skip to content
গুলবাহার
আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনীয়তার পার্শ্বের চিত্র

ঠুনকো আকাঙ্ক্ষার ফাঁদে

·

• ৫ মিনিট

বোধহয় এই সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় অনুভূতি হলো এক ধরণের তীব্র ‘ক্ষুধা’।

আমাদের যা প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশিই আমাদের কাছে আছে, তবুও আমাদের পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ফুরোচ্ছে না। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা হয়তো মনে মনে একটু বাহুল্যহীন জীবন চাইছি, অথচ আমাদের চারপাশে জমছে কেবল অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাহাড়। এ এক অদ্ভুত ক্ষুধার জ্বালা; কিন্তু এই শূন্যতাকে প্রকাশ করার মতো যুতসই কোনো শব্দ আমাদের জানা নেই। আমরা আসলে এক গভীর অতৃপ্তিতে ভুগছি এবং প্রতিনিয়ত অজানাকে খুঁজছি।

আমরা এখন এক ধরনের ঠুনকো আর ভাসা-ভাসা আকাঙ্ক্ষার জালে বন্দি। এই অতৃপ্তিকে যেমন ঠিক শব্দে ধরা যায় না, তেমনি ভাষায় বুঝিয়ে বলাও মুশকিল। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আমরা যার কাছে বা যে ব্যবস্থার কাছে এই তৃপ্তি খুঁজছি, আমাদের সেই শূন্যতা মেটানোর প্রতি তার কোনো আগ্রহই নেই।

আকাঙ্ক্ষার এই ‘নিবিড়’ আর ‘পলকা’ বিভাজন আমার নিজের তৈরি নয়। দশকের পর দশক ধরে দার্শনিকরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। চার্লস টেইলরের ‘অর্থের কাঠামো’ থেকে শুরু করে অ্যাগনেস ক্যালার্ডের সাম্প্রতিক লেখা পর্যন্ত এর বিস্তার রয়েছে। তবে আমার কাছে এর সবচেয়ে কার্যকর ব্যাখ্যাটি বেশ সহজ।

নিবিড় আকাঙ্ক্ষা হলো এমন কিছু যা অর্জনের যাত্রায় আপনি নিজে বদলে যান। আর পলকা আকাঙ্ক্ষা আপনাকে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করে না।

ক্যালকুলাস বোঝার আকাঙ্ক্ষা আর ফোনের নোটিফিকেশন চেক করার আকাঙ্ক্ষা দুটোই বাস্তব। দুটো পূরণ হলেই এক ধরনের সন্তুষ্টি আসে। কিন্তু যে ব্যক্তি এক বছর সময় দিয়ে ক্যালকুলাস শিখল সে আর আগের মানুষটি থাকে না। সে এখন পৃথিবীতে এমন সব গাণিতিক সৌন্দর্য বা নিদর্শন দেখতে পায় যা আগে তার কাছে অদৃশ্য ছিল। তার উপলব্ধির ক্ষমতা বাড়ে। সে এক গভীর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়।

অন্যদিকে যে ব্যক্তি নোটিফিকেশন চেক করল, পাঁচ মিনিট পর সে ঠিক আগের মানুষটিই রয়ে গেল।

ঠুনকো বা পলকা আকাঙ্ক্ষা কোনো রেশ না রেখেই নিজেকে বারবার জন্ম দেয়। কিন্তু নিবিড় আকাঙ্ক্ষা তার বাহককে রূপান্তরিত করে।

এখানে কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই দাবিটি সহজেই “এ যুগের ছেলেমেয়েরা সব শেষ করল” ধরনের কোনো অযৌক্তিক বিরক্তিতে রূপ নিতে পারে। কিন্তু এর একটি দিক আছে যা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।

বেশিরভাগ ভোক্তা-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল হলো মানুষের কোনো একটি নিবিড় আকাঙ্ক্ষাকে খুঁজে বের করা। এরপর সেটির সেই অংশটুকুকে আলাদা করা হয় যা আমাদের মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক আনন্দের উদ্রেক করে। এরপর তারা আসল অভিজ্ঞতার বাকি অংশ ছাড়াই কেবল সেই পুরস্কারটুকু আমাদের হাতে তুলে দেয়।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের সামাজিক যোগাযোগের অনুভূতি দেয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে প্রকৃত বন্ধুত্বের দায়বদ্ধতা থাকে না। পর্নোগ্রাফি যৌন সন্তুষ্টির বিভ্রম দেয়। কিন্তু এতে সঙ্গীর কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করার সেই সংবেদনশীলতা বা মানসিক গভীরতা নেই। প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপগুলো আমাদের অর্জনের অনুভূতি দেয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই পলকা সংস্করণটি বড় আকারে সরবরাহ করা সহজ। এগুলো থেকে মুনাফা করা সহজ এবং মানুষকে এতে আসক্ত করাও সহজ।

এর ফল হলো আমরা কেবল সংবেদনের খোরাক পাচ্ছি। আর এতে কেউ সুখী হচ্ছে বলে মনে হয় না। সব জরিপই একই দিকে ইশারা করছে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা আর একাকিত্ব বাড়ছে। অথচ ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা এখন একে অপরের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত।

যখন আমরা মানুষকে তাদের চাওয়া অনুযায়ী সবকিছু দিতে পারছি, তখন এমনটা কেন হচ্ছে?

