skip to content
গুলবাহার
দুই বাক্যের ডায়েরি

দুই বাক্যের ডায়েরি: জীবন লেখার সহজ পদ্ধতি

·

• ৫ মিনিট

ডায়েরি লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা কতটা কঠিন, তা হয়তো অনেকেই জানেন। শুরুতে উৎসাহ থাকলেও কিছুদিন পরেই নিয়মিত লেখা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর মনে হয়। একপর্যায়ে পুরো অভ্যাসটিই ছেড়ে দিতে হয়। সমস্যাটি আসলে উৎসাহের অভাব নয়, বরং লেখার পরিধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া।

কেউ কেউ ডায়েরিতে প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি খুঁটিনাটি ও প্রতিটি চিন্তার কথা লিখে রাখতে চান। কিন্তু এভাবে লিখতে গেলে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যায়। একসময় এটি বোঝা মনে হতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত লেখাই বন্ধ হয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতি এড়াতে কিছুদিন ধরে ডায়েরি লেখার একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা খুঁজছিলাম। কিন্তু বুলেট জার্নালের মতো সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিগুলো তেমন মনঃপূত হয়নি। সেগুলোকে অনেকটা দৈনিক পরিকল্পনা বা করণীয় তালিকার মতো মনে হয়। যা পরে পড়তে খুব একটা আনন্দ পাওয়া যায় না। ডায়েরি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে সেগুলো পড়ে স্মৃতিচারণ করা। তাই এমন একটি পদ্ধতি দরকার ছিল, যা লেখা সহজ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও পড়তে আনন্দদায়ক হবে।

সমাধানের সন্ধানে

সমাধানটি মিলেছে একটি অপ্রত্যাশিত জায়গায়। এটি টিম হাচিংসের “Thousand Year Old Vampire” নামের একটি সোলো রোল-প্লেয়িং গেম (Solo Role-playing Game)। এই খেলায় একজন ভ্যাম্পায়ারের দীর্ঘ জীবনের ইতিহাস লিখতে হয়। খেলার একটি বিশেষ নিয়ম হলো, ভ্যাম্পায়ারের পাঁচটি “স্মৃতি” থাকে এবং প্রতিটি স্মৃতিতে তিনটি “অভিজ্ঞতা” লেখার জায়গা বরাদ্দ থাকে।

অভিজ্ঞতাগুলো একটি করে বাক্যে লিখতে হয়। যেখানে ঘটনার বর্ণনা এবং তার গুরুত্ব, উভয়ই থাকে। একটি উদাহরণ:

“নির্জন বছরগুলোতে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়িয়েছি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে খ্রিস্টান নাইটদের সারাসেনদের তলোয়ারে নিঃশেষ হতে দেখেছি; চার্লসও তাদের মধ্যে একজন ছিল, এটি নিশ্চিত—জ্বলন্ত বালুর নিচে ঘুমাতে যাওয়ার সময় আমি তার স্পর্শের স্বপ্ন দেখি।”

এই বিষয়টি একটি নতুন ভাবনার জন্ম দিল। বাস্তব জীবনের ডায়েরিও যদি এভাবে লেখা যায়? প্রতিদিনের ঘটনা “[বর্ণনা] + [ফলাফল]” এই কাঠামোতে মাত্র এক বা দুই বাক্যে লেখা যেতে পারে। দুই বাক্যের এই নির্দিষ্ট সীমা লেখার প্রক্রিয়াকে ক্লান্তিকর করে না। বরং এটি ডায়েরি সংক্ষিপ্ত রাখার মূল উদ্দেশ্যটি বজায় রাখে।

দুই বাক্যের ডায়েরির সুবিধা

এই পদ্ধতি অনুসরণ করে কিছুদিন লেখার পর দারুণ ফল পাওয়া গেছে। এখন প্রতিদিন লেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি শুধু মজাদারই নয়, বরং বেশ কিছু অতিরিক্ত সুবিধাও এনে দিয়েছে:

  • সহজ শুরু: বড় কাজগুলো শুরু করা কঠিন মনে হয়। সেগুলোর জন্য দীর্ঘ সময় বা বিশেষ মনোযোগের দরকার হয়। কিন্তু দুই বাক্য লেখার জন্য সারাদিনে সহজেই সময় বের করা যায়। এটি একটি এসএমএস বা সামাজিক মাধ্যমের ছোট পোস্ট লেখার মতোই সহজ।
  • চিন্তাশীল ও ধ্যানমগ্ন: দুই বাক্যের সীমা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা আকর্ষণীয় ঘটনা বেছে নিতে বাধ্য করে। এটি অনেকটা ধাঁধা মেলানোর মতো মজাদার। দিনের ঘটনাগুলোর মধ্য থেকে সেরা অংশটি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিই আত্ম-উপলব্ধির দারুণ এক অনুশীলন। লেখার পর সেই ঘটনাগুলোর প্রতি একধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ তৈরি হয়।
  • কোনো দিন বৃথা যায় না: নিয়মিত এই অনুশীলন করা ভালো। এমনকি সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোও জীবনের খাতায় কিছু না কিছু যোগ করে। দুই বাক্যের ফরম্যাট এই নীতি কাজে লাগানো সহজ করে তোলে। বিশেষ করে হাতে লেখা নোটবুক ব্যবহার করলে প্রতি ৪-৫ দিনেই একটি পৃষ্ঠা পূর্ণ হয়ে যায়। নিজের লেখা পাতাগুলো ধীরে ধীরে ভরে উঠতে দেখা অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক।
  • ছোট গল্পে পরিণত হয়: দীর্ঘ ডায়েরি লেখায় সাধারণত কোনো গল্পের ধারা থাকে না। কিন্তু মাত্র দুই বাক্যে দিনের বর্ণনা উপস্থাপন করলে সেখানে চমৎকার একটি বর্ণনামূলক আবহ তৈরি হয়। সম্ভবত অপ্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত বিবরণ গল্পকে দুর্বল করে দেয়। দুই বাক্যে অপ্রয়োজনীয় কথা লেখার সুযোগ থাকে না, তাই প্রতিটি লেখা সরাসরি মূল বিষয়ে চলে আসে। ফলে প্রতিটি লেখায় এক ধরনের স্বতন্ত্র গতিশীলতা দেখা যায়। যা অনেকটা ছোট গল্পের আকার ধারণ করে।

