skip to content
গুলবাহার
ব্ল্যাক ডেথ মহামারির সময় একটি শহরের দৃশ্য

ইতিহাসের পাতায় ব্ল্যাক ডেথ: একটি মহামারির অবসান

·

• ৩ মিনিট

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পরিচ্ছন্ন হাসপাতালের আবির্ভাবের অনেক আগে ইউরোপজুড়ে এক ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৩৪৭ সালে শুরু হয়ে এই রোগের প্রথম ঢেউ ১৩৫১ সাল পর্যন্ত চলে। ইতিহাসবিদদের ধারণা, ব্ল্যাক ডেথ নামের এই মহামারিতে ইউরোপে প্রায় ২৫ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এই রোগের জন্য দায়ী ছিল ইয়ার্সিনিয়া পেস্টিস নামের একধরনের ব্যাকটেরিয়া। কালো ইঁদুরের শরীরে থাকা পোকায় এই জীবাণু বাস করত। সেই পোকা থেকেই রোগটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত। বাণিজ্যিক জাহাজে ইঁদুর থাকায় রোগটি এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারের ভূমিকা

রোগে আক্রান্তদের শরীরে কালো ফোসকা উঠত ও উচ্চ জ্বর দেখা দিত। অনেক সময় এতে রোগীর মৃত্যুও হতো। ১৩৪৭ সালে রোগাক্রান্ত জাহাজগুলো প্রথমবারের মতো সিসিলির মেসিনা বন্দরে পৌঁছায়। কাফা থেকে আসা এসব জাহাজে অনেক মৃতদেহ ও আক্রান্ত যাত্রী ছিল। তবু শুরুতে তাদের বন্দরে ভেড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে জাহাজের ভয়াবহ অবস্থা বুঝতে পেরে কর্তৃপক্ষ সেগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। জীবাণু ইতোমধ্যে স্থলভাগে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৩৪৭ সালের প্রথম ঢেউয়ের পর ইউরোপের বিভিন্ন শহরের নেতারা খেয়াল করেন যে, রোগটি মানুষ ও পণ্যের মাধ্যমে ছড়ায়। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণে ১৩৭৭ সালে রাগুসা শহর একটি আইন পাস করে।

আইন অনুযায়ী রোগগ্রস্ত এলাকা থেকে আসা যে কাউকে কাছাকাছি একটি দ্বীপে ৩০ দিন অবস্থান করতে হতো। কর্তৃপক্ষ এই সময়কালকে ‘ত্রেন্তিনা’ বলত। পরে অপেক্ষার এই সময় বাড়িয়ে ৪০ দিন করা হয়। একে বলা হতো ‘কোয়ারেন্তেনা’। ইংরেজি ‘কোয়ারেন্টাইন’ শব্দটি মূলত এই ইতালীয় শব্দ থেকেই এসেছে। এসব নিয়মের পাশাপাশি ভেনিস শহর ১৪২৩ সালে লাজারেত্তো ভেকিওর মতো দ্বীপে বিশেষ হাসপাতাল তৈরি করে। সেখানে রোগীদের সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা করে রাখা হতো।

এরপর গোটা মহাদেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জাহাজ পরিষ্কার করতে সিরকা ব্যবহার করা হতো। আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাপড় পুড়িয়ে ফেলা হতো। আর কাগজপত্র ধোঁয়ার ওপর ধরে জীবাণুমুক্ত করা হতো।

সেসময় ভ্রমণেও বিভিন্ন বিধিনিষেধ প্রচলিত ছিল। অনেক শহর ও অঞ্চল মহামারি আক্রান্ত এলাকার মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ বা সীমিত করে দেয়। কেবল স্বাস্থ্য সনদ থাকলে অথবা কোয়ারেন্টাইন শেষ করলেই সেখানে প্রবেশের অনুমতি মিলত।

