৮০ বছর বয়সী আপনি
বৃদ্ধ বয়সে ফিরে তাকালে যুবকেরা কী হারাচ্ছেন তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা। সময়ের মূল্য ও অনুশোচনা নিয়ে একটি চিন্তা-পরীক্ষা।
মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন ১৭২০ সালের ‘সাউথ সি বাবল’ কেলেঙ্কারিতে বিপুল অর্থ হারিয়েছিলেন। প্রথমে কিছু মুনাফা করে শেয়ার বিক্রি করেন। এরপর বাজার যখন একদম তুঙ্গে, তখন তিনি আবারও শেয়ার কেনেন। এরপর চোখের সামনেই শেয়ার বাজারে ধস নামে। তাঁর ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার পাউন্ড। আজকের দিনে যা কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমান। যিনি ক্যালকুলাস উদ্ভাবন করেছিলেন এবং গ্রহের গতির নিয়ম ব্যাখ্যা করেছিলেন, তিনিও একটি সুনিপুণ জালিয়াতি এড়াতে পারেননি। পেছন ফিরে তাকালে এটিকে স্পষ্টতই একটি ধোঁকা বলে মনে হয়। নিউটন বলেছিলেন বলে প্রচলিত আছে, ‘আমি নক্ষত্রের গতি গণনা করতে পারি, কিন্তু মানুষের উন্মাদনা নয়।’
২০২০-এর দশকে নিউটন বেঁচে থাকলে হয়তো পুরোপুরি ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বুঁদ হয়ে থাকতেন।
রসায়ন ও শান্তিতে নোবেলজয়ী লাইনাস পলিং বিশ্বের সেই পাঁচজন ব্যক্তির একজন, যাঁরা দুবার নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি সাধারণ সর্দি এবং পরবর্তীতে ক্যানসারের চিকিৎসা হিসেবে অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন-সি গ্রহণের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এই দাবি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় কখনোই প্রমাণিত হয়নি। দাবা ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ববি ফিশার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্যারানয়া ও বর্ণবাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্বে নিমজ্জিত হন। বহুমুখী প্রতিভা জন ভন নিউম্যান কোয়ান্টাম মেকানিক্স, গেম থিওরি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। জানা যায় যে তিনি প্রায়শই গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটাতেন। অথচ তিনি মনে মনে অত্যন্ত জটিল সব হিসাব করতে পারতেন।
কখনো কখনো বুদ্ধিমান মানুষ এমন সব চরম ও বিধ্বংসী ভুল করেন, যা সাধারণ মানুষ অনায়াসেই এড়িয়ে যায়। কারণ মাঝে মাঝে বুদ্ধিমান ব্যক্তিদের মধ্যে একধরনের অস্বাভাবিক অন্ধত্ব কাজ করে। আর এই বুদ্ধিমত্তাই কখনো কখনো একজন মানুষকে সম্পূর্ণ নির্বোধ করে তুলতে পারে।
জনপ্রিয় ধারণা এবং এক্সে ইলন মাস্কের ভক্তদের উন্মাদনা বলে যে, আমাদের অনুকরণীয় বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা সব ক্ষেত্রেই কম ভুল করবেন। আপনার যদি বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও উন্নত যুক্তিবোধ বেশি থাকে, তবে অবশ্যই আপনি সাধারণ কারো চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু এই ধারণা মস্তিষ্ককে একটি ক্যালকুলেটরের মতো মনে করে। ক্যালকুলেটর হয় ঠিক কাজ করে, নয়তো ভুল করে। অথচ মস্তিষ্ক আসলে একজন আইনজীবীর মতো, যা যেকোনো পক্ষের হয়ে যুক্তি দেখাতে সক্ষম। একজন সাধারণ মানের আইনজীবীকে দুর্বল মামলা দিলে তাঁর হেরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু একজন মেধাবী আইনজীবীকে দুর্বল মামলা দিলেও তিনি একটি জটিল, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় যুক্তি তৈরি করবেন। তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন কেন তিনিই জিতবেন। উদাহরণ হিসেবে ‘বোস্টন লিগ্যাল’ সিরিজটির কথা ভাবা যেতে পারে।
