skip to content
গুলবাহার
কীভাবে হয়ে উঠবেন আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত

কীভাবে হয়ে উঠবেন আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত

·

• ৬ মিনিট

আকর্ষণীয় মানুষেরা কখনোই নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করেন না।

তারা যা ভাবেন তা-ই বলেন, যা পছন্দ করেন তা-ই পরেন-সেটা যতই অদ্ভুত হোক না কেন। শখগুলো তাদের সত্যিকার অর্থেই টানে, সেগুলো ‘কুল’ বা ট্রেন্ডি কি না, তা ভেবে তারা কিছু করেন না। আর যারা সবচেয়ে বিরক্তিকর, তারা নিজেদের আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে যান-বইয়ের তালিকা সতর্কতার সাথে বাছাই করেন, নিজেদের মতামতকে এমনভাবে সাজান যেন তা নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু খুব বেশি বিতর্ক না ছড়ায়।

তাদের এই মরিয়া চেষ্টাটা বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। আর এই চেষ্টার কারণেই তাদের খুব সহজেই ভুলে যাওয়া যায়।

আমি বিশ্বাস করি-বিরক্তিকর হওয়ার মানে হলো নিজের ব্যক্তিত্বকে এতটাই কাটছাঁট করা যে শেষ পর্যন্ত নিজস্বতা বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আমরা অনেকেই শিখে নিই কীভাবে নিজেদের অদ্ভুত দিকগুলোকে ঘষেমেজে মসৃণ করে ফেলতে হয়। যা অন্য কাউকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে বা যার কারণে অন্যরা আমাদের বদমেজাজি বা রূঢ় ভাবতে পারে, সেসব আমরা আগেই লুকিয়ে ফেলি।

ফলাফল = চূড়ান্ত বিরক্তি।

আপনি নিজেকেই কাটছাঁট করছেন

১৯৫৯ সালে আরভিং গফম্যান লিখেছিলেন, প্রেক্ষাপটভেদে আমরা সবাই মানুষের সামনে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন রূপ উপস্থাপন করি। কিন্তু যখন এই অভিনয়টাই আমাদের একমাত্র রূপ হয়ে দাঁড়ায়, তখনই শুরু হয় কৃত্রিমতা। এতদিন ধরে নিজেকে কাটছাঁট করতে করতে একটা পর্যায়ে আপনি নিজেই ভুলে যান যে আপনার আসল রূপটা আসলে কেমন ছিল।

এই ব্যাপারটা ঘটে খুব ধীরগতিতে। স্কুলে পড়ার সময় আপনি হয়তো শিখেছেন কোন জিনিস নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখানোটা লজ্জার। কলেজে উঠে জেনেছেন আপনার বন্ধু মহলে ঠিক কোন ধরনের মতামতগুলো গ্রহণযোগ্য। এরপর নিজের ব্যক্তিত্বকে আরও পরিশীলিত করেছেন। আর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আপনি ‘পরিস্থিতি বুঝতে’ এবং সেই অনুযায়ী নিজেকে মানিয়ে নিতে এতটাই দক্ষ হয়ে ওঠেন যে, আপনি বুঝতেই পারেন না যে আপনি ক্রমাগত অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনি নিজের এই কৃত্রিমতাকেই স্বয়ংক্রিয় অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন।

এই পুরো প্রক্রিয়াটাকে আপাতদৃষ্টিতে পরিপক্বতা বা ম্যাচিউরিটি মনে হতে পারে। অন্তত আমরা পরিপক্বতা বলতে যা বুঝি, সেটার সাথে মিলে যায়। মনে হয় যেন এটাই বড় হওয়া বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষণ। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো তা-ই। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝতে পারা আর নিজেকে পুরোপুরি মুছে ফেলে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পরিস্থিতি বুঝতে পারাটা হলো সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, আর নিজেকে মুছে ফেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।

