন।

গিলহাম বলেন, “একজন মুসলিম হিসেবে স্ট্যানলি খ্রিস্টধর্মকে ইসলামের ‘সহোদর ধর্ম’ হিসেবে সম্মান করতেন, কারণ দুটিরই উৎস ইব্রাহিমীয়।”

ইভ হাওয়া ইকবাল-খোকহার, একজন ইংরেজ নারী যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ম্যানচেস্টার মুসলিম কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন, জানান যে অ্যাঙ্গলসিরে পারিবারিক ভ্রমণে যাওয়ার ঠিক আগে লর্ড স্ট্যানলির জীবন সম্পর্কে জেনে তিনি “গির্জাগুলো দেখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন”।

তিনি বলেন, “ইতিহাস আমাকে সত্যিই রোমাঞ্চিত করে। ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের সম্পর্কে জানা অত্যন্ত আকর্ষণীয়—বিশেষ করে লর্ড স্ট্যানলির মতো স্থানীয় অভিজাত ব্যক্তির ক্ষেত্রে।” গির্জার নকশাকে তিনি “চোখ জুড়ানো” বলে বর্ণনা করেন, যা তাঁর মতে “আমাদের অতীতের একটি সমৃদ্ধ চিত্র”।

তবে যুক্তরাজ্যের জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের কট্টর সমর্থক হিসেবে লর্ড স্ট্যানলি স্থানীয় স্কুলে ওয়েলশ ভাষা শিক্ষার বিপক্ষে ছিলেন। গিলহাম বলেন, “তিনি ভাষাকে সত্যিই সম্মান করতেন। কিন্তু মনে হয় এক্ষেত্রে ঐক্যের প্রশ্নটি জড়িত ছিল এবং তাঁর কাছে ঐক্যই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

গিলহাম লর্ড স্ট্যানলিকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন “যিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে বিশ্বাসী ছিলেন না, বরং বিশ্বাস করতেন বিদ্যমান সাম্রাজ্যকে সংহত করার ওপর। তাই তিনি লর্ডসে সাম্রাজ্য সংরক্ষণের পক্ষে কথা বললেও এর নাগরিকদের দেখাশোনার বিষয়টিতেও জোর দিতেন।”

গিলহাম মন্তব্য করেন, “তিনি ছিলেন রক্ষণশীল মানুষ, কিন্তু একই সঙ্গে একজন ভিক্টোরিয়ানও। ধর্মের ক্ষেত্রে তিনি ব্যাপকভাবে প্রথা ভাঙলেও, অন্যান্য বিষয়ে তিনি ছিলেন বেশ অনড়।”

১৯০৩ সালে ইসলামের পবিত্র মাস রমজানে ৭৬ বছর বয়সে লর্ড স্ট্যানলি মৃত্যুবরণ করেন। লন্ডনের উসমানীয় দূতাবাসের এক ইমামের পরিচালনায় তাঁর অল্ডারলি এস্টেটের একটি অংশে (গির্জার পবিত্র সীমানার বাইরের জমিতে) তাঁকে দাফন করা হয়।

গিলহাম বলেন, “কিছু দিক থেকে তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি স্বীকৃতি পাচ্ছেন এবং নতুন করে মূল্যায়িত হচ্ছেন। তিনি লোকদেখানো স্বভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না, হয়তো এটাই তাঁর ঐতিহাসিক গুরুত্বকে কিছুটা ম্লান করেছে। কিন্তু আমি আশা করি, মানুষ তাঁকে এখন যেভাবে চেনে, ভবিষ্যতে তার চেয়েও বেশি জানবে।”

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

১টি লেখা
  1. 'কেউ হয়তো আমাদের পরীক্ষা করছে': পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কায় বিশ্ব

    ১৯৯৫ সালে নরওয়ের একটি সাধারণ আবহাওয়া রকেটকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল। জানুন সেই শ্বাসরুদ্ধকর ঘটনার বিস্তারিত।

    ইতিহাসআন্তর্জাতিকরাশিয়া