প্রথম ব্রিটিশ মুসলিম লর্ড
ভিক্টোরিয়ান যুগের অভিজাত লর্ড হেনরি স্ট্যানলির জীবন—যিনি ১৮৫৯ সালে ইসলাম গ্রহণ করে হাউস অব লর্ডসের প্রথম মুসলিম সদস্য হন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যদি কোনো নিজস্ব জাতীয় স্থাপত্যশৈলী থেকে থাকে, তবে তা হলো স্কাইস্ক্র্যাপার বা আকাশচুম্বী ভবন। আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে থাকা টাওয়ার নির্মাণের ধারণাটি প্রাচীন হলেও, একে একটি লাভজনক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার পেছনে সাহসী আমেরিকানদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রথম দিকের স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো পুরোনো বিশ্বের স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত হয়েছিল। যেমন, মেট লাইফ টাওয়ার নির্মিত হয়েছিল ইতালীয় ক্যাম্পানাইলের মতো করে, আর উলওয়ার্থ বিল্ডিং তৈরি হয়েছিল ফরাসি গথিক ক্যাথিড্রালের আদলে। তবে বিদেশিরাও একমত ছিলেন যে, এ ধরনের ভবন কেবল আমেরিকার মতো অসাধারণ একটি জাতির সঙ্গেই মানানসই। দশকের পর দশক ধরে শুধু আমেরিকানরাই এগুলো নির্মাণ করেছেন। ইউরোপের আধুনিক স্থপতিরা ফ্রিডরিখস্ট্রাসে বা সেবাস্তোপল বুলভার্ডে চকচকে টাওয়ার নির্মাণের স্বপ্ন দেখলেও, সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য তাদের আটলান্টিক পাড়ি দিতে হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ ১৫০টি ভবনের মধ্যে ১৪৭টিই ছিল মার্কিন মুলুকে।
আমেরিকার কর্মঠতা, অদম্য আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্যের প্রতি উদাসীনতা এবং সাহসী প্রচেষ্টাকে স্কাইস্ক্র্যাপারের চেয়ে ভালোভাবে অন্য কোনো স্থাপত্যশৈলী ফুটিয়ে তুলতে পারে না। অথচ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতি এই গুণগুলোকে দৃষ্টিকটু বলে মনে করত। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই আমেরিকানদের স্কাইস্ক্র্যাপার উদ্ভাবনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তবে আমেরিকার বহুসংস্কৃতিবাদই তাদের উপহার দিয়েছিল সর্বশ্রেষ্ঠ স্কাইস্ক্র্যাপার নির্মাতাকে। তিনি হলেন ফজলুর রহমান খান নামে এক বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসী।
১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকায় (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অংশ) ফজলুর রহমান খান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন গণিত শিক্ষক। তিনিই ছোটবেলা থেকে ফজলুর রহমানের মনে কারিগরি বিষয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করেন এবং কলকাতার বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার জন্য তাঁকে উৎসাহিত করেন। সেখানে তিনি দারুণ ফলাফল করেন এবং স্নাতক শেষে ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে তিনি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইঞ্জিনিয়ারিং মেকানিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং মাত্র তিন বছরের মধ্যে দুটি মাস্টার্স ও একটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কিছুদিন পাকিস্তানে কাটিয়ে তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্থাপত্য ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর, ওয়িংস অ্যান্ড মেরিল (এসওএম)-এর শিকাগো অফিসে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন।
