skip to content
গুলবাহার
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?

·

• ৫ মিনিট

টেলিফোনের আবিষ্কার মানব ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল। গত ১৫০ বছর ধরে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলকে এককভাবে এর আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কখনোই সরল রেখায় চলে না। এই ক্ষেত্রেও ছিল পেটেন্ট জয়ের এক তীব্র প্রতিযোগিতা। সময় নিয়ে জটিলতা ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সব মিলিয়ে এই আবিষ্কারের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হয়তো এই আবিষ্কারের প্রকৃত দাবিদার ছিলেন এলিশা গ্রে নামের এক ব্যক্তি।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ও বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পেটেন্ট

১৮৭৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসির মার্কিন পেটেন্ট অফিসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি জমা পড়েছিল। একটি ছিল আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আইনজীবীর দাখিল করা পেটেন্ট আবেদন। অন্যটি ছিল এলিশা গ্রের আইনজীবীর দাখিল করা ক্যাভিয়েট বা উদ্দেশ্যের বিবৃতি। দুটি নথিতেই টেলিফোন আবিষ্কারের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আইনজীবীর দাখিল করা পেটেন্ট আবেদন
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের আইনজীবীর দাখিল করা পেটেন্ট আবেদন

জনপ্রিয় বিশ্বাস অনুযায়ী বেল কেবলমাত্র তাঁর আইনজীবী আগে অফিসে পৌঁছানোর কারণেই টেলিফোনের অধিকার দাবি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই বিশ্বাসটি একটি ভুল ধারণা থেকে জন্মেছিল। বেলের আইনজীবী আসলে প্রথমে আসেননি। এমনকি তিনি প্রথমে এলেও তা কোনো পার্থক্য তৈরি করত না। তখনকার ব্যবস্থাটি “প্রথমে আবিষ্কার করা” নীতির ওপর ভিত্তি করে চলত। সেখানে “প্রথমে জমা দেওয়া” বিষয়টি মুখ্য ছিল না।

গ্রের মতে তাঁর ক্যাভিয়েট বেলের আবেদনের আগেই জমা পড়েছিল। ফলে সেটি নথিপত্রের স্তূপের নিচের দিকে থাকার কথা। অন্যদিকে বেলের আইনজীবী তাঁর রসিদ তাৎক্ষণিকভাবে জমা করার অনুরোধ করেছিলেন। তাই পেটেন্ট পরীক্ষক জেনাস উইলবারের সামনে কোন ক্রমে নথিগুলো এসেছিল তা নিশ্চিত নয়। উইলবার শপথ নিয়ে দাবি করেছিলেন তিনি বেলের রসিদ গ্রের আগে পেয়েছিলেন। তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি এই বিষয়ে আর কোনো তদন্ত করেননি। তবে সময় নিয়ে এই সমস্যাটিই আসল কেলেঙ্কারি ছিল না।

ভেরিয়েবল রেজিস্ট্যান্স এবং লিকুইড ট্রান্সমিটার

গ্রের ক্যাভিয়েটে একটি লিকুইড ট্রান্সমিটারের ডায়াগ্রাম ছিল। এই যন্ত্রে একটি ছোট তার অ্যাকোস্টিক মেমব্রেনের সাথে যুক্ত থাকে। তারের এক প্রান্ত পানিতে থাকলে শব্দ তরঙ্গের প্রভাবে এটি ভেরিয়েবল রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে। এর ফলে একটি ঢেউয়ের মতো বিদ্যুৎ প্রবাহ হয়। এতে রিসিভার মূল শব্দটি অনেক বেশি নির্ভুলভাবে পুনরুৎপাদন করতে পারে।

এলিশা গ্রের ক্যাভিয়েট
এলিশা গ্রের ক্যাভিয়েট

বলা হয়ে থাকে বেলের নকশায় শুরুতে এই উন্নতি ছিল না। বেল অবৈধভাবে গ্রের ক্যাভিয়েট দেখার পর তাঁর পেটেন্টে একটি নতুন অংশ সংযোজন করেছিলেন। বেলের আবিষ্কার পরের মাসে সন্দেহজনকভাবে এই ধরনের শব্দ প্রেরণের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করে। এটি তাঁর আগের “হারমোনিক টেলিগ্রাফ” ধারণার বদলে নেওয়া হয়েছিল। ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ বেল প্রথম কার্যকরী টেলিফোন প্রদর্শন করেন। তিনি রিসিভারে সেই বিখ্যাত বাক্যটি উচ্চারণ করেছিলেন, “মিস্টার ওয়াটসন, এখানে আসুন। আমি আপনাকে দেখতে চাই।” যদিও সন্দেহ ছিল তবুও বেল ও গ্রে জুন মাসে দেখা করেন। তাঁরা আইনি বিষয়গুলো পেছনে ফেলে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পেশাদার সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

