skip to content
গুলবাহার
সোশ্যাল মিডিয়া বয়স সীমা আইন

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর বয়স ন্যূনতম ১৬ কেন হওয়া উচিত

• ১১ মিনিট

২০২৫ সালে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় খবর ছিল অস্ট্রেলিয়ার নতুন সোশ্যাল মিডিয়া বয়সসীমা আইন। দেশটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা বা ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় বড় খবর কোনটি? অস্ট্রেলিয়ার এই আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে অভিভাবক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতারা এই সাহসী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমরাও কি এমনটা করতে পারি না?’

ব্লুমবার্গের ‘টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ব্যান ফর অস্ট্রেলিয়ান কিডস হেরাল্ডস গ্লোবাল কার্বস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এমন কিছু দেশের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে এ ধরনের আইন প্রণয়ন করা হয়েছে বা শিগগিরই হতে যাচ্ছে।

এই ধারণাটি এখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যে কোনো দেশ এমন নীতি গ্রহণ করার আগে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হবে:

  • বয়সসীমা কি অস্ট্রেলিয়ার মতো ১৬ হওয়া উচিত, নাকি ফ্রান্সের মতো ১৫?
  • নির্ধারিত বয়সের চেয়ে কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সম্মতির (প্যারেন্টাল কনসেন্ট) সুযোগ রাখা উচিত কি না?

এই দুটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো: ১৬ এবং না।

এর পেছনের কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

বয়ঃসন্ধিকালকালের গুরুত্ব

‘দি অ্যাংজিয়াস জেনারেশন’ বইয়ে আমি বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে পুরো একটি অধ্যায় লিখেছি, কারণ এটি মস্তিষ্কের পুনর্বিন্যাস ও নিজস্ব পরিচয় গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞানীরা বয়ঃসন্ধিকালকে একটি ‘সংবেদনশীল সময়’ হিসেবে দেখেন। এ সময় পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্ক বিশেষভাবে ‘নমনীয়’ বা পরিবর্তনশীল থাকে। মস্তিষ্ক শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় রূপান্তরিত হয় এবং এই পরিবর্তনগুলো নির্ভর করে শিশুটি বারবার কী করছে তার ওপর। মস্তিষ্ক গবেষকদের মতে, যে নিউরনগুলো একসঙ্গে সক্রিয় হয়, সেগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের গড়পড়তা কিশোর-কিশোরীরা এখন প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। তাদের মস্তিষ্কের যে নিউরন ও সার্কিটগুলো বারবার সক্রিয় হয়, সেগুলো শক্তিশালী হতে থাকে; আর যেগুলো কম ব্যবহৃত হয়, সেগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। মস্তিষ্কের এই গঠনপ্রক্রিয়া পুরো শৈশবকাল জুড়ে চলতে থাকে এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে প্রায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। তবে কৈশোরের শুরুতে—বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে—এই গঠনপ্রক্রিয়া আরও তীব্র হয় এবং পরিবর্তনগুলো স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বয়ঃসন্ধির বয়সসীমা সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক সময়ভেদে ভিন্ন হয়। তবে আধুনিক উন্নত দেশগুলোতে মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৮-১৩ বছরের মধ্যে এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে এর এক-দুই বছর পর বয়ঃসন্ধি শুরু হয়। প্রায় যেকোনো মানদণ্ডেই, গড়পড়তা ছেলেমেয়েরা তাদের ১৫তম জন্মদিনে বয়ঃসন্ধিকালেই থাকে। তাদের বেশিরভাগেরই উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং গৌণ যৌন বৈশিষ্ট্যগুলোর (Secondary sex characteristics) পরিবর্তন ঘটে। মার্কিন ও ইউরোপীয় কিশোর-কিশোরীদের ওপর পরিচালিত বৃহৎ পরিসরের এক গবেষণায় দেখা যায়, গড়পড়তা মেয়েরা ১৫ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ট্যানার স্টেজ ৫ (যৌনাঙ্গের বিকাশের শেষ পর্যায়) অর্জন করে, আর গড়পড়তা ছেলেরা ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে স্টেজ ৫-এ পৌঁছায়। তবে উভয় লিঙ্গের ক্ষেত্রেই এর ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কৈশোরকাল জুড়ে ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে থাকে এবং ২০-এর কোঠার মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে স্থিতিশীলতা অর্জন করে।