উঁচু ভবন নির্মাণের কোনো ইতিহাস বা ঐতিহ্য নেই, এমন একটি দেশে জন্মেও ড. ফজলুর রহমান খান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা কাঠামোগত প্রকৌশলের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটান এবং আমেরিকার আইকনিক ভবনগুলো নির্মাণে অসামান্য অবদান রাখেন।
স্কাইস্ক্র্যাপার ডিজাইনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল ভবনের বিশাল ওজন ধরে রাখা নয়। বরং এর মূল চ্যালেঞ্জ হলো পার্শ্বীয় চাপ বা ল্যাটারাল লোড (Lateral load), যেমন বাতাস ও ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলানো। অনেকেই মনে করেন, কোনো ভবন যদি এতটাই উঁচু হয় যে বাতাসের চাপই এর নকশা তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেটিই হলো স্কাইস্ক্র্যাপার।
ভবনের ওপর কাজ করা নিম্নমুখী চাপ মূলত ভবনের নিজস্ব ওজন (ডেড লোড) এবং এর বাসিন্দাদের ওজনের (লাইভ লোড) সমন্বয়ে গঠিত হয়, যা মাধ্যাকর্ষণ বলের কারণে সৃষ্টি হয়। ফলে এই ধরনের চাপ তুলনামূলকভাবে অনুমানযোগ্য, স্থির এবং তা কেবল একমুখী হয়ে থাকে। কিন্তু বাতাসের চাপ পরিমাপ করা বেশ কঠিন। এটি যেকোনো দিক থেকে আসতে পারে এবং ‘ভর্টেক্স শেডিং’ (Vortex shedding)-এর মতো জটিল প্রভাব তৈরি করতে পারে। (ভূমিকম্পজনিত চাপের বিষয়টি এখানে বাদ দেওয়া হলো। তবে উল্লেখ্য যে, লম্বা ও সরু ভবনগুলো নিজেদের স্বাভাবিক নমনশীলতার কারণে ভূমিকম্পে বেশ ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।)

বাতাস যখন ভবনের একপাশে ধাক্কা দেয়, তখন ভবনটির বেঁকে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এই বক্রতা প্রতিরোধ করার জন্য ভবনের কাঠামোর পর্যাপ্ত দৃঢ়তা (Stiffness) থাকা প্রয়োজন, নাহলে এটি ফাউলের শিকার হওয়া ইতালীয় ফুটবলারের মতোই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। উলওয়ার্থ বিল্ডিং বা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের মতো শুরুর দিকের স্কাইস্ক্র্যাপারগুলোতে মোমেন্ট ফ্রেম বা পোর্টাল ফ্রেম ব্যবহার করে এই হেলে পড়ার চাপ প্রতিরোধ করা হতো। মূলত কলাম ও বিমগুলোকে এমনভাবে শক্ত করে যুক্ত করা হতো, যাতে সেগুলো একে অপরের সাপেক্ষে ঘুরতে বা নড়তে না পারে। বাতাসের চাপের সমান্তরালে সাজানো এই ফ্রেমগুলো ভবনকে যথেষ্ট দৃঢ়তা প্রদান করত। এছাড়া বাইরের দিকের ভারী পাথর, ইট ও টেরাকোটার আচ্ছাদন বা ফ্যাসাডও (Facade) এক ধরনের ব্যালাস্ট (ভারসাম্য রক্ষাকারী ওজন) হিসেবে কাজ করত।
তবে এই পার্শ্বীয় ব্যবস্থায় কিছু সহজাত সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে ‘সুপারটল’ (প্রায় ১০০০ ফুটের বেশি উঁচু) ভবন নির্মাণ বেশ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ত। স্কাইস্ক্র্যাপারে উলম্ব বা লম্বালম্বি চাপ উচ্চতার সঙ্গে সমানুপাতিক হারে বাড়ে। অর্থাৎ, ভবনের আকৃতি যদি ওপরের দিকে সরু না হয়, তবে এর ৮০ তলার ওজন ৪০ তলার ওজনের প্রায় সমানই থাকে। কিন্তু বাতাসের কারণে তৈরি হওয়া হেলে পড়ার মোমেন্ট (Overturning moment) উচ্চতার বর্গের সঙ্গে বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ হলো, ৪০ তলা ভবনের চেয়ে একটি ৮০ তলা ভবনকে চার গুণ বেশি বক্রতার চাপ বা বাঁকানো বল সহ্য করতে হয়। (বাস্তবে এটি চার গুণেরও বেশি হয়, কারণ উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের বেগও বাড়তে থাকে।)
