skip to content
গুলবাহার
সোলমেট খোঁজার বিজ্ঞান

সত্যিই কি কারও জন্য একজন নির্দিষ্ট সোলমেট আছে?

• ১০ মিনিট

ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র আবহে মনে হতে পারে, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও এমন একজন মানুষ আছেন যিনি শুধু আমার জন্যই তৈরি—আমার সোলমেট, নিখুঁত সঙ্গী বা ভাগ্যনির্দিষ্ট জীবনসঙ্গী। কিন্তু এই রোমান্টিক বিশ্বাস সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলছে?

প্রাচীন গ্রিস থেকে হলিউড

মানুষ সব সময়ই বিশ্বাস করে এসেছে যে ভালোবাসা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। প্রাচীন গ্রিসে প্লেটো কল্পনা করেছিলেন, এক সময় মানুষ ছিল চার হাত-পা ও দুটি মুখযুক্ত এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা। তাদের দীপ্তি এতটাই তীব্র ছিল যে জিউস তাদের দুই ভাগ করে দেন। সেই থেকে প্রতিটি অর্ধাংশ পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার হারানো অংশটিকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। এই মিথ বা পৌরাণিক কাহিনিই আজকের ‘সোলমেট’ ধারণার কবিত্বময় ভিত্তি—যে কোথাও একজন আছেন যিনি আমাদের পূর্ণতা দেবেন।

মধ্যযুগে চারণকবি (ট্রুবাদুর) ও আর্থুরিয়ান উপাখ্যানগুলো এই আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিয়েছিল “কোর্টলি লাভ” বা রাজকীয় প্রেমে। যেমন—ল্যান্সেলটের গিনিভিয়ার প্রতি তীব্র ও নিষিদ্ধ ভালোবাসা, যেখানে একজন নাইট তার প্রিয়তমার জন্য আত্মোৎসর্গের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতেন।

রেনেসাঁ যুগের লেখকরা, বিশেষ করে শেকসপিয়র, কথা বলেছেন “স্টার-ক্রসড লাভার্স” বা ভাগ্যবঞ্চিত প্রেমিক-প্রেমিকাদের নিয়ে। এই যুগলদের মধ্যে অসাধারণ আত্মিক সংযোগ থাকত, কিন্তু পরিবার, ভাগ্য বা পরিস্থিতি তাদের সুখী সমাপ্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। যেন মহাবিশ্ব নিজেই তাদের প্রেমের গল্প লিখেছিল, কিন্তু মিলনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আর সাম্প্রতিক সময়ে? হলিউড সিনেমা ও রোমান্স উপন্যাসগুলো আমাদের সামনে রূপকথার প্রেমের গল্পই তুলে ধরেছে।

আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে?

”দ্য ওয়ান” বা কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে যেভাবে খুঁজি

কেমব্রিজের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভিরেন স্বামী মনে করেন, আধুনিক রোমান্টিক ভালোবাসার ধারণার উৎস মধ্যযুগীয় ইউরোপ। ক্যামেলট, ল্যান্সেলট, গিনিভিয়ার এবং গোলটেবিলের নাইটদের নীতিবোধের গল্পগুলো যখন মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখনই প্রথম এই ধারণার জন্ম নেয় যে—একজনকেই আজীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত।

অধ্যাপক স্বামী বলেন, “এর আগে ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চলে আপনি যতজনকে খুশি ভালোবাসতে পারতেন। তখন ভালোবাসা ছিল নমনীয় এবং প্রায়শই তা যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না।”

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন যখন মানুষকে তাদের কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তখন ব্যক্তিরা নিজেদের “বিচ্ছিন্ন” বা একা বোধ করতে শুরু করেন। “তারা নিজেদের দুর্বিষহ জীবন থেকে বাঁচাতে বা উদ্ধার করতে একজন মানুষকে খুঁজতে শুরু করেন,” ব্যাখ্যা করেন তিনি।

আজকের ডেটিং অ্যাপগুলো সেই গল্পকে অ্যালগরিদমে পরিণত করেছে, যা স্বামীকে “রিলেশন-শপিং” বা সম্পর্ক-কেনাকাটা বলে অভিহিত করেছেন। সোলমেট খোঁজার এই প্রক্রিয়াটি অনেক সময় আসল উদ্দেশ্যের ঠিক বিপরীতে চলে যায়। তিনি বলেন, “অনেকের জন্য এটি একেবারেই আত্মাহীন এক অভিজ্ঞতা। আপনি যেন একজন সঙ্গীর জন্য কেনাকাটা করছেন… ডেটিং অ্যাপে হয়তো ডজন খানেক মানুষের প্রোফাইল ঘাঁটছেন, যতক্ষণ না এক পর্যায়ে মনে হয়… এবার আমাকে থামতে হবে।“