অন্য কথায়, অর্ধেক বা তার বেশি সংখ্যক মেয়ে তাদের ১৫তম জন্মদিনে বয়ঃসন্ধিতে থাকে। একইভাবে অর্ধেক বা তার বেশি ছেলে তাদের ১৬তম জন্মদিনে বয়ঃসন্ধিতে থাকে। ন্যূনতম বয়স হিসেবে ১৫-এর চেয়ে ১৬ অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত হওয়ার প্রধান কারণ এটিই। (অবশ্যই, ১৬-এর চেয়ে ১৮ হলে আরও ভালো হতো, তবে ‘দি অ্যাংজিয়াস জেনারেশন’ বইয়ে আমরা ১৬ বছরকে মানদণ্ড হিসেবে প্রস্তাব করেছি। কারণ আমাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি সর্বোচ্চ বয়স বেছে নেওয়া, যা অধিকাংশ দেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।)

বয়ঃসন্ধিকাল হলো সেই সময়, যখন সন্তানদের সময় কাটানোর ধরন এবং কাদের (বা কীসের) দ্বারা তাদের বিকশিত মস্তিষ্ক ও পরিচয় প্রভাবিত হচ্ছে—সে বিষয়ে অভিভাবকদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা উচিত। ঐতিহ্যগতভাবে মানবসমাজগুলো এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হতে সাহায্য করে এসেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বস্ত বয়স্করা (বাবা-মা ছাড়া অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্ক আত্মীয় বা শুভাকাঙ্ক্ষী) নানা চ্যালেঞ্জ, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা ও শিক্ষার মাধ্যমে তাদের পথ দেখিয়েছেন।

কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে আমরা কী করছি? আমরা সাধারণত শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়ে তাদের বয়ঃসন্ধিকালের সূচনা করছি (যুক্তরাষ্ট্রে যার গড় বয়স প্রায় ১১ বা ১২ বছর)। এরপর তাদের সামাজিক ও স্নায়বিক বিকাশের দায়িত্ব আমরা ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক, শিক্ষা এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতার ওপর এর পরিণতি হয়েছে বিপর্যয়কর।

তাহলে বয়সসীমা ১৫ না হয়ে ১৬ হলে কি খুব বেশি প্রভাব পড়বে? হ্যাঁ, পড়বে। বয়ঃসন্ধিকাল হলো সেই সময়, যখন সোশ্যাল মিডিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে। আর ১৫ বছর বয়সে বড়সংখ্যক ছেলেসহ বেশিরভাগ কিশোর-কিশোরী বয়ঃসন্ধির মধ্য দিয়েই যায়। অরবেন ও তাঁর সহকর্মীদের ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি সংবেদনশীলতার একটি চরম সময়কাল’ রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী ছেলেদের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ঠিক এক বছর পর তাদের জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি কমার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। (মেয়েদের ক্ষেত্রে এই চরম সংবেদনশীলতার বয়স হলো ১১ থেকে ১৩ বছর)।

যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ বছর বয়সটি ‘ডিজিটাল প্রাপ্তবয়স্কতার’ জন্য স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে, কারণ সেখানকার অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৬ (যদিও অন্যান্য দেশে এটি বেশি হতে পারে)। একইভাবে, কিছু ইউরোপীয় দেশের মানুষ ১৫ বছর বয়সকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে, কারণ এসব দেশে এটি ‘সম্মতির বয়স’ (Age of consent), যখন কিশোর-কিশোরীরা আইনগতভাবে যৌন কার্যকলাপে লিপ্ত হতে পারে।

তবে রূঢ় সত্য হলো: কোনো দেশ যদি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ন্যূনতম বয়স ১৬-এর পরিবর্তে ১৫ নির্ধারণ করে, তবে তারা মূলত শিশুদের মস্তিষ্ক গঠনের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়ে সোশ্যাল মিডিয়াকে অতিরিক্ত এক বছর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেবে। এর ফলে পর্নোগ্রাফি, সেক্সটরশন (Sextortion), সাইবার বুলিং এবং বেনামী অপরিচিতদের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে। অথচ এই বয়সে কিশোর-কিশোরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা নিরাপদ-অনিরাপদ বোঝার ক্ষমতা বেশ কম থাকে।

যৌথ পদক্ষেপের ফাঁদ (Collective Action Trap) থেকে মুক্তি

স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও গেমস ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক ডিভাইস নিয়ে দৈনন্দিন টানাপোড়েনে প্রায় সব অভিভাবকই সন্তানদের মুখে একটি সাধারণ কথা শুনে থাকেন—‘কিন্তু আমার সব বন্ধুর তো আছে! আমিই শুধু বাদ পড়ে যাচ্ছি!’ এবং শিশুদের এই দাবি অনেকটাই সত্যি। যেহেতু প্রায় সবার কাছেই এসব ডিভাইস রয়েছে, তাই সবাই মনে করে তাদেরও থাকা দরকার। এটি অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘কালেকটিভ অ্যাকশন ট্র্যাপ’ বা যৌথ পদক্ষেপের ফাঁদের একটি নিখুঁত উদাহরণ। এখানে সবাই আদর্শ নয় এমন (sub-optimal) কিছু মেনে নেয়, কারণ কেউ যদি একাকী সঠিক পদক্ষেপ নিতে যায়, তবে তার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।