ডেভেলপারদের স্কাইস্ক্র্যাপার নির্মাণের প্রধান লক্ষ্যই হলো, ভবনে যত বেশি সম্ভব তলা যুক্ত করে ভাড়া দেওয়ার উপযোগী জায়গার পরিমাণ বাড়ানো এবং বিনিয়োগ থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে আনা। স্থপতি ক্যাস গিলবার্টের ভাষায়, স্কাইস্ক্র্যাপার হলো ‘জমি থেকে লাভ তোলার যন্ত্র’। কিন্তু পুরোনো ও তুলনামূলক কম কার্যকর মোমেন্ট ফ্রেম ব্যবহারে উপাদান ও শ্রমের যে অতিরিক্ত খরচ বা ‘প্রিমিয়াম’ যুক্ত হতো, তাতে ৪০ তলার বেশি উঁচু ভবন নির্মাণ করলে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার কমে আসত। আরও কার্যকর কোনো পার্শ্বীয় ব্যবস্থা উদ্ভাবিত না হলে, সুপারটল ভবন নির্মাণ কখনোই বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হতো না।
শিকাগোর ৪৩ তলা চেস্টনাট-ডিউইট অ্যাপার্টমেন্টের পার্শ্বীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নির্মাণের সময় ড. খান প্রচলিত নকশা থেকে বেরিয়ে এসে একটি পূর্ণাঙ্গ ও ত্রিমাত্রিক পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ দেখতে পান। ভবনটিকে আলাদা আলাদা মোমেন্ট ফ্রেম বা শিয়ার ওয়ালের সমষ্টি হিসেবে না দেখে, তিনি পুরো ভবনটিকেই ভিত্তির ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ফাঁপা আয়তাকার টিউব হিসেবে কল্পনা করেন। জানালার জন্য এই টিউবের গায়ে ছিদ্র রাখার প্রয়োজন ছিল ঠিকই, কিন্তু পুরো ভবনটি নিজেই একটি বিশাল ‘ক্যান্টিলিভার্ড বক্স বিম’-এর মতো কাজ করবে। এর ফলে বাতাসের কারণে বেঁকে যাওয়ার চাপ কেবল বাতাসের সমান্তরাল পাশ দিয়েই নয়, বরং ভবনের লম্বালম্বি পাশ দিয়েও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। এ ব্যবস্থায় বাতাসের দিকের অংশে টান (Tension) তৈরি হবে এবং ঠিক তার বিপরীত অংশে চাপ (Compression) পড়বে। এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো, মূল কাঠামো ভবনের বাইরের অংশে বা পরিধিতে সরিয়ে নেওয়ায় ভেতরের দিকে খোলামেলা ও কলামমুক্ত জায়গা অনেক বেড়ে যায়।

১৯৬৪ সালে নির্মিত চেস্টনাট-ডিউইট বিল্ডিংটি বাইরে থেকে দেখতে আর দশটা সাধারণ বাক্স আকৃতির স্কাইস্ক্র্যাপারের মতোই ছিল, ঠিক যেমন স্পুটনিক স্যাটেলাইটকে দেখতে নিছক একটি ধাতব বাস্কেটবলের মতো মনে হতো। শিকাগোর আকাশরেখায় বা স্কাইলাইনে এটি হয়তো খুব একটা নজর কাড়ে না, কিন্তু এর ভেতরের পার্শ্বীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই যুগান্তকারী। অন্য প্রকৌশলীরা খুব দ্রুতই ফ্রেমড টিউব প্রযুক্তির কার্যকারিতা অনুধাবন করতে সক্ষম হন। এর সুস্পষ্ট প্রভাব দেখা যায় শিকাগোর অ্যামোকো বিল্ডিং (বর্তমানে এওন সেন্টার) এবং নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নকশায়।
চেস্টনাট-ডিউইট সফল হলেও ড. খান বুঝতে পারেন যে, তাঁর ফ্রেমড টিউব নকশায় একটি ত্রুটি রয়ে গেছে। কংক্রিটের বিম ও কলামের সঞ্চিত নমনশীলতার কারণে তিনি ভবনটিতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রার নিখুঁত বক্রতা-প্রতিরোধক প্রভাব (Bending effect) অর্জন করতে পারেননি। এর বদলে ‘শিয়ার ল্যাগ’ (Shear lag) নামক একটি কাঠামোগত প্রভাব ভবনের দৃঢ়তা কিছুটা কমিয়ে দিচ্ছিল এবং তাত্ত্বিকভাবে চাপের আদর্শ বণ্টনকে বাধাগ্রস্ত করছিল। সৌভাগ্যবশত, কয়েক বছর পরই তিনি এই সমস্যা সমাধানের একটি মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যান।