অতিরিক্ত কাটছাঁট করা বা মেকি কোনো মানুষের সাথে কথা বলার সময় আমি সবসময়ই তা বুঝতে পারি। তাঁদের নিজস্ব মতামত থাকে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো সন্দেহজনকভাবে সুনিপুণ। তাঁদের বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ থাকে, কিন্তু সেগুলো খুবই পরিশীলিত ও গ্রহণযোগ্য মাত্রার। তাঁরা কখনোই এমন কিছু বলেন না, যা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে বা অবাক করে দেয়। তাঁরা ঠিক এমন একটা সিনেমার মতো, যাকে সবার মন রক্ষা করতে গিয়ে গড়পরতা বা মাঝারি মানের বানিয়ে ফেলা হয়েছে-নির্মাণশৈলীর দিক থেকে নিখুঁত, কিন্তু সহজেই ভুলে যাওয়ার মতো।

আপনার লজ্জার তালিকা

লজ্জায় পড়ে যেসব কথা বলা বা স্বীকার করা বন্ধ করে দিয়েছেন, সেগুলোর একটা তালিকা করুন। সেই মিউজিক ব্যান্ডের কথা ভাবুন, যাকে আপনি তত দিন ভালোবেসেছেন, যত দিন না কেউ সেটা নিয়ে উপহাস করেছে। সেই শখের কথা ভাবুন, যেটা আপনি ছেড়ে দিয়েছেন শুধু এটা ভেবে যে তা যথেষ্ট মানানসই বা আধুনিক নয়। সেই মতামতের কথা ভাবুন, যা প্রকাশ করা আপনি বন্ধ করে দিয়েছেন কারণ লোকেরা আপনার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাত।

অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই এই লজ্জার তালিকাটা আশ্চর্যজনকভাবে অনেক দীর্ঘ হয়। আর মজার ব্যাপার হলো, এই তালিকার বেশিরভাগ জিনিসই আসলে কোনো অর্থেই লজ্জাজনক নয়। এগুলো স্রেফ এমন কিছু বিষয়, যা সমাজের সামনে আপনার ধরে রাখা ভাবমূর্তির সাথে মানানসই ছিল না।

আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে মানুষকে বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম যে আমি ‘পপ পাঙ্ক’ মিউজিক ভালোবাসি। ভালোবাসাটা বন্ধ করিনি ঠিকই, কিন্তু আমি শিখে গিয়েছিলাম যে ‘পপ পাঙ্ক’ পছন্দ করাটা এক ধরনের লজ্জার ব্যাপার। আর আমি নিজেকে সবার সামনে ‘কুল’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম, অন্তত যেন অনাধুনিক বা সেকেলে মনে না হয়। আমি যাঁদের চিনি, তাঁদের প্রায় সবারই এমন কিছু না কিছু গল্প আছে-এমন কোনো প্রকৃত আগ্রহ বা উৎসাহ, যা তাঁরা স্রেফ পরিবেশের সাথে মানানসই নয় বলে মনের ভেতরেই চাপা দিয়ে রেখেছেন।

আপনার এই লজ্জার তালিকায় যা যা আছে, সম্ভবত সেগুলোই আপনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। এগুলো আপনার ব্যক্তিত্বের সেই অংশ, যা অবিরাম কাটছাঁট করার পরও টিকে আছে। এগুলো নিয়ে আপনি আজও যা কিছু অনুভব করেন, তা যদি লজ্জাও হয়, তার মানে হলো-এগুলো আপনার ভেতরে এখনো কোথাও না কোথাও জীবন্ত।

সেই সত্তাকে ফিরিয়ে আনুন

আপনার ভেতরের অদ্ভুত দিকগুলো আসলে ততটাও অদ্ভুত নয়, যতটা আপনি ভাবেন। বরং এগুলো এমন এক ধরনের বিশেষত্ব, যা আপনাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা এবং স্মরণীয় করে তোলে। যে মানুষটি প্রতিযোগিতামূলক ধাঁধা সমাধানে বা পাখি পর্যবেক্ষণে সত্যিই আগ্রহী, তিনি মানুষকে তাঁকে মনে রাখার মতো কোনো না কোনো কারণ দেন। আর যে মানুষটি আর দশজনের মতো কেবল গ্রহণযোগ্য পাঁচটা বিষয়ে ভাসা-ভাসা জ্ঞান রাখেন, তিনি মানুষকে মনে রাখার মতো কিছুই দিতে পারেন না।