সোলমেট নামক ফাঁদ

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগাম ইয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবাহ ও পারিবারিক গবেষণার অধ্যাপক জেসন ক্যারল “দ্য ওয়ান”-এর আকাঙ্ক্ষার বিষয়টিকে সহানুভূতির চোখেই দেখেন। তিনি বলেন, “আমরা আবেগ-নির্ভর প্রাণী। আমরা সেই আত্মিক বন্ধনই কামনা করি।”

তবে তিনি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন, সোলমেটের ধারণাটি বাদ দিতে হবে, কিন্তু “দ্য ওয়ান”-এর আকাঙ্ক্ষা বাদ দেওয়ার দরকার নেই। শুনতে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও, ক্যারলের কাছে এটি ভাগ্য ও পরিশ্রমের মধ্যকার পার্থক্য।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “সোলমেট শুধু পাওয়া যায়। এটি আগে থেকেই তৈরি থাকে। কিন্তু ‘দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি’ বা একমাত্র মানুষটি হলো—দুজন মিলে বছরের পর বছর অভিযোজন, ক্ষমা চাওয়া এবং মাঝে মাঝে কঠিন ধৈর্য ধরে গড়ে তোলা একটি সম্পর্ক।”

ক্যারলের এই যুক্তি দশকের পর দশক ধরে চলা গবেষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা তিনি তার “দ্য সোলমেট ট্র্যাপ” প্রতিবেদনে উপস্থাপন করেছেন। এতে মনোবিজ্ঞানীদের “ডেস্টিনি বিলিফ” (সঠিক সম্পর্ক সহজাতভাবেই সহজ মনে হবে) এবং “গ্রোথ বিলিফ” (সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সঙ্গীরা কী করতে পারেন)—এই দুই ধারণার মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে।

১৯৯০-এর শেষ ও ২০০০-এর শুরুতে হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি. রেমন্ড নির নেতৃত্বে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিশ্বাস করতেন সম্পর্ক “ভাগ্যনির্দিষ্ট”, তারা কোনো দ্বন্দ্ব বা ঝগড়া হলেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি সন্দিহান হয়ে পড়তেন। অন্যদিকে গ্রোথ-মনস্ক বা বিকাশমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মানুষরা তর্কবিতর্কের সময়েও সম্পর্কের প্রতি অবিচল থাকতেন।

ক্যারলের মতে, সোলমেট বিশ্বাস একটি ফাঁদ—কারণ এটি রোমান্স নয়, বরং এমন এক প্রত্যাশা তৈরি করে যে ভালোবাসায় কখনোই কোনো জটিলতা থাকবে না। দীর্ঘ সম্পর্কের সবচেয়ে “আত্মনিষ্ঠ” অংশটি কোনো সিনেমার মতো আবেগ নয়। তাঁর মতে, এটি হলো “একে অপরের শক্তির পাশাপাশি… চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতাগুলোকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ” পাওয়া।

“এটি বেশ পবিত্র একটি জায়গা,” তিনি বলেন। “আমরা সেই বিষয়গুলো জানি শুধুমাত্র কারণ তারা আমাদের সেখানে প্রবেশ করতে দিয়েছেন।”

ক্যারল মনে করেন, যখন ভালোবাসাকে কেবল ভাগ্য বলে মনে করা হয়, তখন মানুষ সেই কঠোর পরিশ্রমের জন্য কম প্রস্তুত থাকে যা প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে। সোলমেট ফাঁদ বা ভ্রম প্রথম গুরুতর সমস্যাতেই সম্পর্ককে অনেক কঠিন করে তোলে।

তিনি বলেন, “প্রথমবার কোনো সমস্যা হলেই চট করে মনে হয়, ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার সোলমেট। কিন্তু হয়তো তুমি নও, কারণ সোলমেটদের তো এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় না।’ কিন্তু সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি হতে গেলে পথটা সব সময় মসৃণ হবে না।“

আবেগ নাকি ট্রমা?