ডেভেলপার জেরি উলম্যান শুরুতে ভেবেছিলেন, শিকাগোর মিশিগান অ্যাভিনিউয়ের একটি প্লটে দুটি ছোট ভবন মিলিয়ে তৈরি হবে জন হ্যানকক সেন্টার। কিন্তু এসওএম-এর স্থপতিরা নকশা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা করার পর শেষমেশ একটি সুবিশাল ও বহুমাত্রিক ব্যবহারের টাওয়ার নির্মাণের সিদ্ধান্তে উপনীত হন। অফিসের জন্য বড় ফ্লোর প্লেট এবং অ্যাপার্টমেন্টের জন্য ছোট ফ্লোর প্লেটের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে দলটি এমন একটি ভবনের নকশা করে, যা ওপরের দিকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে সরু হয়ে একটি লম্বাটে, মাথা-কাটা পিরামিডের রূপ নেবে।
ফজলুর রহমান খান এটিকে তাঁর ‘ট্রাসড টিউব’ (Trussed tube) নকশা বাস্তবায়নের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখেন। এই ধারণাটি তিনি ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে তাঁর ছাত্র মিকিও সাসাকির সঙ্গে যৌথভাবে উদ্ভাবন করেছিলেন। চেস্টনাট-ডিউইটের কলাম ও বিমের জালের বদলে, এই নতুন টাওয়ারটি তার দৃঢ়তা পাবে ভবনের চারপাশের শক্তিশালী কোণাকুণি বা ডায়াগোনাল স্টিল মেম্বার দিয়ে তৈরি ট্রাস (Truss) থেকে। ট্রাসড টিউবের এই অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা ‘শিয়ার ল্যাগ’ প্রভাবকে অনেকখানি কমিয়ে আনবে, উলম্ব বা লম্বালম্বি চাপকে সমানভাবে বণ্টন করবে এবং ভবনের ভেতরে আরও বেশি খোলামেলা ও কলামমুক্ত জায়গার সুবিধা নিশ্চিত করবে।

হ্যানকক সেন্টারের এই অনন্য নকশাটি সফল করার জন্য এসওএম-এর স্থাপত্য ও প্রকৌশল দলের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। বেশ কয়েকবার নকশা পরিবর্তনের পর ফজলুর রহমান খান ও স্থপতি ব্রুস গ্রাহাম এমন একটি আদর্শ আকার, ঢাল ও ফ্লোরের উচ্চতা খুঁজে বের করতে সক্ষম হন। এই সমন্বয় ভবনের নান্দনিক স্থাপত্যের সঙ্গে কাঠামোগত নকশার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটায়। ভবনটি এর ভিত্তিতে ১৬৫ ফুট বাই ২৬৫ ফুট থেকে ওপরের দিকে সরু হতে হতে ছাদে গিয়ে ১০০ ফুট বাই ১৬০ ফুটে দাঁড়াবে। আর ১১০৭ ফুট উঁচু এই ভবনের বাইরের দেয়াল বা ফ্যাসাড বেয়ে ৬টি স্তরে দৃষ্টিনন্দন ও সাহসী ক্রস-ব্রেসিং (Cross-bracing) উঠে যাবে।
তবে ভবনের ট্রাসড টিউবের বিন্যাস চূড়ান্ত হওয়ার পর ডেভেলপার প্রস্তাব দেন যেন ভবনের শীর্ষ তলাগুলো থেকে কোণাকুণি মেম্বার বা ব্রেসিংগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, ওপরের দিকের দামি অ্যাপার্টমেন্টগুলোর জানালা থেকে বাইরের দৃশ্য দেখার ক্ষেত্রে যেন কোনো বাধা না থাকে। ড. খান জানতেন যে কাঠামোগত দিক থেকে এটি করা সম্ভব। কিন্তু তিনি মনে করতেন, এমনটি করা হলে নিচের ৯০০ ফুট পর্যন্ত থাকা ক্রস ব্রেসিংয়ের যে শক্তিশালী ‘স্ট্রাকচারাল-ভিজ্যুয়াল ধারাবাহিকতা’ তৈরি হয়েছে, তা নষ্ট হয়ে যাবে। টাওয়ারের শীর্ষে পৌঁছানোর আগেই যদি এই ব্রেসিং থামিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা দেখতে এমন অদ্ভুত লাগবে। মনে হবে যেন বিখ্যাত সিনেমা ‘কাসাব্লাঙ্কা’-এর শেষ দৃশ্য ক্লেমেশন (অ্যানিমেশন) দিয়ে শুট করা হয়েছে বা বেইথোভেনের সপ্তম সিম্ফনির শেষ অংশটি ডিজেরিডু (এক প্রকার বাঁশি) দিয়ে বাজানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি ভবনের মালিককে এই ব্রেসিং ধরে রাখতে রাজি করাতে সক্ষম হন। এ ক্ষেত্রে তিনি একজন প্রকৌশলীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাগাড়ম্বরপূর্ণ কৌশলটি প্রয়োগ করেছিলেন। সেই কৌশল হলো ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বোধ্য সব কারিগরি পরিভাষা ব্যবহার করে অপর পক্ষকে বিভ্রান্ত করে সম্মতি আদায় করে নেওয়া। শেষ পর্যন্ত ফজলুর রহমান খানেরই জয় হয় এবং শীর্ষ স্তরেও কোণাকুণি মেম্বারগুলো সগৌরবে নির্মিত হয়।
১৯৬৯ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর জন হ্যানকক সেন্টার বিশ্বের দ্বিতীয় ১০০ তলা স্কাইস্ক্র্যাপারের মর্যাদা লাভ করে। ১০২ তলা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং নির্মাণের জন্য যেখানে প্রতি বর্গফুটে ৪২.২ পাউন্ড স্টিল লেগেছিল, সেখানে জন হ্যানকক সেন্টারে লেগেছিল মাত্র ২৯.৭ পাউন্ড। এই ৩০ শতাংশ কাঁচামাল সাশ্রয়ের অর্থ হলো, বেঁচে যাওয়া স্টিল দিয়ে অনায়াসেই ৪০ তলা বিশিষ্ট আরেকটি আস্ত স্কাইস্ক্র্যাপার নির্মাণ করা যেত! নির্মাণসামগ্রীর এই কার্যকর ব্যবহারের ফলে মালামাল ডেলিভারি, শপ ড্রয়িং, ক্রেনের ব্যবহার এবং শ্রমঘণ্টাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। ‘উচ্চতার প্রিমিয়াম’ বা অতিরিক্ত খরচের এই বোঝা কমিয়ে ড. খান ডেভেলপারদের প্রমাণ করে দেখান যে, একটি ১০০ তলা ভবন নির্মাণ করতে দুটি ৫০ তলা ভবনের চেয়ে খুব বেশি অর্থ ব্যয় করার কোনো প্রয়োজন নেই।
স্থপতি ব্রুস গ্রাহাম ও ফজলুর রহমান খানের ট্রাসড টিউব ফ্রেমিংটিকে ভবনের বাইরের দিকে দৃশ্যমান রাখার সিদ্ধান্তটি জন হ্যানকক সেন্টারকে রাতারাতি একটি স্থাপত্য আইকনে পরিণত করে। কাঠামোগত অভিব্যক্তিবাদ (Structural Expressionism)-এর এক বিশুদ্ধতম ও দৃষ্টিনন্দন রূপ হিসেবে হ্যানকক ভবনটি এর পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, ঠিক কীভাবে এর এই অবিশ্বাস্য উচ্চতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আমি এই ভবনটিকে এতটাই সম্মান করি যে, লেগো (Lego) দিয়ে তৈরি হ্যানকক সেন্টারের মডেল কিনতে আমি সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম, কারণ মডেলটিতে মূল ভবনের নকশার বিকট অসঙ্গতি ছিল।
কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বিখ্যাত গেম সিমসিটি ২০০০ (SimCity 2000)-এর প্লাইমাউথ আর্কোলজি (Plymouth Arcology)-এর অনুপ্রেরণা ছিল এই জন হ্যানকক সেন্টার।

শিকাগোর সাউথ ওয়াকার ড্রাইভে ৩ একর জমি কেনার পর, সিয়ার্স কোম্পানি তাদের প্রধান কার্যালয় ও অতিরিক্ত ভাড়াটেদের জন্য ২০ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস বিশিষ্ট একটি টাওয়ারের নকশা তৈরির দায়িত্ব দেয় এসওএম-কে। এসওএম-এর পার্টনার ফজলুর রহমান খান এটিকে তাঁর দীর্ঘদিনের একটি ধারণা বাস্তবায়নের সুযোগ হিসেবে দেখেন, যা ডিউইট-চেস্টনাট অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের সময় থেকেই তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ‘শিয়ার ল্যাগ’ প্রভাব যে ফ্রেমড টিউব নকশার কার্যকারিতা সীমিত করে দিয়েছিল, তা অনুধাবন করে তিনি বিশ্বাস করতেন, ভবনের প্রতিটি পাশের কাঠামোর সাথে আরেকটি অতিরিক্ত প্রতিরোধক যোগ করে এর দৃঢ়তা অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ, তিনি একটি