দুর্নীতি এবং জেনাস উইলবারের স্বীকারোক্তি

সেথ শুলম্যানের ‘দ্য টেলিফোন গ্যাম্বিট’ বইতে এই ঘটনাগুলো বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয় জেনাস উইলবার ছিলেন একজন মদ্যপ ব্যক্তি। তিনি বেলের আইনজীবী মারসেলাস বেইলির কাছে ঋণী ছিলেন। এটি পেটেন্ট অফিসের বিধিবহির্ভূত একটি বিষয় ছিল। বেইলিকে ঋণ শোধ করতে উইলবার তাঁকে গ্রের ক্যাভিয়েট দেখিয়েছিলেন।

বেইলি প্রথমে ধরে নিয়েছিলেন গ্রে একটি হারমোনিক টেলিগ্রাফের নকশা জমা দিয়েছেন। কিন্তু যখন তিনি দেখলেন গ্রে টেলিফোনের জন্য ক্যাভিয়েট জমা দিয়েছেন তখন তিনি বস্টনে থাকা বেলের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি বেলকে তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াশিংটন ডিসিতে আসার পরামর্শ দেন। বেল আসার পর উইলবার তাঁকে পেটেন্ট দেখান। বেল তাঁকে বিনিময়ে ১০০ ডলার দেন। এরপর বেল তাঁর পেটেন্টে কণ্ঠস্বর বা অন্যান্য শব্দ প্রেরণের পদ্ধতি সংযোজন করেন। কয়েকদিন পর বেল তাঁর খাতায় একটি ডায়াগ্রাম আঁকেন। এটি গ্রের আবেদনে আঁকা ডায়াগ্রামের সাথে অনেকটাই মিল ছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন গৃহীত হয় এবং গ্রের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

ছয়শত মামলা এবং সুপ্রিম কোর্টের রায়

১৮৭৭ সালে বেল গার্ডিনার হাবার্ড এবং থমাস স্যান্ডার্সের সাথে মিলে বেল টেলিফোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। কোম্পানির আর্থিক সাফল্যের মূলে ছিল আইনি লড়াই করার আক্রমণাত্মক কৌশল। প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই দশকে কোম্পানি প্রায় ৬০০টি পেটেন্ট মামলা লড়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল।

১৮৭৮ সালে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন এলিশা গ্রে এবং থমাস এডিসনকে নিয়োগ দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বেল টেলিফোন কোম্পানিকে চ্যালেঞ্জ করা। বেল কোম্পানির কাছে টেলিফোনের পেটেন্ট থাকলেও ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের কাছে কিছু উন্নত যন্ত্রাংশ ছিল। তারা দাবি করেছিল বেলের টেলিফোন পেটেন্ট আসলে একটি প্রতারণার ঘটনা। এরপর বেল টেলিফোন কোম্পানি পেটেন্ট লঙ্ঘনের মামলা করে। ১৮৭৯ সালের ১০ নভেম্বর আদালত তাদের পক্ষেই রায় দেয়।

১৮৮৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানায় বেলের পেটেন্টের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ড্যানিয়েল ড্রবর পূর্ববর্তী টেলিফোন আবিষ্কারের দাবিও অপ্রমাণিত থেকে যায়। কয়েক বছর পর সরকার পেটেন্ট বাতিলের মামলা করে। কিন্তু সেই মামলা দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাতে বাধাগ্রস্ত হয়। ১৮৯৭ সালে শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়।

