চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ
চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প
একটি ডিভাইসে সব ফিচার যুক্ত করার ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে চমৎকার। এতে জায়গা এবং সময়ের পাশাপাশি অর্থও সাশ্রয় হয়। কিন্তু বাস্তবে সব ফিচার একে অপরের সাথে লড়াই করে। ফলে ডিভাইসগুলো যেমন জটিল হয়ে যায়, তেমনি এগুলোর স্থায়িত্বও কমে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এগুলো ভ্যাম্পায়ারের মতো আমাদের মূল্যবান মনোযোগ শুষে নেয়।
আগে ফোন মানে ছিল কেবল কল করা। এখন সেটি ভিডিও ক্যামেরা এবং ফটো ক্যামেরার কাজ করে। একইসাথে এটি মাল্টিমিডিয়া কম্পিউটার এবং পেজারের ভূমিকাও পালন করছে। যেকোনো সময় একটি ইনকামিং কল আপনার কাজে বাধা দিতে পারে। আবার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপে ডুমস্ক্রলিং করার প্রলোভন তো রয়েছেই। এমনকি টিভি বা ফ্রিজের মতো গৃহস্থালি যন্ত্রও এখন স্মার্ট হয়ে গেছে। এগুলো নোটিফিকেশন পাঠিয়ে বা বিজ্ঞাপন দেখিয়ে আপনার মনোযোগ কাড়ার চেষ্টা করে।
অন্যদিকে কম্পিউটারে বসে লেখালেখি করা এখন যুদ্ধের মতো। এটি মূলত বিক্ষিপ্ত চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াই। তাই মানুষ হতাশ হয়ে ডিজিটাল টাইপরাইটারের দিকে ঝুঁকছে। একইভাবে ‘ডাম্ব ফোন’ বা একক কাজের ডিভাইসগুলো আবার ফিরে আসছে। কেউ এগুলো কিনছেন আবার কেউ নিজেরাই বানিয়ে নিচ্ছেন। তাহলে কি ‘সবকিছু ডিভাইসের’ যুগ শেষ হতে চলেছে? সম্ভবত সরল সময়ে ফেরার একটি পথ তৈরি হচ্ছে।
আইফোন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আগে মানুষের মনোযোগ এতটা বিঘ্নিত হতো না। তখন ফেসবুকের ধারণাও কারও মাথায় ছিল না। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে সময় কাটানো তখন এত প্রচলিত ছিল না। মানুষ ডিসপ্লেতে মুখ গুঁজে ঘুরে বেড়াত না। কোনো কাজ করতে হলে তখন আসল পরিশ্রম করতে হতো।
আমি ইলেকট্রিক টাইপরাইটারে টাচ টাইপিং শিখেছিলাম। আমার একটি ‘ব্রাদার’ টাইপরাইটারও ছিল। তবে বেশিরভাগ সময় আমি পিসি এবং ওয়ার্ড প্রসেসর সফটওয়্যার ব্যবহার করতাম। শুরুতে আমার পরিবারের ২৮৬ পিসিতে এমএস-ডসে ওয়ার্ডপারফেক্ট ৫.১ চলত। পরে বাবার অফিস থেকে কেনা আইবিএম পিএস/২ ৩৮৬এসএক্স সিস্টেমেও সেটি ব্যবহার করেছি। সেই একক কাজের দিনগুলোতে ওয়ার্ডপারফেক্ট চালু করলে শুধু সেটিই করা যেত। আবার কোনো গেম চালু করলে কেবল সেটিই খেলা হতো।

পরে উইন্ডোজে মাইক্রোসফট অফিস ব্যবহার শুরু করি। তবে ডায়াল-আপ ইন্টারনেট থাকায় প্রলোভন কম ছিল। সবসময় অনলাইনে থাকার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট আসার পর বিভিন্ন নোটিফিকেশনে ভুগতে হতো। তবুও তখন সারাদিন কম্পিউটারে বসে থাকা হতো না।