লন্ডন-ভিত্তিক লাভ কোচ (Love Coach) ভিকি প্যাভিট প্রায়শই এমন মানুষদের সাহায্য করেন যারা ভেবেছিলেন তারা তাদের সোলমেট পেয়েছেন, কিন্তু পরে দেখেছেন সেই রূপকথাটি আসলে মানসিক কারসাজি, অবিশ্বস্ততা এবং ক্রমাগত উদ্বেগে ভরা।

তিনি বলেন, “যখন খুব বেশি রসায়ন ও তীব্র আবেগ কাজ করে, আমার মনে হয় এটি কখনো কখনো পুরনো অস্বাস্থ্যকর প্যাটার্ন বা পুরনো ক্ষত নতুন করে খোলার লক্ষণ হতে পারে।”

“অসঙ্গতিপূর্ণ বা কখনো গরম-কখনো ঠান্ডা আচরণ করা একজন মানুষ আপনাকে এমন অনুভব করাতে পারেন যে ‘আমি তাকে ছাড়া থাকতে পারব না’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যা ঘটছে তা হলো—তারা আপনাকে এতটাই উদ্বেগের মধ্যে রাখছেন যে আপনি তাদের আরও বেশি করে চাইছেন।”

প্যাভিট বলেন, যাকে আমরা ভাগ্য বলে মনে করি, তা আসলে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের একটি প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এটি অতীতে আমাদের যা ক্ষতি করেছে তাকেই চিনতে পারছে এবং ঠিক করার চেষ্টা করছে—থেরাপিস্টরা যাকে ‘ট্রমা বন্ড’ বলেন।

এই বন্ড বা বন্ধন ভালোবাসার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটি মানুষকে অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির দিকে চুম্বকের মতো টেনে নেয়। কারণ সেগুলো আমাদের পরিচিত, পূর্ণাঙ্গ সঙ্গী হওয়ার জন্য নয়।

১৯৯৩ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড ডাটন ও সুসান পেইন্টারের একটি গবেষণা প্রায়শই এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত হয়। তারা নির্যাতনকারী সঙ্গীকে ছেড়ে আসা ৭৫ জন নারীকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

গবেষক দলটি পরিমাপ করেছিলেন ওই নারীরা তাদের সাবেকের প্রতি কতটা আবেগপ্রবণ ছিলেন এবং সেটি তাদের সম্পর্কের ধরনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

তারা দেখেছিলেন, সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন সেই নারীদের মধ্যে ছিল না যারা নিরন্তর নির্যাতিত হয়েছেন, বরং তাদের মধ্যে ছিল যাদের সঙ্গীরা ক্রমাগত আকর্ষণ ও নিষ্ঠুরতার মধ্যে রূপ বদলাতেন।

ডাটন ও পেইন্টার যুক্তি দেন, এই ট্রমা বন্ড ব্যাখ্যা করে কেন মানুষ বাস্তবিকভাবে তাদের জন্য ক্ষতিকর সম্পর্কে বারবার ফিরে যেতে পারে—কারণ বিপদ ও স্নেহের এই মিশ্রণটি তাদের কাছে পরিচিত, স্বাস্থ্যকর বলে নয়।

প্যাভিট বলেন, “আমার ভাষায়, আমি কখনো সোলমেট নিয়ে কথা বলি না। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি না যে প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট একজন মানুষ আছে… কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমরা কারও জন্য ‘দ্য ওয়ান’ হয়ে উঠতে পারি।“

বাস্তব রসায়ন

সোলমেটের অস্তিত্ব নাকচ করলে বিষয়টিকে অরোমান্টিক মনে হতে পারে, তবে আকর্ষণের জীববিজ্ঞানও একই দিকে ইঙ্গিত করে।

হরমোনাল জন্মবিরতিকরণ পিলগুলো সঙ্গীরা একে অপরের সম্পর্কে কেমন অনুভব করেন, তা সূক্ষ্মভাবে পরিবর্তন করতে পারে। গবেষণা বলছে, পিলগুলো শরীরের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষমতার হরমোনগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, যা মাসিক চক্রজুড়ে আকর্ষণে যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে তা দমন করতে পারে। এটি সম্ভাব্যভাবে প্রাথমিক সঙ্গী নির্বাচনকেও প্রভাবিত করতে পারে।

৩৬৫টি দম্পতির ওপর করা একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের যৌন সন্তুষ্টি বেশি ছিল যখন তাদের বর্তমান গর্ভনিরোধক অবস্থা এবং সঙ্গী নির্বাচনের সময়ের অবস্থা একই ছিল। এটি ইঙ্গিত দেয় যে পিল ব্যবহারে পরিবর্তন আসলে সঙ্গীকে কেমন অনুভব করা হয়, তা বদলে দিতে পারে। এই প্রভাব ছোট হলেও, কিছু দম্পতির সময়ের সঙ্গে রসায়নের বিভ্রান্তিকর পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় এটি সাহায্য করতে পারে।