এই যৌথ পদক্ষেপের ফাঁদ থেকে মুক্তির উপায়ও যৌথভাবেই খুঁজতে হবে। যদি বেশিরভাগ পরিবার ১৪ বছরের আগে সন্তানদের কেবল বেসিক ফোন দেয়, তাহলে কোনো ১৩ বছর বয়সী বলতে পারবে না, ‘শুধু আমারই আইফোন নেই!’ একইভাবে, যদি বেশিরভাগ পরিবার ১৬ বছর বয়সের আগে সন্তানদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে না দেয়, তবে এর চেয়ে কম বয়সীদের ওপর অ্যাকাউন্ট খোলার মানসিক চাপও কমে যাবে।

অভিভাবকেরা যদিও সন্তানের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার বয়সটি নির্ধারণ করতে পারেন, কিন্তু সন্তান কখন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলবে, তার ওপর কোনো অভিভাবকেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শিশু যদি স্কুলসহ যেকোনো জায়গায় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পায়, তবে নিজের বয়স ১৩ বছর দাবি করে সে ইচ্ছামতো অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে।

ঠিক এ কারণেই অভিভাবকদের সরকার এবং প্ল্যাটফর্মগুলোর সহায়তা প্রয়োজন (যারা বারবার প্রমাণ করেছে যে, আইন দ্বারা বাধ্য না করা হলে তারা শিশুদের সুরক্ষা দেবে না)। অস্ট্রেলিয়ার আইনটি এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার মূল কারণ এটাই: এটি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের এই টানাপোড়েনকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়।

কোনো দেশ যদি এর চেয়ে কম বয়সে অভিভাবকদের সম্মতির (প্যারেন্টাল কনসেন্ট) বিধান যুক্ত করে, তবে তা সবাইকে আবারও সেই যৌথ পদক্ষেপের ফাঁদেই ফেলে দেবে। আমরা আবারও সেই পুরোনো যুক্তিতে ফিরে যাব: ‘কিন্তু আমার সব বন্ধুর বাবা-মা তো তাদের অনুমতি দিয়েছেন!’

সরল নিয়মই সবচেয়ে কার্যকর

তৃতীয় বিবেচ্য বিষয়টি হলো, এই জটিল বিশ্বের জন্য সাধারণত সরল নিয়মগুলোই সবচেয়ে ভালো কাজ করে, যেমনটা আইনি পণ্ডিত রিচার্ড এপস্টাইন ও ফিলিপ হাওয়ার্ড দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন। মানুষ এগুলো সহজে বুঝতে ও মনে রাখতে পারে। এগুলো প্রয়োগ করাও সহজ। সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষেত্রে—যা স্বভাবগতভাবেই আন্তর্জাতিক ও সীমানাহীন—বয়স ও অভিভাবকের অনুমতির নিয়মের একটি জটিল তালিকা মানে হলো, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে এমন একটি দেশ খুঁজে নেবে, যেখানে তারা সহজেই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে (অনেকেই এমনটা করবে)।

বাড়তি সুবিধা হিসেবে বলা যায়, ১৬ বছরের একটি সরল ও সর্বজনীন বয়সসীমা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর পক্ষে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা অনেক সহজ হবে। তারা বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম চায় না। আমরা যদি তাদের জন্য বিষয়টি সহজ করে দিই, তবে তারাও আইন প্রয়োগে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে।

আরেকটি বাড়তি সুবিধা হলো, বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে যে, বিপুলসংখ্যক অভিভাবক ও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণকারী আইনকে সমর্থন করেন। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির (দুবার) জরিপের ফলাফলগুলো দেখলেই তা স্পষ্ট হয়। এই ইস্যুতে যেকোনো রাজনীতিবিদ সরব হলে ডান, বাম ও কেন্দ্রপন্থী—সব আদর্শের ভোটাররাই তাঁকে স্বাগত জানাবেন।