বুদ্ধিমত্তা শুধু সত্য খুঁজে পেতেই সাহায্য করে না, বরং আকর্ষণীয় গল্প সাজাতেও সাহায্য করে। আর নিজের সাজানো গল্পে সবচেয়ে সহজে বিভ্রান্ত হওয়া ব্যক্তিটি হলেন আপনি নিজেই।
ফ্রান্সিস বেকন চার শতাব্দী আগে এই সমস্যাটি চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ‘আইডলস অব দ্য মাইন্ড’ বা মনের মূর্তি নিয়ে লিখেছিলেন, যা মানুষের যুক্তিবোধকে বিকৃত করে। বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা একটি সুসংগত বিশ্ববীক্ষা গড়ে তুলতে এবং যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান রক্ষায় পারদর্শী। ঠিক এই দক্ষতাগুলোই ‘মোটিভেটেড রিজনিং’ বা অনুপ্রাণিত যুক্তিকে বিপজ্জনক করে তোলে।
সহজভাবে বললে, বুদ্ধিমান মানুষ খুব বেশি বুদ্ধিমান হওয়ার কারণে আবেগগত বা সামাজিকভাবে লালন করা বিশ্বাসের পক্ষে চমৎকার সব যুক্তি তৈরিতে পারদর্শী হন। আমরা সবাই এটি কমবেশি করি। আমরা প্রথমে একটি ধারণা তৈরি করি এবং তারপর সেটি প্রমাণের জন্য তথ্য খুঁজি। কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ এই কাজটি অনেক বেশি কার্যকরভাবে করেন। তারা ভালো প্রমাণ খুঁজে পান, অথবা অন্তত শুনতে ভালো লাগে এমন প্রমাণ দাঁড় করান। তারা প্রতিপক্ষ কী যুক্তি দিতে পারে, তা আগে থেকেই অনুমান করে নাকচ করে দেন। অযৌক্তিক কারণে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্তের চারপাশে তারা যুক্তির এমন একটি দুর্গ তৈরি করেন। সেই দুর্গ এত জটিল ও সুরক্ষিত হয়ে ওঠে যে ভেতরে থাকা ব্যক্তিটি কখনোই বুঝতে পারেন না যে তিনি আসলে আটকা পড়েছেন।
ফিলিপ টেটলকের রাজনৈতিক বিচার-বুদ্ধি বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, সুপ্রতিষ্ঠিত বিশেষজ্ঞরা ভূ-রাজনৈতিক ঘটনার পূর্বাভাস দিতে গিয়ে কখনো কখনো সাধারণ অ্যালগরিদমের চেয়েও খারাপ করেছেন। টেটলকের মতে, সবচেয়ে সফল বিশেষজ্ঞরা ছিলেন শিয়াল প্রকৃতির। প্রাচীন কবি আর্কিলোকাসের ধারণা থেকে এই শিয়ালের রূপকটি নেওয়া হয়েছে। শিয়ালেরা অনেক ছোট ছোট জিনিস জানেন এবং পরিস্থিতির সাথে নিজেকে নমনীয়ভাবে খাপ খাইয়ে নেন। অন্যদিকে সজারুরা একটি বড় সত্য জানেন এবং সবখানেই সেটি প্রয়োগ করতে চান। এরা অনেক সময় নমুনার সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও সাবলীল সদস্য ছিলেন। তারা নিজেদের নির্ভুলতা নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী থাকতেন এবং ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও নিজেদের বিশ্বাস পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হতেন।
বুদ্ধিমত্তা অনেক সময় একধরনের বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার তৈরি করতে পারে। কারণ আপনি অনেক ক্ষেত্রে এমনভাবে সফল হয়েছেন, যা অন্যরা পারেনি।
মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ শয়তান অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং পুরোপুরি আত্মপ্রতারিত। সে নিজের বিদ্রোহকে ন্যায়সংগত করতে একটি বিশাল ধর্মতত্ত্ব তৈরি করে। অথচ নিজের অহংকারের ব্যাপারে সে অন্ধ থাকে। দস্তয়েভস্কির ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ম্যান’ যন্ত্রণাদায়কভাবে আত্মসচেতন এবং বিশ্লেষণধর্মী, যা মূলত নিজেকে ও অন্যদের কষ্ট দেওয়ার কাজে ব্যয় হয়। অন্যদিকে ফাউস্ট জ্ঞানের জন্য আত্মা বিক্রি করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি দেখতে পান যে প্রজ্ঞা ছাড়া জ্ঞান ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