নিজের আসল সত্তাকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াটা খুবই সহজ। সেই কথাগুলো বলা শুরু করুন, যেগুলো আপনি সাধারণত বাদ দিয়ে যেতেন বা এড়িয়ে যেতেন। সেই লজ্জাজনক আগ্রহগুলোর কথা মন খুলে প্রকাশ করুন। সেই মতামতটা দিন, যা হয়তো সবার ভালো লাগবে না। শুরুতে কম ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোতে এই চর্চা করুন-ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে বা এমন অপরিচিত মানুষদের সাথে, যাঁদের সাথে আপনার আর কখনোই দেখা হবে না। খেয়াল করে দেখুন, এতে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে না! লক্ষ্য করুন, আপনার এই কাটছাঁটহীন আসল রূপটিকে কিছু মানুষ অন্তত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে, যদিও অন্যরা তা না-ও করতে পারে।

যারা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়, তারা আসলে আপনার কাছের মানুষ হওয়ার যোগ্য নয়। নিজের আসল রূপ প্রকাশ করার সবচেয়ে বড় সুবিধা এটাই-এটি আপনার সামাজিক জগৎকে ছেঁকে পরিষ্কার করে দেয়। আপনি নিজের আসল সত্তাকে যত বেশি লুকিয়ে রাখবেন, আপনি ঠিক তত বেশি এমন মানুষদেরই আকর্ষণ করবেন, যারা আপনার ওই মেকি ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করে। আর এর মানে হলো, বন্ধুদের মাঝে থেকেও আপনি এক ধরনের গভীর একাকীত্ব অনুভব করবেন।

দ্বিমত তৈরি করতে ভয় পাবেন না

সবচেয়ে স্মরণীয় মানুষেরা মানুষের মাঝে দ্বিমত বা মেরুকরণ তৈরি করেন। কেউ কেউ তাঁদের প্রচণ্ড ভালোবাসেন, আবার কেউ কেউ তাঁদের একদমই সহ্য করতে পারেন না। আসল ব্যক্তিত্ব থাকলে বাইরে থেকে বিষয়টা এমনই দেখায়। যদি সবাই আপনার প্রতি হালকা বা গড়পরতা ইতিবাচক মনোভাব দেখায়, তাহলে বুঝতে হবে আপনি সম্ভবত নিজেকে ঘষেমেজে এমন এক মসৃণ রূপ দিয়েছেন-যা স্রেফ মানুষের চাওয়া অনুযায়ী সতর্কতার সাথে তৈরি করা একটি গড়পরতা রূপ মাত্র।

ক্রিস্টোফার হিচেন্সকে নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিমত ছিল। জুলিয়া চাইল্ডকে নিয়েও ছিল। এমনকি আপনি স্মরণ করতে পারেন এমন যে কাউকেই নিয়ে দ্বিমত থাকে। তবে কেবল বিতর্ক সৃষ্টির জন্যই বিতর্ক সৃষ্টি করাটাও এক ধরনের অভিনয়; আসল কথা হলো-নিজের এমন কোনো অংশকে আগেই লুকিয়ে না ফেলা, যা অন্যদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

কিছু মানুষ আপনাকে অপছন্দ করবে। সেই অধিকার তাদের রয়েছে। স্মরণীয় হয়ে থাকার এটাই একমাত্র মূল্য।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. বুদ্ধিমত্তা কেন প্রজ্ঞার খারাপ বিকল্প

    বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী লাইনাস পলিং পর্যন্ত অনেক বুদ্ধিমান মানুষই কেন ভয়ংকর ভুল করেন, তার একটি বিশ্লেষণ।

    মনোবিজ্ঞানবুদ্ধিমত্তাজীবনদর্শন
  2. ৮০ বছর বয়সী আপনি

    বৃদ্ধ বয়সে ফিরে তাকালে যুবকেরা কী হারাচ্ছেন তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা। সময়ের মূল্য ও অনুশোচনা নিয়ে একটি চিন্তা-পরীক্ষা।

    মনোবিজ্ঞানজীবনদর্শনবয়সজনিত পরিবর্তন
  3. ঠুনকো আকাঙ্ক্ষার ফাঁদে

    আধুনিক জীবনের কৃত্রিম প্রাপ্তি এবং গভীর জীবনবোধের তৃপ্তি ফিরে পাওয়ার উপায় নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ

    জীবনধারামনোবিজ্ঞানপ্রযুক্তি