বিনোদনের ক্ষেত্রে তখন একটি যন্ত্র একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্যই ছিল। হাইফাই সেটে গান শোনা কিংবা ওয়াকম্যানে মিউজিক শোনা ছিল বাধাহীন। ল্যান্ডলাইন ফোন থাকলেও সাধারণত সেটি শোনার দূরত্বে থাকা হতো না। তাই শান্তভাবে বই পড়া কিংবা ছবি আঁকা সহজ ছিল। গেম কনসোলগুলোও তখন অফলাইন ছিল। সোফায় বসে স্প্লিট-স্ক্রিনে গেম খেলাই ছিল তখনকার বড় অভিজ্ঞতা। নব্বইয়ের দশকেও অনেকের ইমেইল ছিল। তবে সপ্তাহে একবার চেক করলেই চলত। যারা খুব বেশি প্রযুক্তিপ্রিয় ছিলেন, তারা হয়তো দিনে কয়েকবার চেক করতেন।
সবকিছু ডিভাইসের অভিশাপের বড় কারণ হলো এগুলোর রিমোট সার্ভিসের সাথে যুক্ত থাকা। কল্পনা করুন আপনার স্মার্টফোন বা পিসিতে ইন্টারনেট নেই। এমন অবস্থায় অনেকের মধ্যেই তাৎক্ষণিক উদ্বেগ শুরু হয়ে যায়। কারণ প্রায় সবকিছুই কোনো না কোনো অনলাইন সার্ভিসের ওপর নির্ভরশীল। অথবা এগুলো রিমোট সার্ভারে ডেটা রেখে কাজ করে।
এসব থেকে বের হওয়া বেশ কঠিন। এক ডজন সোশ্যাল মিডিয়া সার্ভিসে যুক্ত থাকা এখন সামাজিক চাপের অংশ। প্রতিটি সার্ভিস নিয়মিত নোটিফিকেশন দিয়ে আপনাকে ব্যস্ত রাখতে চায়। এরপর আছে বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা। একবিংশ শতাব্দীতে অনলাইন সার্ভিসের মূল মডেলই হলো বিজ্ঞাপন। এগুলো আপনার কাজে বারবার বাধা দেয়।
এখানে ‘ক্রনিকলি অনলাইন’ শব্দটি বেশ উপযুক্ত মনে হয়। মানুষ এখন নতুন নোটিফিকেশনের জন্য স্মার্টফোন চেক করতেই থাকে। বাস্তব জগতের বদলে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কী হচ্ছে তা নিয়ে ব্যস্ত। আরও খারাপ বিষয় হলো সবকিছু এখন সরাসরি ক্লাউডে চলে যায়। সেখান থেকে প্রতিটি কন্টেন্ট শেয়ার করার জন্য আপনাকে প্ররোচিত করা হয়। নাহলে আপনার মনে হয় যে আপনি দারুণ কোনো অভিজ্ঞতা মিস করছেন।
সবসময় অনলাইন থাকার মূল সমস্যা হলো আপনি নিজের চিন্তায় একা থাকতে পারেন না। সবকিছু আপনার মনোযোগের একটি অংশ চায়। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো আপনার শেষ মনোযোগটুকুও শুষে নেওয়ার জন্য তৈরি। তারা আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার সুযোগ নেয়। এটি মূলত মানুষের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয় বা FOMO-কে কাজে লাগায়।
২০২১ সালে একটি গবেষণায় সোশ্যাল মিডিয়ার এই প্রভাব খুঁজে দেখা হয়। সেখানে দেখা যায় যে ‘ফোমো’ একটি বড় কারণ। আমরা সামাজিক প্রাণী হিসেবে গ্রুপের বাইরে থাকতে চাই না। এছাড়া কঠিন বা অপছন্দের কাজের বদলে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপে ঢুঁ মারলে মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হয়। যদিও এতে প্রয়োজনীয় কাজটি আর সম্পন্ন হয় না।
এখানে বাস্তব সংযোগের অভাব পূরণ করতে অনলাইন জগত একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার পরিবেশ মানসিকভাবে বেশ বিষাক্ত। এই অনলাইন জায়গাগুলো একটি মিথ্যা একাত্মতার অনুভূতি দেয়। আর এগুলো আমাদের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
