skip to content
গুলবাহার
পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র

'কেউ হয়তো আমাদের পরীক্ষা করছে': পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কায় বিশ্ব

• ৬ মিনিট

১৯৯৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। নরওয়ে থেকে মেরুজ্যোতি (নর্দান লাইটস) নিয়ে গবেষণার জন্য একটি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। কিন্তু রাশিয়ার রাডার ব্যবস্থায় এটি ধরা পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তারা মনে করেছিল, এটি মস্কো লক্ষ্য করে ধেয়ে আসা কোনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র।

হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রার এক শীতের দুপুরে, প্রায় এক ঘণ্টার জন্য পুরো বিশ্ব যেন স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হয়েছিল। দিনটি ছিল বুধবার। রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে কর্মরত সামরিক প্রযুক্তিবিদরা তাদের স্ক্রিনে একটি অশুভ সংকেত দেখতে পান। নরওয়ের উপকূল থেকে একটি রকেট দ্রুতগতিতে ওপরের দিকে উঠে আসছে। এটি কোথায় যাচ্ছে এবং এটি কতটা বিপজ্জনক? বার্লিন প্রাচীর পতনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন পারমাণবিক যুদ্ধের উত্তেজনা বুঝি শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু সেই ধারণা সেদিন ভুল প্রমাণিত হতে চলেছিল।

যারা আকাশপথ পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাদের জন্য পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত ভীতিকর। তারা জানতেন, ওই জলসীমায় থাকা কোনো মার্কিন সাবমেরিন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে তা মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে আটটি পারমাণবিক ওয়ারহেড নিয়ে মস্কোয় আঘাত হানতে পারে। এই বার্তাটি জরুরি ভিত্তিতে চেইন অব কমান্ড বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রুশ প্রেসিডেন্ট বোরিস ইয়েলৎসিনের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বনেতা হিসেবে ইয়েলৎসিন ‘নিউক্লিয়ার ব্রিফকেস’ বা পারমাণবিক বোতামসহ সুটকেসটি সক্রিয় করেন। এই ব্রিফকেসে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের নির্দেশ ও প্রযুক্তি থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো ‘প্রতিরোধ বা ডিটারেন্স’ নীতি মেনে চলে আসছে। এর মূল কথা হলো, কোনো দেশ যদি বড় ধরনের পারমাণবিক হামলা চালায়, তবে পাল্টা হামলায় উভয় পক্ষই ধ্বংস হয়ে যাবে (মিউচুয়ালি অ্যাসিওর্ড ডেস্ট্রাকশন)। সেই টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে ইয়েলৎসিন ও তাঁর উপদেষ্টাদের জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল—তারা পাল্টা হামলা চালাবেন কি না।

আমরা এখন জানি, সেই আতঙ্ক শেষ পর্যন্ত কোনো বিপর্যয়ে গড়ায়নি। চরম উত্তেজনার পর ঘটনাটি শেষমেশ সেই রাতের সংবাদমাধ্যমে একটি হালকা মেজাজের খবরে পরিণত হয়। বিবিসির লেট নিউজে টম লেহরের ডার্ক কমেডি গান ‘উই উইল অল গো টুগেদার হোয়েন উই গো’ বাজিয়ে সংবাদটি শেষ করা হয়।

বিবিসির নিউজনাইট উপস্থাপক জেরেমি প্যাক্সম্যান সেদিন বলেছিলেন, “অনুষ্ঠান শেষ করার আগে জানানো দরকার, রাশিয়ান বার্তা সংস্থার জোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পারমাণবিক যুদ্ধ বাঁধেনি। দুপুর ১টা ৪৬ মিনিটে মস্কোর বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানায় যে রাশিয়া একটি ধেয়ে আসা মিসাইল ভূপাতিত করেছে। সাংবাদিকরা ভেবেছিলেন তারা বুঝি কেয়ামত বা মহাপ্রলয় দেখার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। তারা তৎক্ষণাৎ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফোন করেন। সেখানে একজন মুখপাত্র বেশ সাহসিকতার সঙ্গে নিশ্চিত করেন: ‘আমি নিশ্চিত যে ব্রিটিশরা রাশিয়ার দিকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়েনি’।” পেন্টাগনের মুখপাত্রও তখন অন্ধকারে ছিলেন, তিনি বলেছিলেন, “আমাদের কাছে কেবল খবরের খবর আছে।”