যদি হরমোন ও পিল কে “দ্য ওয়ান” বলে মনে হবে তা প্রভাবিত করতে পারে, তবে আগে থেকে ঠিক করা একজন মাত্র সঙ্গীর যুক্তিটি দুর্বল হয়ে যায়—আর এখানেই গণিতবিদদের প্রবেশ।

“দ্য ওয়ান” কিন্তু একমাত্র নন

মনোবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান “দ্য ওয়ান” নিয়ে চিন্তার এক ধরনের ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু গণিত অন্য একটি পথ দেখায়।

টেনেসির ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ড. গ্রেগ লিও একটি ‘কম্প্যাটিবিলিটি’ বা সামঞ্জস্যের অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন। এটি দেখায় যে শুধু একটি “দ্য ওয়ান” নয়, আপনার জন্য উপযুক্ত অনেক মানুষ থাকতে পারে।

পাবলিক ইকোনমিক থিওরি জার্নালে প্রকাশিত তার “ম্যাচিং সোলমেট” পেপারে দেখা যায়, কম্পিউটার সিমুলেটেড একটি ডেটিং পুলে প্রত্যেকে একে অপরকে র‍্যাংক বা ক্রমবিন্যাস করছে। তার অ্যালগরিদম “প্রথম-ক্রমের সোলমেট” বাছাই করে: এমন জোড়া যারা একটি স্থিতিশীল সম্পর্কে একে অপরকে বেছে নেয়। তাদের সরিয়ে বাকিদের নিয়ে আবার অ্যালগরিদম চালালে দ্বিতীয়-ক্রমের সোলমেট পাওয়া যায়, এবং এভাবে চলতে থাকে।

তার সিমুলেশনে, কারও পারস্পরিক প্রথম পছন্দ থাকা অত্যন্ত বিরল ছিল; কিন্তু অনেকের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দ ছিল। এই পরিস্থিতিতে একটি জুটিকে সুখী বলা হয় যদি প্রত্যেকে অপরের তালিকার শীর্ষে থাকেন এবং এমন কাউকে খুঁজে না পান যাকে তারা এবং সেই অন্য ব্যক্তি—উভয়েই বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে বেশি পছন্দ করবেন।

এটি কেবলই সংখ্যার খেলা মনে হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার এই অ্যালগরিদম আমাদের বলে যে—সারা জীবন কাটানোর মতো অনেক যোগ্য সঙ্গী আছে, শুধু একজন নির্দিষ্ট “দ্য ওয়ান” নেই।

ছোট ছোট বিষয়ে মনোযোগ দিন

তাহলে একটি দম্পতি কীভাবে তাদের “দ্য ওয়ান” বা আদর্শ সম্পর্ককে একসাথে তৈরি করতে পারে?

ওপেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও অন্তরঙ্গতা (Intimacy) বিষয়ের অধ্যাপক জ্যাকি গ্যাব ২০১৫ সালে সোসিওলজি জার্নালে প্রকাশিত তার “এন্ডিউরিং লাভ” প্রকল্পে এটি মূল্যায়ন করেছেন।

এই প্রকল্পে প্রায় ৫,০০০ মানুষের ওপর জরিপ চালানো হয়েছিল এবং তারপর ৫০টি দম্পতিকে অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল—পরিসংখ্যানের সঙ্গে ডায়েরি, সাক্ষাৎকার এবং বাড়িতে কী ঘটেছিল তার “আবেগ মানচিত্র” তৈরি করা হয়েছিল।

যখন তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন কী তাদের প্রশংসিত বোধ করায়, উত্তরগুলো সূর্যাস্তে বিয়ের প্রস্তাব বা প্যারিসে চমকপ্রদ ভ্রমণের মতো কিছু ছিল না।

তা ছিল—“অপ্রত্যাশিত উপহার, চিন্তাশীল অঙ্গভঙ্গি এবং বিছানায় এক কাপ চা এগিয়ে দেওয়া।” ঠাণ্ডা সকালে গাড়িটা গরম করে দেওয়া। বন্য ফুল তুলে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা। কোনো অনুষ্ঠানে নিজেদের মধ্যে একটু হাসি বিনিময় করা।

পরিমাণগতভাবে, যাকে তিনি “দৈনন্দিন মনোযোগী কাজ” বলেন, তা বড় বড় রোমান্টিক অঙ্গভঙ্গির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী প্রমাণিত হয়েছিল।

তার জরিপে, ২২% মা ও ২০% নিঃসন্তান নারী এই ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গিগুলোকে তাদের ‘মূল্যবান বোধ’ করার শীর্ষ দুটি কারণের একটি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন—যা বড় কোনো ডিনার বা দামী উপহারের চেয়েও বেশি।

তথ্যানুযায়ী, সম্পর্কের সন্তুষ্টি প্রাথমিকভাবে অর্থ বা রোমান্সের বিষয় ছিল না; এটি ছিল “ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া” এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রকাশের বিষয়।

প্রকল্পের জন্য দেওয়া এক তরুণ দম্পতির ডায়েরিতে, সুমাইরা তার সঙ্গীর বাড়ি ফেরা, তার রান্না করা রাতের খাবার, বারান্দায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরা এবং একসাথে টেবিলে খাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

তিনি তার গবেষণার ডায়েরিতে লিখেছেন, “এটি নিখুঁত। শুধু আমরা এবং খাবার। আমি আর কী চাইতে পারি?”