১. জটিলতাকে সঠিকতা ভেবে ভুল করার প্রবণতা: সহজ ব্যাখ্যা বুদ্ধিমান কারো কাছে খুব মামুলি মনে হয়। তাই তারা অক্যামস রেজর উপেক্ষা করে জটিল তত্ত্বের দিকে ঝোঁকেন। ২. বুদ্ধিবৃত্তিক তাসের ঘর তৈরির ক্ষমতা: এটি সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু কোনো পূর্বাভাস দিতে পারে না। বাইরে থেকে দেখতে চমৎকার হলেও এর ভেতরে কোনো মজবুত ভিত্তি নেই। ৩. স্বীকৃতির সামাজিক চাপ: ‘সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি’ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার সামাজিক চাপ অন্যদের সঠিক যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন করে তোলে। ৪. মৌখিক দক্ষতার অপব্যবহার: বাচনভঙ্গি বা মৌখিক দক্ষতা অনেক সময় প্রকৃত বোঝাপড়ার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে কোনো বিষয় নিজে গভীরভাবে না বুঝেও অন্যকে খুব চমৎকারভাবে বোঝানো সম্ভব হয়।
প্রজ্ঞা হলো এটি জানা যে, আপনি আসলে কী জানেন না।
প্রজ্ঞা আমাদের মিমকয়েন বা শেয়ার বাজারের ফাটকা এড়িয়ে চলতে বলে। অথচ আপনার কাছে এটি প্রমাণের চমৎকার যুক্তি থাকতে পারে যে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রজ্ঞা বলে যে আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের যুক্তিতেও সত্য থাকতে পারে। যদিও আপনি তর্কে তাদের সহজেই পরাজিত করতে পারেন। প্রজ্ঞা বলে যে ব্যক্তিগত ডিভাইসে অনিরাপদ অ্যাপ বা এআই টুল ইনস্টল করার আগে সাবধান হতে হবে এবং ব্যাংকিং তথ্য দেওয়া যাবে না। অথচ আপনি নিজেকে পরবর্তী টনি স্টার্ক মনে করতেই পারেন।
বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় মাপা যায়, কিন্তু প্রজ্ঞা পরিমাপ করা অনেক কঠিন।
আইজাক নিউটন কখনোই মানুষের উন্মাদনা বুঝতে পারেননি। তিনি তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছিলেন অ্যালকেমি বা অপরসায়নের পেছনে, যা ছিল সম্পূর্ণ নিষ্ফল। পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানো এই মস্তিষ্ক বিশ্বাস করত যে, তিনি সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করতে পারবেন। এটি আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সবচেয়ে বিব্রতকর দুর্বলতা অনেক সময় পাশাপাশি অবস্থান করে। আপনার পরিচিত সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তিটি সম্ভবত কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চরম নির্বোধ। আর যদি আপনি নিজেই আপনার চেনা সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি হন, তবে সেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হয়তো আপনার খুব কাছেই আছে।
৮০ বছর বয়সী আপনি
বৃদ্ধ বয়সে ফিরে তাকালে যুবকেরা কী হারাচ্ছেন তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা। সময়ের মূল্য ও অনুশোচনা নিয়ে একটি চিন্তা-পরীক্ষা।
কীভাবে হয়ে উঠবেন আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত
যারা নিজেদের আকর্ষণীয় বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তারাই আসলে সবচেয়ে বিরক্তিকর। আসল ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার মূলমন্ত্র জেনে নিন।
অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার সেই হারানো কৌশল
অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলার দক্ষতা আমরা কেন হারিয়ে ফেলছি? এই হারানো দক্ষতা ফিরিয়ে আনার উপায় নিয়ে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প।