২০২৫ সালের শুরুতে আমরা আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ‘ফোন-মুক্ত স্কুল’ আইনের জন্য পাঁচটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, অনেক দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এই সুপারিশগুলো অনুসরণ করে নীতি গ্রহণ করেছে। এই মডেলটি কী করা উচিত, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। ফোন-মুক্ত স্কুল নীতি ইতিমধ্যে অনেক অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সফল হয়েছে।

তাই ২০২৬ সালে যেসব দেশ ও অঙ্গরাজ্য অস্ট্রেলিয়ার পথ অনুসরণ করার কথা ভাবছে, তাদের জন্য আমরা একটি আদর্শ সোশ্যাল মিডিয়া বয়সসীমা নীতির প্রস্তাব করতে চাই, যার বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

আদর্শ নীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ

১. ১৬ বছরের বয়সসীমা কঠোরভাবে বজায় রাখুন

আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, বয়ঃসন্ধিকালে শিশুদের রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়া শিশু ও কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের জন্য একেবারেই বেমানান। ইনস্টাগ্রামের একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সাত দিনে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১১% বুলিংয়ের শিকার হয়েছে, ১৩% অবাঞ্ছিত যৌন প্রস্তাব পেয়েছে, ১৯% অবাঞ্ছিত যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু দেখেছে এবং ২১% এমন পোস্ট দেখেছে যা তাদের নিজেদের সম্পর্কে হীনম্মন্যতায় ভুগিয়েছে। সাম্প্রতিক পিউ (Pew) জরিপে ৪৫% কিশোর-কিশোরী জানিয়েছে যে, তারা নিজেরাই মনে করে তারা অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে এবং অনেকেই স্বীকার করেছে যে এটি তাদের ঘুম ও পরীক্ষার ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। ১৫ বছর বয়সটি এর জন্য খুব ছোট। এটি ১৬ বছর নির্ধারণকারী দেশগুলোর নিয়মের গ্রহণযোগ্যতাকেও দুর্বল করে দেয়।

২. অভিভাবকের সম্মতির সুযোগ রাখবেন না

সন্তানদের হাতে নতুন আরেকটি আবদার করার সুযোগ তুলে দিয়ে অভিভাবকদের কাজ আরও কঠিন করে তুলবেন না। কোনো ধরনের ফাঁকফোকর না রেখে একটি একক ও স্পষ্ট ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করা অভিভাবকদের জন্য সহায়ক হবে। একবার কল্পনা করুন, যেকোনো বয়সে যদি প্রতিটি শিশু ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য তাদের বাবা-মায়ের কাছে আবদার করতে পারত, তাহলে কী হতো! সরকারগুলো নিয়মিতভাবেই গাড়ি চালানো, ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ বা মদ্যপানের মতো এমন সব পণ্য ও কার্যকলাপের জন্য ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে দেয়, যা শিশুদের ক্ষতি বা শোষণ করতে পারে—সোশ্যাল মিডিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়। সবার জন্য নীতিটি সরল ও অভিন্ন রাখুন এবং আমাদের সবার জন্য অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করাকে আরেকটু সহজ করে তুলুন।

৩. বিষয়বস্তুর (Content) পরিবর্তে চুক্তির (Contract) ওপর জোর দিন

বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বয়সসীমা নীতি নির্ধারণ (শিশুরা কী ধরনের জিনিস দেখবে) করলে তা শিশুদের জন্য কী অনুপযুক্ত—তা নিয়ে এক অন্তহীন বিতর্কের জন্ম দেয় (যেমন: কতটা যৌন উত্তেজক হলে তা অতিরিক্ত বলে গণ্য হবে, কতটা সহিংসতা মাত্রাতিরিক্ত? ইত্যাদি)। এটি অনেক সময় দৃষ্টিভঙ্গিভিত্তিক সেন্সরশিপের অভিযোগও ডেকে আনতে পারে। এ কারণেই আমরা আইনকে কেবল বিষয়বস্তুর মাপকাঠিতে না ফেলে, বরং সেই বয়সের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়নের সুপারিশ করি—যে বয়সে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে সই করে ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দেয় এবং বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়াই আসক্তি সৃষ্টিকারী অ্যালগরিদমের ফাঁদে পা দেয়। আমরা মনে করি, লগ-অফ (অ্যাকাউন্ট না থাকা) অবস্থায় বিষয়বস্তু দেখার সুযোগ থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ, যেমনটা অস্ট্রেলিয়ার নীতিতে রয়েছে। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুরা এখনো ইউটিউবের মতো সাইটে গিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় যেকোনো কিছু খুঁজতে পারে। শিক্ষক নির্ধারিত বা বন্ধুর সুপারিশ করা কোনো ভিডিও তারা সহজেই দেখতে পারে। কিন্তু যদি তাদের নিজস্ব কোনো অ্যাকাউন্ট না থাকে এবং তারা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে সই না করে, তবে তারা নিজের ছবির জনপ্রিয়তা অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে পারবে না, গভীর রাতে অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রিত নোটিফিকেশন পাবে না, চরমপন্থী বিষয়বস্তুর শিকার হবে না কিংবা ইনবক্সে অপরিচিত কারও মেসেজ পাবে না। এই ধরনের অনৈতিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং শিশুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা বিপুল তথ্যের অ্যাক্সেস ছাড়া প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং শিশুদের প্রভাবিত করার মতো ডিজাইন তৈরি করা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।

