skip to content
গুলবাহার

সাহিত্যকে একা ছেড়ে দিন

• ৫ মিনিট

হাইস্কুলের দ্বিতীয় বর্ষে ডিসক্রিট ম্যাথ ক্লাসে আমরা ছিলাম বারোজন ছেলে আর তিনজন মেয়ে। সেবার সেমিস্টারে ছেলেরা একসঙ্গে বসে পোকার খেলত, শরতে শেখা সম্ভাব্যতা তত্ত্বের (Probability Theory) সূত্র মেনে নিজেদের হাতের চাল বা শক্তির হিসাব কষত। আমি একপাশে বসে থাকতাম, কোলে উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারের ভ্যানিটি ফেয়ার। বেকি শার্পও তো জুয়া খেলছিলেন।

ম্যাথের শিক্ষকের সঙ্গে প্রায়ই তর্কে জড়াতাম। প্রতিদিন সকালে ক্লাসে ঢুকেই তিনি ইংরেজি বিভাগের কোনো না কোনো শিক্ষককে কটাক্ষ করতেন। ভবিষ্যতে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়ব বলে মনে হতো তাদের বাঁচানো যেন আমার দায়িত্ব।

পরিহাসের বিষয় হলো, স্কুলের কোনো ইংরেজি শিক্ষককেই আমি বিশেষ পছন্দ করতাম না। তাঁরা নিজেদের কাজটা ঠিকঠাকই করতেন, কিন্তু সাহিত্য পড়ানোর ধরনটা ছিল অদ্ভুত। আমরা রেস বা বর্ণ এবং জেন্ডার বা লিঙ্গ নিয়ে বিশ্লেষণ করতাম। আর ছিল সেইসব বিশাল বিশাল থিম—দ্য গ্রেট গ্যাটসবি-তে পুঁজিবাদের ব্যর্থতা কিংবা ক্যান্টারবেরি টেলস-এ নারীবাদ। এসব থিম নিয়ে আমি তেমন মাথা ঘামাতাম না। আর সিনিয়র বর্ষে আমার পরিচিতি দাঁড়িয়ে গেল—অহংকার আর বিদ্রোহের এক অদ্ভুত মিশেল হিসেবে।

মনে হতো, আমাকে যেন দমিয়ে রাখা হয়েছে; কারণ স্কুলে কেউই সাহিত্য নিয়ে আমার মতো ভাবত না। সহপাঠীদের জীবন যেন খুব সরল সমীকরণে বাঁধা—এমআইটিতে ঢোকাই আসল লক্ষ্য, ভ্যানিটি ফেয়ার মানে একটা ম্যাগাজিন, আর পোকার খেলাটাই সবচেয়ে মহৎ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা। কিন্তু আঠারো বছর বয়সে যখন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম, তখন ডর্মের রুমে বসে সহপাঠীদের কাছে কবিতা আবৃত্তি করতে পারতাম, ল্যাটিন ভার্ব বা ক্রিয়ার রূপভেদ শিখে ভার্জিল আর ওভিড পড়ার প্রস্তুতি নিতে পারতাম। মুহূর্তের জন্য আমি মুগ্ধ! আর কোনো ম্যাথ ক্লাস নেই, আর সহপাঠীরা দান্তের নাম শুনেছে!

তাই ইংরেজি ক্লাসের প্রথম রচনা বা এসে-তে (Essay) যখন ‘সি’ গ্রেড পেলাম, সেটা ছিল এক জোর ধাক্কা। অধ্যাপকের অফিসে বসে হতবাক হয়ে শুনলাম। আমার যুক্তিটা ছিল খুব সরল—ইলিয়াড-এ শোকের সময় নারীরা তাঁদের পুরুষ সঙ্গীদের কাছেই সবচেয়ে বেশি সান্ত্বনা পেতেন। কয়েক দিন ধরে খেটে লেখা রচনা এটি। অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করলাম—ভুলটা কোথায়?