জিএমটি দুপুর ২টা ৫২ মিনিটে, যারা এই সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে জানতেন তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ইন্টারফ্যাক্স তাদের প্রতিবেদন সংশোধন করে জানায়, রাশিয়ার আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সংকেত পেলেও, রকেটটি আসলে নরওয়ের ভূখণ্ডেই পড়েছে।

পরে নরওয়ের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন যে, এই উৎক্ষেপণটি ছিল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। এটি একটি বেসামরিক রকেট রেঞ্জ থেকে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা কর্মসূচির অংশ ছিল। এর লক্ষ্য ছিল মেরুজ্যোতি বা অরোরা বোরিয়ালিস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। রকেটটি পরিকল্পনা অনুযায়ী রাশিয়ার আকাশসীমার অনেক আগেই সুদূর আর্কটিক দ্বীপ স্পিটসবার্জেনের কাছে সমুদ্রে পতিত হয়। প্রতিবেদনটি ভুল প্রমাণিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রুশ প্রতিরক্ষা সূত্র ইন্টারফ্যাক্সকে জানায়, এই উৎক্ষেপণটি তাদের আগাম সতর্কীকরণ রাডার সিস্টেম পরীক্ষা করার জন্য করা হয়েছিল কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি।

১৯৮৭ সালের একটি ঘটনার পর থেকেই রাশিয়া তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বেশ স্পর্শকাতর ছিল। সেবার পশ্চিম জার্মানির কিশোর ম্যাথিয়াস রাস্ট একটি এক ইঞ্জিনের বিমানে করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্ত প্রতিরক্ষা বলয় ফাঁকি দিয়ে প্রায় ৫০০ মাইল (৭৫০ কিমি) পাড়ি দিয়ে ক্রেমলিনের গেটে অবতরণ করেছিলেন। স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও, নরওয়ের রকেট ঘটনাটি প্রমাণ করে যে রুশ কর্মকর্তাদের মনে পারমাণবিক হুমকি নিয়ে তখনো ভীতি কাজ করছিল।

নরওয়ের বিজ্ঞানী কোলবিয়র্ন অ্যাডলফসেন বলেন, “আমাদের রুটিন উৎক্ষেপণ নিয়ে এমন তোলপাড়ের কথা শুনে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।” তিনি তখন একটি মিটিংয়ে ছিলেন, যখন একের পর এক ফোন আসতে শুরু করে। আরও অদ্ভুত বিষয় হলো, এই উৎক্ষেপণের কয়েক সপ্তাহ আগেই নরওয়ে মস্কোকে এ বিষয়ে জানিয়েছিল। মিস্টার অ্যাডলফসেন ধারণা করেন, মেরুজ্যোতি গবেষণার রকেট প্রথমবারের মতো এত উঁচুতে (৯০৮ মাইল উচ্চতায়) ওঠার কারণেই হয়তো রুশরা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে তিনি বলেন, এটি তাদের কাছে চমক হিসেবে আসা উচিত ছিল না। তিনি বলেন, “১৪ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব দেশকে বার্তা পাঠানো হয়েছিল যে আমরা এই উৎক্ষেপণ করতে যাচ্ছি।” কিন্তু কোনো একভাবে সেই সতর্কবার্তা সঠিক ডেস্কে বা দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে পৌঁছায়নি। একটি মাত্র বার্তা হারিয়ে যাওয়া যে কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এটি ছিল তারই এক কঠোর সতর্কবার্তা।

ইতিহাসের অন্যান্য বিপজ্জনক মুহূর্ত

পারমাণবিক যুগের শুরু থেকেই এমন অনেক ‘নিয়ার মিস’ বা অল্পের জন্য রক্ষা পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সর্বাত্মক পারমাণবিক যুদ্ধ বাঁধার সবচেয়ে কাছাকাছি মুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়। ২০২০ সালে বিবিসি ফিউচারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিথি পাখির ঝাঁক, চাঁদ, কম্পিউটারের ত্রুটি থেকে শুরু করে মহাকাশের আবহাওয়া—নানা কারণে মিথ্যা সতর্ক সংকেত বেজে ওঠার নজির রয়েছে। ১৯৫৮ সালে একটি বিমান ভুলবশত একটি পরিবারের বাগানে পারমাণবিক বোমা ফেলে দিয়েছিল, সৌভাগ্যবশত তাতে কেবল কিছু মুরগি মারা গিয়েছিল। ১৯৬৬ সালে দুটি মার্কিন সামরিক বিমান স্পেনের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের ওপর বিধ্বস্ত হয়, যার একটিতে চারটি পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। এমনকি ২০১০ সালেও মার্কিন বিমান বাহিনী ৫০টি মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছিল, ফলে স্বয়ংক্রিয় উৎক্ষেপণ হলে তা থামানোর কোনো উপায় ছিল না।