৪. প্ল্যাটফর্ম নয়, ডিজাইন ফিচারের দিকে নজর দিন

শিশুদের জীবনে সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মই আইনের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তবে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’-র যেকোনো সাধারণ সংজ্ঞা অনিবার্যভাবেই সেসব কোম্পানিকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ করে দেবে, যারা বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপ ও ফিচার নিয়ে কাজ করে। ক্ষতির মূল কারণ অর্থাৎ ডিজাইন ফিচারের দিকে নজর দিলে, আমরা সহজেই সেসব ভিডিও গেম প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে এঙ্গেজমেন্ট বাড়ানো ভিডিও-হোস্টিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে চিহ্নিত করতে পারব, যেগুলো প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। যেসব প্ল্যাটফর্মের এই ক্ষতিকর ফিচারগুলোর প্রয়োজন নেই, তারা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকি এড়াতে চাইবে এবং স্বাভাবিকভাবেই এসব ফিচার থেকে নিজেদের দূরে রাখার একটি তাগিদ অনুভব করবে।

ফোন-মুক্ত স্কুল নীতির সফলতা এবং সোশ্যাল মিডিয়া বয়সসীমা নীতির প্রতি বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের পুরো কৃতিত্ব আমরা নিতে চাই। বাস্তবতা হলো, এই নীতি ও ধারণাগুলো সফল হয়েছে, কারণ এগুলো এমন একটি সমস্যার সমাধান করে, যা অধিকাংশ অভিভাবক, শিক্ষক ও শিশু প্রতিদিন অনুভব করে। আর তা হলো আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—আমাদের শিশুদের সময় ও মনোযোগ—যা প্রযুক্তির কারসাজিতে হারিয়ে যাচ্ছে। নীতিনির্ধারক, অভিভাবক এবং শিশুরাও এখন এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, নিউইয়র্ক টাইমসের টেক পডকাস্ট ‘হার্ড ফোর্ক’-এ কো-হোস্ট কেসি নিউটন ২০২৬ সালের প্রযুক্তি প্রবণতার এক নম্বর পূর্বাভাস হিসেবে বলেছিলেন:

“সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের জন্য ১৬+ বয়সসীমা বিশ্বজুড়ে নতুন নিয়মে পরিণত হবে… ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ অন্তত আরও পাঁচটি গণতান্ত্রিক দেশকে আমরা অনুরূপ নিয়ম প্রবর্তন করতে দেখব।”

অস্ট্রেলিয়াকে অভিনন্দন, এবং সেই পাঁচটি (বা তার বেশি) দেশকেও আগাম অভিনন্দন, যারা অস্ট্রেলিয়ার সাহসী পদক্ষেপকে একটি নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত করবে। আসুন, ১৬+ বয়সসীমাকে আমরা বিশ্বব্যাপী মানদণ্ডে পরিণত করি।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. OpenAI বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সবচেয়ে মোহনীয় চ্যাটবট

    ওপেনএআইয়ের জনপ্রিয় চ্যাটবট GPT-4o বন্ধের ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোক। অনেকে বলছেন, "এভাবে চলতে পারব না।"

    প্রযুক্তিকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তামানসিক স্বাস্থ্য
  2. ভালোবাসা নয়!

    ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র আগে ডেটিং অ্যাপে ব্যবহারকারী বাড়লেও অনেকের জন্য এই দিনটি একাকীত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেন? জানুন কীভাবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের আটকে রাখে।

    প্রযুক্তিসম্পর্কডেটিং অ্যাপ
  3. ডার্ক ওয়েব কীভাবে ব্রাউজ করবেন?

    ডার্ক ওয়েব কীভাবে ব্রাউজ করবেন? জানুন টর ব্রাউজার ব্যবহারের নিয়ম, নিরাপত্তা টিপস এবং এখানে কী কী পাবেন।

    প্রযুক্তিইন্টারনেট নিরাপত্তাটর ব্রাউজার