সামাজিক পরিবর্তন

সংক্রমণ এড়াতে সেসময় মানুষ তাদের জীবনযাত্রার ধরন বদলে ফেলে। তারা অপরিচিতদের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমানো বন্ধ করে দেয়। জনাকীর্ণ শহর ছেড়ে অনেকেই গ্রামের দিকে চলে যায়। কাঠ ও কাদা দিয়ে তৈরি বাড়িতে পোকা এবং রোগাক্রান্ত ইঁদুরের উপদ্রব বেশি থাকত। তাই মানুষ পাথর ও ইট দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করতে শুরু করে।

তবে ঘরবাড়ি তৈরির এই পরিবর্তনের পেছনে অগ্নিনিরাপত্তাও একটি বড় কারণ ছিল। বিশেষ করে ১৬৬৬ সালে লন্ডনের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এ সংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করা হয়। স্থাপত্যের এই পরিবর্তন কীভাবে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে, এটি ছিল তারই একটি উদাহরণ। খড়কুটোর ছাউনির চেয়ে পাথরের দেয়ালে ইঁদুরের লুকিয়ে থাকা বেশ কঠিন ছিল। কালো ইঁদুর দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে ছিল ঠিকই, কিন্তু বাসস্থানের এই পরিবর্তনে মানুষ ও পোকার সংস্পর্শ অনেক কমে আসে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিকাশ

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবদেহে বেশ কিছু জেনেটিক বা জিনগত পরিবর্তন ঘটে। এতে ব্ল্যাক ডেথ জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের শারীরিক সহনশীলতা বাড়ে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জিনধারী ব্যক্তিরা সেসময় বেঁচে যায়। ফলে পরবর্তী প্রজন্মে জৈবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। এরপর মহামারি বারবার ফিরে এলেও মৃত্যুর হার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। প্রথম ঢেউয়ে যারা প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধী ছিল, তারাই বেঁচে যায়। তাদের অনেকেই সেই রোগ প্রতিরোধী জিন নিজেদের সন্তানদের মধ্যে স্থানান্তর করে। তাই ১৩৬০ সালের পরবর্তী প্রাদুর্ভাবগুলো প্রথমটির চেয়ে তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী হয়েছিল।

জীবাণুর পরিবর্তন

ব্ল্যাক ডেথের শিকার হওয়া মানুষদের হাড়ের ওপর করা গবেষণায় রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার জেনেটিক গঠনে পরিবর্তন ধরা পড়েছে। ধারণা করা হয়, এই পরিবর্তনের কারণেই রোগটি তার প্রাণঘাতী বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে জীবাণুটি আক্রান্ত ব্যক্তিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে না দিয়েও তার শরীরে টিকে থাকতে পারত। মূলত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকটেরিয়াটি একটি দুর্বল সংস্করণে পরিণত হয়েছিল।

কিছু জিনের অনুপস্থিতি জীবাণুটিকে অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়তেও সাহায্য করেছিল। ফলে ভবিষ্যতের সংক্রমণগুলোতে মৃত্যুর হার কমতে থাকে। তবে এই রোগের কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয় আরও অনেক পরে, ১৯ শতকে।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আপনার কতটা চিন্তা করা উচিত?

    মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে ভাইরাল হওয়া ভয়াবহ দাবিগুলোর পেছনের সত্যি কী? বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণে জানুন আসলে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া প্রয়োজন।

    স্বাস্থ্যপরিবেশবিজ্ঞান
  2. বিদ্যুৎহীন যুগে মানুষ কীভাবে বরফ তৈরি করত?

    আধুনিক রেফ্রিজারেটরের আগে ৪০০ বছর খ্রিস্টপূর্বে পারস্যরা কীভাবে প্রকৃতির বিপরীতে বরফ তৈরি করত, জানুন ইয়াখচালের বিস্ময়কর কৌশল।

    ইতিহাসপ্রযুক্তিপারস্য সভ্যতা
  3. ক্রিকেটের ইতিহাস

    ফুটবলের পর ক্রিকেটই বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা। ২৫০ কোটি অনুসারী নিয়ে এই খেলার উৎপত্তি থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইতিহাস জানুন।

    ক্রিকেটখেলাধুলাইতিহাস