তিনি ধমকে উঠলেন, “পিতৃতান্ত্রিক কাঠামো নারীদের উপকার করে—এমন যুক্তি দেওয়াটাই ভুল।”

বিভ্রান্ত হয়ে পরের রচনায় সব ক্ষোভ ঝেড়ে ফেললাম। দি ওরেস্টিয়া-য় জেন্ডার রোল বা লিঙ্গ ভূমিকা উল্টে দেওয়া নিয়ে কিছু একটা লিখলাম, মাত্র দুই ঘণ্টায় তৈরি। ব্যাস, এবার ‘এ’ প্লাস।

দুই বছর পর নিজেকে শেক্সপিয়র গবেষক ভাবতে শুরু করলাম, এক বছর মেয়াদি শেক্সপিয়র সার্ভে কোর্সে ভর্তি হলাম। অধ্যাপক ছিলেন নবীন, পড়ানোর অভিজ্ঞতা কম। কিন্তু লেকচার হলে দাঁড়ালেই কোনো মোবাইল ফোন বা ঝিমুনি ধরা সিনিয়রের ছায়াও দেখা যেত না। তিনি লেকচারে নানা বুলি আর থিম আউড়ে যেতেন, উচ্চারণ করতেন সব গালভরা শব্দ—হেটেরোনরমেটিভিটি, রেস পলিটিক্স বা বর্ণ রাজনীতি। প্রতিটি নাটকে দিতেন বামপন্থী মোড়। সবটাই আমার বিদ্রূপের ক্ষুধা মেটাত, যতক্ষণ না একদিন মিডটার্ম পরীক্ষার খাতার ওপরে ‘মেসি’ (অগোছালো) মন্তব্যসহ লেখা দেখলাম: আ মিডসামার নাইটস ড্রিম-এ কুইয়ার ডিজায়ার বা জেন্ডার-ভিন্নধমী কামনার কথা মনে রেখো।

ক্লাসিক্যাল মহাকাব্য আর এলিজাবেথীয় নাটকে হতাশ হয়ে মন দিলাম সেই ধারায়, যা শীঘ্রই আমার মাস্টার্স থিসিসের বিষয় হয়ে উঠবে—মডার্নিস্ট বা আধুনিকতাবাদী কবিতা। সেই সেমিস্টারে কোর্স ডিরেক্টরিতে ছিল “ইয়েটস, এলিয়ট আর অডেন”। অধ্যাপক ছিলেন আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে পারদর্শী, যা ছিল ইয়েটসের কবিতার পটভূমি। সেমিস্টার গড়িয়ে এলিয়টের দিকে যেতেই রাজনীতির দাপট কমল না। বরং এলিয়টের কাজের বিষয়বস্তু না পড়িয়ে, ক্লাসের বেশিরভাগ সময়ই কেটে গেল তাঁর ব্যক্তিগত রাজনীতি নিয়ে হায়-হুতাশ করে। “এলিয়ট রক্ষণশীল ছিলেন বলেই যে আমরা তাঁকে পড়ব না—ব্যাপারটা তা নয়…”

কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতার সার্বজনীনতা নিশ্চয়ই এসব সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনাকে ছাপিয়ে যায়—সেই বিকেলে লেকচারে বসে ভাবলাম। নিশ্চয়ই তাই।

নিজেকেই প্রশ্ন করলাম—এখানে কীভাবে এলাম আর কেন? হতাশ হলেও আমি ছিলাম উচ্চাভিলাষী। সিলভিয়া প্লাথের “ড্যাডি” কবিতায় কামনার বিষাদগ্রস্ত দিক নিয়ে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিস লেখার কথা ভাবলাম। ভেবেছিলাম এবার বছরটা দারুণ কাটবে। এমন এক কাজে ডুবে থাকব, যা অধ্যাপকদের ওই সব গৎবাঁধা মতাদর্শে দূষিত হবে না।

কয়েক সপ্তাহ পর বিভাগ থেকে ইমেইল এল। তাতে আমার তথাকথিত ‘নারীবিদ্বেষী’ মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জবাব দেওয়ার মতো শক্তিও আর পাচ্ছিলাম না। আমার থিসিসটি নাকি প্রচলিত নারীবাদী গবেষণার ওপর আক্রমণাত্মক হতো, তাই ওটা আর লেখা যাবে না। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিস প্রোগ্রাম থেকে বাদ পড়লাম। পিএইচডি আবেদনের আগে আরও এক বছর সময় নিতে কলাম্বিয়াতেই মাস্টার্সে ভর্তি হলাম। কিন্তু পরিবেশ সেই একই। সাহিত্য ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত ঠিকই, তবে শর্ত হলো—সেই ব্যাখ্যায় নিপীড়ন, সামাজিক অবিচার বা জেন্ডার থিওরির কথা থাকতে হবে। সফল হওয়ার জন্য কোন ‘থিম’গুলো ব্যবহার করতে হবে তা বুঝে ফেলেছিলাম, কিন্তু তত দিনে আমার আর সাহিত্য পড়াই হচ্ছিল না।