বিশাল টিউবকে ছোট ছোট টিউবের গ্রিডে ভাগ করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর মতে, এই ‘বান্ডল্ড টিউব’ (Bundled tube) ব্যবস্থাটি অনেক কম শিয়ার ল্যাগ নিয়ে অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাজ করবে। ড. খান এক মুঠো সিগারেট বা পানীয়ের স্ট্র শক্ত করে ধরে এই নকশার পেছনের বিজ্ঞানটি বোঝাতেন। একটি স্ট্র একা বেশ নমনীয়, কিন্তু অনেকগুলো স্ট্র একসাথে শক্ত করে বাঁধলে তা প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী একটি নিখুঁত নকশা কৌশল উদ্ভাবনের জন্য ড. খান আবারও স্থপতি ব্রুস গ্রাহাম ও প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হাল আয়েঙ্গারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ শুরু করেন। বেশ কয়েকটি কাঠামো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর, দলটি অবশেষে একটি আদর্শ ৩ বাই ৩ (৩x৩) বান্ডল বা গুচ্ছ নির্বাচন করে। এই বান্ডলের প্রতিটি টিউব মডিউলের আকার ছিল ৭৫ ফুট বাই ৭৫ ফুট, যা টাওয়ারটিকে ভিত্তিমূলে ২২৫ ফুট বর্গাকার একটি বিস্তৃতি বা ফুটপ্রিন্ট এনে দেয়। এই নয়টি টিউব একসঙ্গে ৫০ তলা পর্যন্ত ওপরে ওঠে। সেখান থেকে দুটি টিউব বাদ পড়ে এবং বাকি সাতটি টিউব ৬৬তম তলা পর্যন্ত পৌঁছায়। এরপর মাত্র পাঁচটি টিউব ৯০তম তলা পর্যন্ত ওঠে এবং সবশেষে কেবল দুটি টিউব ১০৮তম তলার ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
টাওয়ারের বিপুল উচ্চতা এবং অস্বাভাবিক ও অসমমিত (Asymmetrical) বাতাসের গতির কারণে এর পার্শ্বীয় চাপের বিশ্লেষণ প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত জটিল। নকশার এই অভিনবত্ব এবং এত বড় একটি ভবনের গতিশীল প্রতিক্রিয়ার (Dynamic response) সঙ্গে যুক্ত অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে, ফজলুর রহমান খান ও আয়েঙ্গার ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের পার্শ্বীয় ব্যবস্থার ওপর চাপের হিসাব-নিকাশে বেশ রক্ষণশীল পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ, ভবনের চূড়ান্ত নকশাটি এমনভাবে তৈরি হয়, যা শিকাগোর গত ১০০০ বছরের ইতিহাসে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে প্রচণ্ড ঝড়ের সৃষ্ট বাতাসের চাপের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ বেশি বল প্রতিরোধ করতে সক্ষম।
১৯৭৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সিয়ার্স টাওয়ার (বর্তমানে উইলিস টাওয়ার) বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবনের খেতাব অর্জন করে এবং পরবর্তী ২২ বছর ধরে সগৌরবে এই খেতাবটি নিজের দখলে রাখে।
ফজলুর রহমান খান নিউ অরলিন্সের ওয়ান শেল স্কয়ার, মেলবোর্নের বিএইচপি হাউস ও মিলওয়াকির ইউএস ব্যাংক সেন্টারের নকশা করেন। এছাড়া শিকাগোর অন্টারি সেন্টার ও ওয়ান ম্যাগনিফিসেন্ট মাইল এবং জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হজ টার্মিনালেরও নকশা তাঁর হাতেই তৈরি হয়। এর প্রতিটি প্রকল্পেই তিনি নতুন নতুন কাঠামোগত সমাধান ও প্রকৌশল ডিজাইনের যুগান্তকারী অগ্রগতি নিয়ে এসেছিলেন। মাত্র ৫২ বছর বয়সে তাঁর যদি অকালমৃত্যু না হতো, তবে আমি নিশ্চিত, আজ আমরা হয়তো সবাই ‘দি এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক’ সিনেমার ভাসমান বেসপিন মাইনিং আউটপোস্ট ‘ক্লাউড সিটি’-তেই বসবাস করতাম!