‘বিপজ্জনক মুহূর্ত’ ও ভিন্নমত

ঘটনার পর ইয়েলৎসিন যে ঘোষণা দিয়েছিলেন—তিনি প্রথমবারের মতো পারমাণবিক ব্রিফকেস ব্যবহার করেছেন—সেটিকে রাশিয়ার অনেকে তখন দম্ভোক্তি হিসেবেই দেখেছিলেন। তাদের মতে, চেচেন যুদ্ধের ব্যর্থতা থেকে নজর ফেরাতেই তিনি এমনটা বলেছিলেন। পরের দিন ইন্টারফ্যাক্সকে তিনি বলেন, “আমি সত্যিই গতকাল প্রথমবারের মতো আমার ‘কালো’ সুটকেসটি ব্যবহার করেছি, যার বোতামটি সবসময় আমার সঙ্গেই থাকে।” তিনি আরও যোগ করেন, “কেউ হয়তো আমাদের পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কারণ মিডিয়া সারাক্ষণ বলে বেড়াচ্ছে যে আমাদের সেনাবাহিনী দুর্বল।”

তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ গবেষক পাভেল পডভিগ বলেন, “আমি যদি এই ঘটনাগুলোর ভয়াবহতার ক্রম করি… তবে আমি এটিকে ১০-এর মধ্যে ৩ দেব। স্নায়ুযুদ্ধের সময় এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।” তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে, পারমাণবিক ব্রিফকেসের দৃশ্যটি হয়তো ইয়েলৎসিনের জন্য ঘটনার পরের দিন সাজানো হয়েছিল। রুশ পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির ডভোরকিন বলেছিলেন, নরওয়ের ওই সতর্কবার্তায় কোনো বিপদ ছিল না, “একেবারেই না”। ১৯৯৮ সালে তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছিলেন, “এমনকি যখন কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বড়সড় হামলার সংকেত দেয়, তখনও কেউ সিদ্ধান্ত নেবে না, এমনকি একজন অযৌক্তিক নেতাও একটি মিসাইল ছোড়া দেখে বিচলিত হবেন না। আমার মনে হয় এটি একটি ফাঁকা বা ভিত্তিহীন আতঙ্ক ছিল।”

ঘটনার পাঁচ দিন পর বিবিসির রেডিও বুলেটিনে জানানো হয় যে, রাশিয়া এই সতর্কবার্তাকে একটি “ভুল বোঝাবুঝি” হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বলেছে এমনটি আর ঘটা উচিত নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, নরওয়েজিয়ানরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মেনেই কাজ করেছে এবং তাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ থাকা উচিত নয়। যদিও বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেছে, তবুও একটি নিরীহ আবহাওয়া রকেট যে এমন আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, তা আজও শঙ্কার বিষয়।

উৎস: Norwegian Rocket Incident - Wikipedia

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

২টি লেখা
  1. কিম জং উনের উত্তরাধিকারী হলেন কন্যা কিম জু-এ

    দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ১৩ বছর বয়সী কিম জু-একে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছেন কিম জং উন। সম্প্রতি বেইজিং সফরসহ নানা অনুষ্ঠানে বাবার পাশে দেখা গেছে তাকে।

    উত্তর কোরিয়াকিম জং উনআন্তর্জাতিক
  2. অস্ত্র যখন ‘কারি মসলা’, নেপথ্যে ভারতীয় কর্মী

    জাপানের সাইতামায় ৭৮ লাখ ইয়েন ছিনতাইয়ের অদ্ভুত চেষ্টা। কারি মসলা ছিটিয়ে জাপানি ব্যবসায়ীকে অন্ধ করার চেষ্টা করল তারই ভারতীয় কর্মচারী ও সহযোগীরা।

    আন্তর্জাতিকজাপানঅপরাধ