হয়তো এর কারণ হলো, আমরা মানুষকে এমন কিছু দিতে শিখেছি যা তাদের মূল্যবান কোনো কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরিতে বাধা দেয়।

নিবিড় আকাঙ্ক্ষাগুলো বেশ অসুবিধাজনক। এগুলো লালন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। চাহিদা মাত্রই তা পূরণ করা যায় না। কোনো কাজে দক্ষতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বা নিবিষ্ট হয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষার কথা ভাবুন। প্রকৃত সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়ানোর আকাঙ্ক্ষা কিংবা নিজের চেয়ে বড় কোনো ঐতিহ্যে নিজের স্থান বুঝে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও একই রকম। এসব অর্জন করতে প্রচুর পরিশ্রম প্রয়োজন এবং এগুলোর কোনো শেষ নেই। এগুলো আপনাকে দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের জালে জড়িয়ে ফেলে। এগুলো আপনাকে নির্দিষ্ট মানুষ ও জায়গার ওপর নির্ভরশীল করে তোলে।

ঘর্ষণহীন বিশ্ববাজারের দৃষ্টিতে এগুলো স্রেফ অদক্ষতা। তাই নিবিড় আকাঙ্ক্ষার পরিকাঠামো ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলা হয়েছে। কলকারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। মানুষের মেলামেশার জায়গাগুলো ফিকে হয়ে গেছে এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ উধাও হয়ে গেছে। এমনকি বাড়ির সামনের বারান্দাগুলোর জায়গা নিয়েছে পেছনের ডেক আর স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট। আর সেই কাঙ্ক্ষিত খুদে ঘরে আপনি আপনার ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে সম্পূর্ণ একা থাকতে পারেন।

অন্যদিকে পলকা আকাঙ্ক্ষার পরিকাঠামো এখন প্রায় অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রতিটি মুহূর্তে আপনার পকেটে অবস্থান করছে।

সম্প্রদায় পুনর্গঠন বা জীবনের অর্থ পুনরুদ্ধারের বড় বড় কর্মসূচিগুলো প্রায়ই ব্যর্থ হয়। কারণ সেগুলো একই যান্ত্রিক যুক্তিতে চলে যা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। আসলে নিবিড় জীবন কখনোই গণহারে বা যান্ত্রিকভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। এটাই মূল বিষয়।

তাই সহজ কিছু দিয়ে শুরু করুন। যেমন রুটি বানাতে পারেন।

খামির আপনার ব্যস্ত সময়সূচি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। খামির যখন ফোলার তখনই ফুলবে। আপনার আধুনিক অপ্টিমাইজেশন নিয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আপনি এমন এক কাজে পুরো বিকেল ব্যয় করবেন যা দ্রুত করার কোনো উপায় নেই। অথচ চাইলে আপনি তা মাত্র কয়েক টাকায় কিনে নিতে পারতেন। কিন্তু এই ধীর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আপনি মনোযোগের সেই সক্ষমতাটুকু ফিরে পাবেন যা ডিজিটাল দুনিয়া প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছিল।

কাগজে কলমে চিঠি লিখুন। ডাকে পাঠান। চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগবে। আপনি তা ফেরত নিতে পারবেন না বা এডিট করতে পারবেন না। প্রাপক সেটি খুলেছে কি না তাও ট্র্যাক করতে পারবেন না। আপনি এমন এক যোগাযোগের মাধ্যম তৈরি করছেন যা ইন্টারনেটের এনগেজমেন্ট মেট্রিক্সের বাইরে। এটি এমন এক ক্ষুদ্র নিদর্শন যা যান্ত্রিক হওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

নির্দিষ্ট কোনো একজন মানুষের জন্য কোনো কিছু তৈরি করুন। আপনার বন্ধুর কোনো একটি সুনির্দিষ্ট সমস্যা বা তার কাজের ধরনের কথা মাথায় রেখে কোনো সমাধান খুঁজুন। এমন কিছু তৈরি করুন যা কখনোই বড় আকারে ছড়িয়ে পড়বে না। এটি হয়তো মুনাফা আনবে না কিংবা লাখো ব্যবহারকারীকে আকর্ষণ করবে না। আধুনিক সফটওয়্যার অর্থনীতি মনে করে, কোড যদি লাখ লাখ মানুষের কাজে না লাগে তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কেবল একজন মানুষের জন্য কিছু তৈরি করা এই যুগে এক সুন্দর বিদ্রোহ।

সবকিছুই যে ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে, সেই স্রোত হয়তো একবারে ফিরবে না। কিন্তু আমার মনে হয় কোনো বড় আন্দোলন ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে একটি নিবিড় জীবন যাপন করা সম্ভব।

যে ব্যক্তি রুটি বানায়, সে একা পৃথিবী বদলে ফেলার লক্ষ্য নিয়ে নামে না। সে মহাবিশ্বের কোনো বড় সমীকরণ মেলাতেও ব্যস্ত নয়।

সে কেবল একটা রবিবারের বিকেল এমনভাবে কাটাতে চায় যাতে দিনশেষে নিজেকে রিক্ত মনে না হয়। প্রতিটি রুটি তৈরির মাধ্যমে সে আসলে নিজেকে একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। যা সত্যিই চাওয়ার যোগ্য তা অর্জন করতে কেমন লাগে, এটাই সে উপলব্ধি করে।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. চ্যাটবটের প্রেমে পড়ে নিঃস্ব হলেন আইটি বিশেষজ্ঞ

    চ্যাটবটের সাথে সম্পর্ক, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং মানসিক ভারসাম্য হারানোর সত্য গল্প

    এআইমানসিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি
  2. আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

    স্মার্টফোনের যুগে মনোযোগ হারানোর সংকট এবং কেন মানুষ আবার সরল ডিভাইসের দিকে ফিরছে।

    প্রযুক্তিডিজিটাল ওয়েলবিংস্মার্টফোন
  3. আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?

    টেলিফোনের আবিষ্কার নিয়ে ১৫০ বছরের বিতর্ক। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নাকি এলিশা গ্রে? এক ঐতিহাসিক রহস্যের অনুসন্ধান।

    ইতিহাসপ্রযুক্তিটেলিফোন