এরপরই সিদ্ধান্ত নিলাম—সাহিত্যে আর পিএইচডি করব না।

সেই শীতের সকালের পর দশ বছর পেরিয়ে গেছে। ভ্যানিটি ফেয়ার বইটি এখনো আমার ছোটবেলার ঘরের কোথাও পড়ে আছে, বছরের পর বছর ধরে জমানো হাজারো বইয়ের ভিড়ে। মাঝে মাঝে ভাবি—পনেরো বছর বয়সে মোটা ভিক্টোরিয়ান উপন্যাস না পড়ে যদি ম্যাট্রিক্স আর কম্বিনেটরিক্সে মন দিতাম, তাহলে কী হতো? আমার হাইস্কুলের ম্যাথ শিক্ষক ঠিকই বলেছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যে জীবন উৎসর্গ করা মানুষগুলোর মধ্যে কোথাও একটা গলদ আছে। আমি এখন বুঝি কেন—কারণ তাঁরা টেরই পান না যে, তাঁরা আসলে সাহিত্যচর্চা করছেন না।

কেউ যদি বলেন, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হলো কোনো সামাজিক কাঠামোর রাজনৈতিক দিক নিয়ে মন্তব্য করা বা ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইয়ে ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, তবে আমি আমার অবস্থানে অটল থাকব। আমার মতে, সাহিত্য আসলে সুন্দর বাক্যবিন্যাসের সমষ্টি, যা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে সার্বজনীন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। সাহিত্যের ভুলে-যাওয়া উদ্দেশ্যটি লুকিয়ে আছে শিল্প আর সৌন্দর্যের সঙ্গে এর সম্পর্কের মাঝে। একেই আমরা ‘হিউম্যানিটিজ’ বা মানবিক বিদ্যা বলি।

আর কোনো শিল্পকর্ম যদি তার মহিমা, সৌন্দর্য আর রহস্য দিয়ে আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে, তবে কি তাকে ব্যবচ্ছেদ করা উচিত? নানা ‘থিম’-এর ভার চাপিয়ে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা বা তাকে কলুষিত করা কি ঠিক?

তাই হয়তো সময় এসেছে আমাদের মানবিক ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য ফিরিয়ে আনার—আর সাহিত্যকে তার নিজের মতো থাকতে দেওয়ার।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. টেইলর সুইফটের ইংরেজি শিক্ষক পরিচয়

    টেইলর সুইফটের সাহিত্যিক রেফারেন্স নিয়ে এক সময়কার ভক্তের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। কীভাবে ইংরেজি শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় তার সঙ্গীতের মান কমিয়েছে।

    টেইলর সুইফটসঙ্গীতসাহিত্য
  2. মৃত্যুর আগে পড়তে হবে এমন ১০০টি ক্লাসিক উপন্যাসের নির্ভরযোগ্য তালিকা

    স্টিফেন থমাসের বিতর্কিত বইয়ের তালিকার জবাবে লিজা প্রস্তুত করেছেন ১০০টি ক্লাসিক উপন্যাসের নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত তালিকা। রয়েছে দস্তয়েভস্কি, টলস্টয়, ফকনারসহ বিশ্বসাহিত্যের সেরা কীর্তি।

    সাহিত্যবইপড়াক্লাসিক উপন্যাস
  3. গুডরিডস টপ ১০০: ক্লাসিক সাহিত্যের অদ্ভুত অনুপস্থিতি

    গুডরিডসের সেরা ১০০ বইয়ের তালিকায় ক্লাসিক সাহিত্যের অভাব নিয়ে এক পাঠকের চিন্তাভাবনা। কেন আধুনিক পাঠকরা পুরনো বইয়ের চেয়ে নতুন উপন্যাসকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

    সাহিত্যগুডরিডসক্লাসিক বই