তবে ব্যবসায়িক ও আইনি দিক থেকে কোম্পানির এই আক্রমণাত্মক খ্যাতির দায় বেলের ওপর বর্তায় না। তিনি নিজেকে ব্যবসা পরিচালনা থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসায় মাত্র দশটি শেয়ার রেখেছিলেন। বাকি শেয়ারগুলো তিনি তাঁর স্ত্রী মেবেলকে দিয়েছিলেন। মেবেল ছিলেন গার্ডিনার হাবার্ডের মেয়ে। বেল তাঁকে ১৮৭৭ সালের ১১ জুলাই বিয়ে করেছিলেন। এই পরিস্থিতি বেলের মনে তিক্ততা তৈরি করেছিল। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী পেশায় অর্থাৎ বধিরদের নিয়ে কাজে ফিরে যান। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আর কখনো টেলিফোন ব্যবসায় ফিরবেন না।

একটি ধারণার ১৫০ বছরের ঐতিহ্য

আধুনিক ব্যাখ্যায় বেলের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আইনি ছিল না এমন ধারণাই প্রাধান্য পায়। এলিশা গ্রের দাবিগুলো গণমাধ্যমে আজও বেশ জনপ্রিয়। জনগণ সবসময়ই উপেক্ষিত মানুষের গল্পে বিশেষ আবেগ অনুভব করে। তবে বিতর্কটি একপেশে নয়। বেলেরও অনেক সমর্থক আছেন।

মারকুইট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. বেঞ্জামিন ব্রাউন মনে করেন তাঁর গবেষণা সমগ্র বিতর্ক নিষ্পত্তি করে। প্রমাণ দেখায় বেল গ্রের আগেই টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন। বেলের বাগদত্তা মেবেলের ১৮৭৬ সালের একটি চিঠিতে বলা হয়েছে বেল তাঁর পেটেন্ট আবেদনে লিকুইড ট্রান্সমিটার যোগ করেছিলেন।

তাছাড়া গ্রের আইনজীবীদের দাবির সপক্ষে প্রমাণের অভাব রয়েছে। তাঁরা দাবি করেছিলেন ১৮৭৬ সালের ২৬ জানুয়ারি তথ্য বেলের সহযোগী জর্জ ব্রাউনের কাছে পৌঁছেছিল। ব্রাউন ছিলেন টরন্টো গ্লোবের প্রকাশক। তাঁর নোটে ওই দিন গ্রের টেলিফোন সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়ার উল্লেখ নেই। এটি গ্রের সময়গত অগ্রাধিকারের ধারণাকে খণ্ডন করে। তাছাড়া জেনাস উইলবারের দাবিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তিনি একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক কয়েকটি হলফনামা দাখিল করেছিলেন। কোনোটিতেই বলা হয়নি যে বেলের পেটেন্ট আবেদন জমা দেওয়ার পর পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাই ড. বেঞ্জামিন ব্রাউন উপসংহারে বলেন কোনো অপকর্মের ঘটনা ঘটেনি।

বেলের আবিষ্কারের কোনো উপাদান অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছিল কি না তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে। তবে তাঁর আবিষ্কারের বিপ্লবী গুণকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে কিছু প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত থেকে যায়। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল কি একজন দূরদর্শী উদ্ভাবক ছিলেন? তিনি কি সব ধারণা আইনিভাবে একীভূত করেছিলেন? নাকি তিনি একজন কূটকৌশলী হিসেবে আইনের ফাঁক গলে সম্মান ও লভ্যাংশ লুটেছিলেন?

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. সাম্রাজ্যের পতন অবশ্যম্ভাবী

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাম্রাজ্য কি টিকবে? ইতিহাস বলে, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনই ধ্বংসের বীজ বপে।

    কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাপ্রযুক্তিইতিহাস
  2. বিদ্যুৎহীন যুগে মানুষ কীভাবে বরফ তৈরি করত?

    আধুনিক রেফ্রিজারেটরের আগে ৪০০ বছর খ্রিস্টপূর্বে পারস্যরা কীভাবে প্রকৃতির বিপরীতে বরফ তৈরি করত, জানুন ইয়াখচালের বিস্ময়কর কৌশল।

    ইতিহাসপ্রযুক্তিপারস্য সভ্যতা
  3. ক্রিকেটের ইতিহাস

    ফুটবলের পর ক্রিকেটই বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা। ২৫০ কোটি অনুসারী নিয়ে এই খেলার উৎপত্তি থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইতিহাস জানুন।

    ক্রিকেটখেলাধুলাইতিহাস