পার্শ্বীয় চাপ প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাশাপাশি, ড. খান উঁচু ভবনের দুলুনি (Sway) এবং কাঠামোগত ব্যবস্থার ওপর তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাবের মতো গভীর ও জটিল বিষয়গুলো নিয়েও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি একশোরও বেশি প্রকৌশল গবেষণাপত্র রচনা করেন, অসংখ্য ছাত্রকে দিকনির্দেশনা দেন এবং সারা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক বক্তৃতা প্রদান করেন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা কাঠামোগত প্রকৌশলে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, ‘কাউন্সিল অন টল বিল্ডিংস অ্যান্ড আরবান হ্যাবিট্যাট’ (CTBUH) তাদের আজীবন সম্মাননা পদকটি তাঁর নামে নামকরণ করে। পূর্ববর্তী প্রজন্মের প্রকৌশলীরা যদি সফলতার মানদণ্ড বা ‘বার’ উঁচুতে স্থাপন করে থাকেন, তবে ফজলুর রহমান খান সেই বারের ওপর ভর করে সরাসরি সূর্যের দিকেই লাফ দিয়েছিলেন।
স্থাপত্য জগতে ফজলুর রহমান খানের প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, এটি কেবল আমার মতো গুটিকয়েক কাঠখোট্টা বা উদ্ভট প্রকৌশলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। যদিও তিনি আজ আর বেঁচে নেই এবং তাঁর নির্মিত সর্বোচ্চ ভবনগুলোকে উচ্চতার দিক থেকে অন্য ভবনগুলো ছাড়িয়ে গেছে, তা সত্ত্বেও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সুপারটল স্কাইস্ক্র্যাপারের নকশাতেই ড. খানের কাজের সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। আপনি শিকাগো বা দুবাইতে থাকুন, মস্কো বা লন্ডনে থাকুন কিংবা শেনজেনে থাকুন। যেখানেই থাকুন না কেন, আপনি কোনো না কোনোভাবে ফজলুর রহমান খানের স্থাপত্যের ছায়াতেই দাঁড়িয়ে আছেন।
ড. ফজলুর রহমান খান সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে ইয়াসমিন সাবিনা খানের (ড. খানের কন্যা) লেখা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং আর্কিটেকচার: দ্য ভিশন অব ফজলুর আর. খান’ এবং মীর আলীর লেখা ‘আর্ট অব দ্য স্কাইস্ক্র্যাপার: দ্য জিনিয়াস অব ফজলুর খান’ বই দুটি পড়তে পারেন।
প্রথম ব্রিটিশ মুসলিম লর্ড
ভিক্টোরিয়ান যুগের অভিজাত লর্ড হেনরি স্ট্যানলির জীবন—যিনি ১৮৫৯ সালে ইসলাম গ্রহণ করে হাউস অব লর্ডসের প্রথম মুসলিম সদস্য হন।
ক্রিকেটের ইতিহাস
ফুটবলের পর ক্রিকেটই বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা। ২৫০ কোটি অনুসারী নিয়ে এই খেলার উৎপত্তি থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইতিহাস জানুন।
অপরাধ, অভিশাপ ও প্রতিশোধ: মিয়াসমার গল্প
প্রাচীন গ্রিসে মিয়াসমা বলতে বোঝাত আধ্যাত্মিক দূষণ, যা সাধারণত অবাধ রক্তপাতের কারণে সৃষ্টি হতো।