skip to content
গুলবাহার

বিশ্রাম ও প্রশান্তির এক মাস

• ৫ মিনিট

চাকরির মাত্র চার বছর পূর্তিতেই তিন মাসের সবেতন ছুটি—ভাবা যায়? সাধারণের কল্পনার অতীত হলেও আমার জন্য এটিই ছিল বাস্তবতা। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আমি এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হই। এর আগে আমার অভিজ্ঞতা ছিল ২৫ বছর চাকরি করার পর মাত্র ছয় মাসের ছুটি পাওয়ার; তাই এবারের সুযোগটি ছিল অন্য রকম উত্তেজনার।

তবে টানা তিন মাস একা সময় কাটানোর কথা ভেবে আমি কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। আমার স্বামীর পক্ষে তো আর এত লম্বা ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমি ঠিক করলাম, একবারে না নিয়ে আগামী দুই বছরে তিন ভাগে এই ছুটি কাটাব।

ছুটির প্রথম পর্বটি ছিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। একটি কঠিন প্রজেক্টের তীব্র চাপের পর এটি ছিল আমার জন্য স্বস্তিদায়ক এক বিরতি। কিন্তু সাধারণত যেমনটা হয়—কয়েক দিনের বেশি ছুটি পেলেই মনে হয়, এই সময়ে যতটা সম্ভব কাজ সেরে ফেলতে হবে। আমিও ঠিক করলাম, নতুন দক্ষতা শিখব, বাড়ি সাজাব এবং বাগানের কাজ করব।

কিছুটা করেওছিলাম। লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের জুবিলি লাইনের ট্রেনের দরজার একটি পুরোনো বোতাম খুলে, পরিষ্কার করে, পুনরায় তার বসিয়ে ফিলিপস হিউ লাইটসুইচ বানানোর একটি ইলেকট্রনিকস প্রজেক্ট শুরু করেছিলাম। কিন্তু এলইডি বিদ্যুৎ সংযোগের অংশে এসে আটকে গেলাম। বুঝতে পারলাম, আমার বৈদ্যুতিক প্রকৌশলের জ্ঞান এতটাই প্রাথমিক যে আগে সেটা ভালো করে শিখতে হবে। অথচ কাজে ফেরার পর যা শিখেছিলাম, তা মুহূর্তেই ভুলে গেলাম।

ছুটির দ্বিতীয় অংশটি আমি কৌশলে বড়দিনের (ক্রিসমাস) সময় ঠিক করেছিলাম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, প্রথম দুই সপ্তাহ একদম কিছুই করব না, আর পরের দুই সপ্তাহে কাজ করব। আমি রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বা বিপরীত প্রকৌশল শেখার চেষ্টা করেছিলাম। আগে কাজের প্রয়োজনে কিছু ‘সিটিএফ’ (Capture The Flag) সমাধান করতে আমার ভালো লাগত। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম, আমি সেটা উপভোগ করতাম কারণ সেগুলো ছিল ধাঁধার মতো, আর আমি ধাঁধা পছন্দ করি। অ্যাসেম্বলি ল্যাঙ্গুয়েজ নতুন করে শেখা আমার কাছে সময় নষ্ট বলেই মনে হলো।

তাই পরিকল্পনা বদলে গেল। গত তিন সপ্তাহে আমি এতটাই অলস হয়ে গেছি যে, নিজের নাম বদলে এক প্রজাতির আলুর নামানুসারে ‘ম্যারিস পাইপার’ রাখার কথা ভাবছি। পিএস-৫ (PS5)-এ ‘দ্য উইচার ৩’ গেমটি আবার খেলতে শুরু করেছি—ঘণ্টার পর ঘণ্টা এর পেছনে ব্যয় করছি। শুয়ে শুয়ে ‘লা মুলানা ২’ খেলেছি, এমনকি স্টিম ডেকের পর্দা ভেঙে যাওয়ায় নিজেই সেটা বদলেছি। ধীরে-সুস্থে রান্না করেছি এবং নিজের কোয়্যার রিট্রিটের (choir retreat) খাবারের পরিকল্পনা করেছি।

নতুন বছরের প্রথম দিনটা ছিল আমাদের নিয়মিত আয়োজনের মতো—বন্ধুকে নিয়ে বোর্ড গেম খেলা। এবার মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম, নদীর ওপর আতশবাজি দেখতে স্থানীয় একটি পার্কের টিলায় উঠেছিলাম।

ক্রিসমাসে আমার স্বামীও কিছুদিনের ছুটি নিয়েছিলেন। দুজনে একসঙ্গে সময় কাটিয়েছি—ক্রিসমাসের আমেজে ভরা একটি ‘ন্যাশনাল ট্রাস্ট’ বাড়ি দেখতে গিয়েছি, গার্ডেন সেন্টারে ঘুরেছি (মজা করে বলেছিলাম, ওই সময়টায় সেখানে যাওয়া ছিল নরকযন্ত্রণার শামিল), বাইরে ডিনার করেছি এবং ভিডিও গেম খেলেছি।