এরপর বসার ঘরে স্বতঃস্ফূর্ত নাচ, লম্বা ঘাসের ভেতর দিয়ে হাঁটা যেখানে তিনি অন্ধকারে ভয় পাচ্ছিলেন, এবং একটি ছবি যা তার সঙ্গী এত পছন্দ করেন যে তিনি এটি তার ফোনের ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখেছেন।

এটি একটি সুন্দর প্রতিদিনের গল্পের মতো মনে হয়, কোনো রূপকথা নয়: এখানে সিন্ডারেলা স্টাইলে কোনো কাঁচের জুতো নেই, আছে কাদায় হাঁটার গামবুট বা ওয়েলিংটন বুট।

তবে গ্যাব দেখিয়েছেন যে এই মিষ্টি মুহূর্তগুলোর সঙ্গে মিশে আছে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং বিষণ্ণতার ইতিহাস—যা এই দম্পতি একসাথে সামলাতে শিখছে।

তিনি বলেন, “এখানে সোলমেট অনুভূতি আকাশ থেকে পড়ে না; দম্পতিরা যেভাবে জীবনের চাপগুলো মোকাবিলা করে, তার মাধ্যমেই এটি তিলে তিলে তৈরি হয়।“

বিজ্ঞান রোমান্স কাড়ে না, সাহায্য করে

অধ্যাপক ক্যারলের মতে, বিজ্ঞান রোমান্স কেড়ে নেয় না—বরং এটি ভালো ও মন্দ সময়ে সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

তিনি বলেন, “আমি একটি অনন্য ও বিশেষ সম্পর্কে থাকার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেশ স্বচ্ছন্দ, যতক্ষণ আমরা মনে রাখি যে এটি আমাদেরই তৈরি করতে হবে।”

লাভ কোচ ভিকি প্যাভিট মনে করেন, “এটা বিশ্বাস করা ঠিক আছে, এমনকি সহায়কও হতে পারে যে আপনার মানুষটি কোথাও না কোথাও আছে। তবে শর্ত হলো—আপনাকে জানতে হবে এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের সঙ্গে আপনি দারুণ সংযোগ গড়তে পারেন এবং কাউকে নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা করা বন্ধ করতে হবে।”

সোলমেট নিয়ে বিজ্ঞান একটি বিপরীতমুখী পরামর্শ দেয়। যারা শেষ পর্যন্ত এমন সম্পর্কে থিতু হন যা অনন্য বা “ভাগ্যনির্দিষ্ট” মনে হয়, তারা আসলে ভাগ্যের অপেক্ষা করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারা তাদের সামনের অসম্পূর্ণ মানুষটির দিকে তাকিয়ে কার্যত বলেছিলেন: “চলো, আমরা কি এটি থেকেই সুন্দর কিছু তৈরি করতে পারি?”

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. রোমান্টিক দক্ষতা বাড়ানোর উপায়

    সুস্থ প্রেমের সম্পর্ক গড়তে রোমান্টিক কম্পিটেন্স বা রোমান্টিক দক্ষতা কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এটি বিকাশ করা যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।

    সম্পর্কমানসিক স্বাস্থ্যযোগাযোগ
  2. ভালোবাসা নয়!

    ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র আগে ডেটিং অ্যাপে ব্যবহারকারী বাড়লেও অনেকের জন্য এই দিনটি একাকীত্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেন? জানুন কীভাবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীদের আটকে রাখে।

    প্রযুক্তিসম্পর্কডেটিং অ্যাপ
  3. চাপের সময় মানসিক স্বচ্ছতা বজায় রাখার ৫টি উপায়

    কাজের চাপ বা জটিল পরিস্থিতিতে মানসিক স্বচ্ছতা ধরে রাখতে পারেন কিছু সহজ অভ্যাসে। জেনে নিন ৫টি কার্যকর কৌশল।

    মানসিক স্বাস্থ্যস্ট্রেস ম্যানেজমেন্টস্বাস্থ্য ও জীবনধারা