দুই বাক্যের অনুচ্ছেদের সৌন্দর্য

স্কুলে ‘তিন বাক্যের কম অনুচ্ছেদ লেখা যাবে না’—এমন একটি শিক্ষা অনেকের মধ্যেই ভুল ধারণা তৈরি করে। কিন্তু দুই বাক্যের অনুচ্ছেদ অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কাঠামো হতে পারে। চলচ্চিত্রের মন্টেজ তত্ত্বের মতো দুটি ছবি পাশাপাশি রাখলে যেমন নতুন অর্থের সৃষ্টি হয়, দুটি বাক্য একসাথে থাকলেও তা পাঠকের ওপর আকর্ষণীয় প্রভাব ফেলে।

কখনো কখনো এই দুটি বাক্য কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক ধারণ করে। কখনো তুলনা তৈরি করে এবং একটির মাধ্যমে অন্যটির অর্থ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কখনো প্রথম বাক্যকে দ্বিতীয়টি খণ্ডন করে, অথবা অপ্রত্যাশিত কোনো নাটকীয় মোড় নেয়। কখনোবা হাইকুর ‘কিরেজি’র মতো দ্ব্যর্থতাপূর্ণ আবহ তৈরি করে। যার অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝার চেষ্টাই অনুচ্ছেদটিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

নমুনা লেখা

গত সপ্তাহের কিছু নমুনা লেখা দেখলে বোঝা যাবে এই ফরম্যাট কতটা মজাদার ও চিত্তাকর্ষক হতে পারে:

“ক্লান্তিতে কোনোমতে কাজের দিনটি শেষ করলাম, যা বুঝিয়ে দেয় আমার এক সপ্তাহের ছুটি কতটা প্রয়োজন ছিল। সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হওয়ার সময় হঠাৎ বৃষ্টি নামল। স্ত্রী ও পোষা কুকুরসহ ভিজে একদম কাদামাখা হয়ে বাড়ি ফিরলাম, তবু পুরো পথ হাসতে হাসতেই এলাম।”

“সকাল থেকে আমাদের এলাকায় প্রবল বৃষ্টি হলো, পাড়ার প্রবেশপথের রাস্তা ধুয়েমুছে গেল। কাল থেকে পাশের প্লটে নির্মাণকাজ চলবে। প্রতিটি গাছ কেটে ফেলা হবে এবং ঘাসের জায়গায় কংক্রিটের নিরেট ঢালাই তৈরি করা হবে।”

“ছুটির শেষ দিনটি বসার ঘরের টেবিল পালিশ করতে কাটালাম—টেবিলটি আমার চেয়েও পুরনো, একসময় আমার বাবা-মায়ের ছিল। এটি তৃষ্ণার্তের মতো তেল শুষে নিল; কাপড় দিয়ে এর শক্ত পৃষ্ঠতল মোছার সময় মনে হলো এটি একটি জীবন্ত প্রাণী, যাকে আমি এতদিন চরম অবহেলা করেছি।”

শেষ কথা

দুই বাক্যের ডায়েরি পদ্ধতির একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা এখানেই দেওয়া হলো। যদি এই পদ্ধতিটি আপনার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়, তবে আজই চেষ্টা করে দেখতে পারেন। মাত্র দুই বাক্যে ডায়েরি লেখা সত্যিই দারুণ আনন্দের একটি ব্যাপার। আশা করি আপনিও এটি দারুণভাবে উপভোগ করবেন।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

২টি লেখা
  1. ঘুমের প্রতি আপনার ধারণাই আপনাকে সারাদিন ক্লান্ত করে তুলছে

    রাতের ঘুম কেমন হয়েছে সেটা নিয়ে আমাদের মনোভাব আসল ঘণ্টার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে মেজাজ ও সতেজতায়। জেনে নিন কীভাবে মানসিকতা বদলে শক্তি ফিরে পাবেন

    ঘুমমানসিক স্বাস্থ্যজীবনযাপন
  2. লেখার প্রথম নিয়ম

    কীভাবে লেখার শুরুতেই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবেন? ভেনিস সাম্রাজ্যের উদাহরণে জানুন কার্যকর লেখনী কৌশল।

    লেখালেখিসাহিত্যজার্নালিজম