কোয়্যারের জন্য দুটি গান নতুন করে সাজানোর সময়ও পেয়েছিলাম—চ্যাপেল রোয়ানের ‘পিংক পনি ক্লাব’ (গত ২০ বছরের মধ্যে আমার সাজানো সবচেয়ে নতুন গান) এবং ফাউন্টেইনস অব ওয়েইনের ‘স্টেসিস মম’। ফেব্রুয়ারিতে সবাইকে গানগুলো শেখানোর ব্যাপারে আমি বেশ উৎসাহী।

দুই বছর পর আমি আবারও হাতে সেলাইয়ের কাজ তুলে নিয়েছি। টিভি দেখার সময় ফোনের দিকে না তাকানোর জন্য এটি একটি দারুণ উপায়। গতকাল সেলাই করতে করতেই ‘ভেরোনিকা মার্স’ সিরিজের সাতটি পর্ব দেখে ফেলেছি।

বরিস নামের কুকুরটিও বেড়াতে এসেছিল—যা আমাকে সোফায় বসে গেম খেলতে আরও উৎসাহিত করেছে। কুকুরটি আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে খুব ভালোবাসে।

বাইরেও কিছুটা বেরিয়েছিলাম। ক্রিসমাসের আগে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, যিনি সদ্য মা হয়েছেন। এরপর অক্সফোর্ড স্ট্রিটে গিয়ে সেই সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা করেছিলাম (ভিড়ের কারণে)। সোহোর ফটোগ্রাফার্স গ্যালারিতে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে সোডারবার্গে দারুণ একটি এলাচ দেওয়া বান বা রুটি খেয়েছিলাম। স্থানীয় একটি ছোট কিন্তু ভালো সেলুনে চুল কাটিয়েছিলাম—নতুন বব কাট, যদিও নিজে ঠিকঠাক না সাজালে আমাকে অভিনেতা জাভিয়ের বারদেমের মতো দেখায়।

কেনসিংটনের ডিজাইন মিউজিয়ামে বার্বি প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম—ভালো ছিল, তবে লন্ডন শহর পাড়ি দিয়ে যাওয়ার মতো আহামরি কিছু নয়। সেখানে ‘বার্বি ফ্যাশন ডিজাইনার’ দেখতে না পেয়ে আমি কিছুটা হতাশই হয়েছিলাম।

সাম্প্রতিক সময়ে আমি ভেবেছিলাম আমি একজন ‘ইমপোস্টার’ বা প্রতারক—ওয়েব কনফারেন্সে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতাম, অথচ আমার কাজে আর ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ছিল না, প্রযুক্তি নিয়ে লেখার শক্তিও ছিল না।

কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি—আমি শুধুই একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার নই। আমি একজন সঙ্গীতজ্ঞ, যে কোয়্যারের জন্য গান সাজায়; আমি রাঁধুনি ও বেকারি পছন্দ করা মানুষ; ধাঁধার প্রেমী; নবীন বাগানি; ভিডিও গেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয়কারী এবং মাঝেমধ্যে ওয়েবে মজার কিছু করা একজন মানুষ।

কোড লিখতে আমি এখনো পছন্দ করি, সমস্যা সমাধান করতেও ভালো লাগে। কিন্তু নিজের ওপর চাপ দিলে—সবচেয়ে ভালো হতে হবে, দ্রুত পদোন্নতি পেতে হবে—তখন মনে হয় আমি খারাপ করছি।

আমি কৃতজ্ঞ যে আমি ভালো বেতন পাই, সহকর্মীদের পছন্দ করি এবং কাজ শেষে ল্যাপটপ বন্ধ করে নির্ভার হতে পারি। এখনো আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা ambition আছে, কিন্তু তা আগের মতো সর্বগ্রাসী নয়। ফোনে অফিসের ‘স্ল্যাক’ (Slack) অ্যাপ নেই, আর সন্ধ্যা ছয়টার পর কাজ করতে হয়েছে দুই বারের বেশি নয়।

আমি এখন সোফি—সঙ্গীতজ্ঞ, বাগানি, বেকার, কিছুটা অলস, যে কাজে যায়, ভালো কাজ করে এবং দিন শেষে বাড়ি ফিরে কুকুরকে জড়িয়ে ধরে। আমার কাছে এটিই এখন অনেক বেশি আকর্ষণীয় পরিচয়।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. OpenAI বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সবচেয়ে মোহনীয় চ্যাটবট

    ওপেনএআইয়ের জনপ্রিয় চ্যাটবট GPT-4o বন্ধের ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোক। অনেকে বলছেন, "এভাবে চলতে পারব না।"

    প্রযুক্তিকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তামানসিক স্বাস্থ্য
  2. তিন বছরের মিথ: কর্পোরেট দুনিয়ায় অপেক্ষার ফাঁদ

    চাকরি হারানো এক অভিজ্ঞ কর্মীর উপলব্ধি—কেন পদোন্নতির জন্য 'অপেক্ষা' করতে বলা হয়, আর কেন সেটা আসলে ক্যারিয়ারের জন্য হুমকি।

    কর্মজীবনকর্পোরেট কালচারক্যারিয়ার
  3. সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর বয়স ন্যূনতম ১৬ কেন হওয়া উচিত

    অস্ট্রেলিয়ার ১৬ বছর বয়সসীমা আইন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়ঃসন্ধির সময় সোশ্যাল মিডিয়া মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।

    সোশ্যাল মিডিয়াশিশু নিরাপত্তাঅস্ট্রেলিয়া