ক্রনিকলি অনলাইন জীবনযাত্রার সাথে অনেক অস্বাস্থ্যকর আচরণ জড়িত। এটি এখন স্বতঃসিদ্ধ সত্য। ‘সবকিছু ডিভাইস’ বা স্মার্টফোনের এই বিস্তার কর্পোরেট দয়ার কারণে ঘটেনি। বরং এটি আমাদের সাবস্ক্রিপশন সার্ভিসের ফাঁদে ফেলার একটি কৌশল। এই ডিভাইসগুলো আমাদের মনোযোগ এবং ফোকাস শুষে নেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।

মানুষ এখন এই সামাজিক কারসাজি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে ভাবছেন ভবিষ্যতের প্রযুক্তির এই পথে ঠিক কী ভুল ছিল। প্রশ্ন হলো আমাদের ঠিক কতটা পেছনে ফিরতে হবে। এর নানা রকম সমাধান দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে চরম পন্থা হলো ‘ডিজিটাল ডিটক্স’। কিছুদিনের জন্য সব প্রযুক্তি সরিয়ে রাখলে মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
অনেকের কাছে স্মার্টফোন ছেড়ে ফিচার ফোনে ফিরে যাওয়ার আবেদন আছে। আমিও স্মার্টফোন ছেড়ে একটি ফিচার ফোনে চলে এসেছি। এটি বেশ ইউজার-ফ্রেন্ডলি এবং ফোনের বাইরে এতে বেশি কিছু নেই। এর ছবিগুলোও ইন্টারনাল মেমোরিতে সেভ হয়। ক্লাউড স্টোরেজের কোনো ঝামেলা এখানে নেই।
কম্পিউটারে বসে থাকলে প্রলোভন থেকে বের হওয়া কঠিন। এখানে দুটি উপায় আছে। হয় নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ শক্তি বাড়াতে হবে, নয়তো জিরো-ডিসট্রাকশন ডিভাইস ব্যবহার করতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য পোমোডোরো টেকনিক কাজে লাগানো যেতে পারে। এজন্য ফিজিক্যাল টাইমার ব্যবহার করা ভালো।
এমএস-ডস ভার্সনে ওয়ার্ডপারফেক্ট ৫.১ ব্যবহার করে লেখালেখি করা বেশ কার্যকর। সেখানে কোনো নেটওয়ার্কিং নেই বলে আপনি বিক্ষিপ্ত হবেন না। এটি ফ্রি সফটওয়্যারেও করা সম্ভব। ডিজিটাল টাইপরাইটারের পথও বেছে নেওয়া যেতে পারে। বাজারে অনেক কমার্শিয়াল অপশন আছে। আবার চাইলে কেউ নিজের মতো মিনিমালিস্টিক রাইটার ডেক বানিয়ে নিতে পারেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে পুরনো কিবোর্ডের শব্দের সাথে শান্ত নীল পটভূমিতে লেখালেখি পছন্দ করি। তবে সবার পছন্দ এক রকম নয়। ‘সবকিছু ডিভাইস’ থেকে বের হওয়ার একটি বড় সুবিধা হলো আপনি নিজের জন্য সেরা মাধ্যমটি খুঁজে নিতে পারেন।
চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ
চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?
টেলিফোনের আবিষ্কার নিয়ে ১৫০ বছরের বিতর্ক। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নাকি এলিশা গ্রে? এক ঐতিহাসিক রহস্যের অনুসন্ধান।
সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্রাজ্য কি টিকবে? ইতিহাস বলে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনই ধ্বংসের বীজ বপে।