আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?
টেলিফোনের আবিষ্কার নিয়ে ১৫০ বছরের বিতর্ক। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নাকি এলিশা গ্রে? এক ঐতিহাসিক রহস্যের অনুসন্ধান।
১১৭ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট ট্রাজানের আমলে রোমের কোনো নাগরিকের পক্ষে সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব একদিন শেষ হয়ে যাবে, এমন কথা কল্পনা করাও অত্যন্ত কঠিন ছিল। রাস্তাঘাট, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, আইনি কাঠামো, ব্রিটেন থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্ক —সবকিছুই প্রকৃতির নিয়মের মতো চিরস্থায়ী মনে হতো, ঠিক যেন ভূমধ্যসাগরের ঢেউ।
এডওয়ার্ড গিবন ছয় খণ্ডে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। তবু তিনিও সব কারণ বের করতে পারেননি।
কিন্তু এর মূল কথাটি হয়তো এটিই: চিরস্থায়িত্ব ছিল একটি মায়া, আর সেই মায়ায় বিশ্বাস করাটা ছিল বিপর্যয়কর এক ভুল।
বর্তমানের জনপ্রিয় এআই বিশ্লেষণগুলোতে ফাউন্ডেশন মডেল কোম্পানিগুলোকে অনেকটা সেই রোমান নাগরিকদের মতোই দেখা হয়, যারা রোমান লেজিয়নদের (সেনাবাহিনী) অজেয় মনে করত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ব্যক্তিরা ধরে নেন যে, যেহেতু ওপেনএআই, গুগল, অ্যানথ্রপিক এবং মেটা দারুণ কিছু তৈরি করেছে, তাই এই অগ্রগতি একই সরলরেখায় চলতে থাকবে—যতক্ষণ না প্রতিটি চাকরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায় এবং প্রতিটি অর্থনীতি নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হয়, যেখানে মানুষের আর কোনো প্রয়োজনীয়তাই থাকবে না। বিষয়টি এতটাই স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়া হয় যে, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অর্থই হলো নিজেকে অপরিণত বা আবেগপ্রবণ প্রমাণ করা।
কিন্তু কোম্পানিগুলো নিজেদের কারণেই ধ্বংস হয়, সাম্রাজ্যগুলো ভেতর থেকে পচে যায়। আর এই ব্যবস্থার ভেতরে বসবাসকারীরা আসন্ন পতন দেখতে পান না, কারণ এই ব্যবস্থাটিই তাদের পৃথিবী দেখার চশমা।
থমাস কুন তার ‘দ্য স্ট্রাকচার অব সায়েন্টিফিক রেভোলিউশনস’ বইয়ে যুক্তি দেখিয়েছিলেন, প্রভাবশালী কোনো কাঠামোর ভেতরে কাজ করা বিজ্ঞানীরা কাঠামোটিকে কেবল একটি হাতিয়ার বা টুল হিসেবে নয়, বরং নিজেদের বাসস্থান হিসেবেই বিবেচনা করেন। সাধারণ বিজ্ঞান হলো এক ধরনের ধাঁধা সমাধান, যা এমন একটি কাঠামোর ভেতরে ঘটে যা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না—যতক্ষণ না অসঙ্গতিগুলো জমতে জমতে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কেউ একজন সম্পূর্ণ নতুন কোনো কাঠামোর প্রস্তাব করেন। সৌরজগতের টলেমীয় মডেল (Ptolemaic model) এক হাজার বছরেরও বেশি সময় টিকে ছিল। এর মূল কারণ হলো, এর সাথে যুক্ত সবাই এতটাই বুদ্ধিমান ছিলেন যে, প্রাপ্ত উপাত্তের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তারা ক্রমাগত নতুন নতুন জটিলতা যোগ করতে থাকতেন এবং প্রতিটি নতুন জটিলতাকেই তারা অগ্রগতি বলে মনে করতেন।
“এআই-এর অনিবার্যতা তত্ত্বে” এর প্রতিটি সীমাবদ্ধতাকেই এজিআই-এর (AGI) পথে অস্থায়ী বাধা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বলা হয়, এর যুক্তির সক্ষমতা আরও উন্নত হবে, খরচ কমবে ইত্যাদি—আর সত্যি বলতে, এমনটা হতেই পারে। কিন্তু এসব ভবিষ্যদ্বাণীর প্রবল আত্মবিশ্বাস আপনাকে ১৯০০ সালের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রশাসকদের কথা মনে করিয়ে দেবে, যারা নিজেদের সভ্যতার চিরস্থায়িত্ব নিয়ে দারুণ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাদের ছিল বিশ্বের বৃহত্তম নৌবাহিনী ও টেলিগ্রাফ নেটওয়ার্ক এবং পৃথিবীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ডের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। অথচ মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তার প্রায় সবই শেষ হয়ে যায়। আর এই পতন ঘটেছিল কারণ, যেসব মৌলিক শর্ত এই সাম্রাজ্যকে সম্ভব করেছিল, সেগুলো এমনভাবে বদলে গিয়েছিল যা কোনো নৌশক্তি দিয়েই ঠেকানো সম্ভব ছিল না।
২০০৭ সালে মার্কিন স্মার্টফোন বাজারের প্রায় অর্ধেকই ছিল রিসার্চ ইন মোশন (আরআইএম)-এর দখলে এবং তাদের বাজার মূলধন ছিল ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। কথিত আছে, আরআইএম-এর তৎকালীন সহ-সিইও মাইক লাজারিডিস আইফোনের লঞ্চ দেখে এই উপসংহারে পৌঁছেছিলেন যে, বিজ্ঞাপনে যেমনটা দাবি করা হচ্ছে, সেলুলার নেটওয়ার্কে এই ডিভাইসটির পক্ষে সেভাবে কাজ করা অসম্ভব। কেবল প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে তিনি প্রায় সঠিকই ছিলেন। প্রথম আইফোনের ব্যাটারি লাইফ ছিল খুবই খারাপ এবং নেটওয়ার্কও ছিল দুর্বল। কিন্তু অন্য সবকিছুর ক্ষেত্রে তিনি মারাত্মকভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছিলেন।
সাফল্যের শীর্ষে থাকাকালীন বিশ্বব্যাপী মোবাইল ফোন বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশই নোকিয়ার দখলে ছিল। পরবর্তীতে প্রকাশিত তাদের অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, খারাপ খবরের প্রতি সিনিয়র নেতৃত্বের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকরা এতটাই ভীত থাকতেন যে, প্রতিযোগীদের হুমকি সম্পর্কে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আর ওপরের স্তরে পৌঁছাতই না। মূলত নিজেদের আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর চাপেই কোম্পানিটি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল। অন্যদিকে, জেরক্স পার্ক (Xerox PARC) গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস, মাউস, লেজার প্রিন্টার এবং ইথারনেট আবিষ্কার করলেও, জেরক্স এর মধ্যে মাত্র একটি প্রযুক্তিই বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিল। অথচ স্টিভ জবস সেখানে গিয়ে কেবল একটি ডেমো দেখেই এর সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন এবং যা দেখেছিলেন তার ওপর ভিত্তি করেই তিনি অ্যাপলের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছিলেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছিল, কারণ বাস্তবতার সাথে তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ব্যবধান এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। অটোমান সাম্রাজ্য তাদের শেষ শতাব্দীতে ক্রমাগত সংস্কার চালিয়েছিল; এর প্রতিটিই ছিল আধুনিকতাকে এমন একটি পুরনো কাঠামোতে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা, যা আসলে সেই ভার নিতে একেবারেই অক্ষম ছিল।
পি বি শেলির বিখ্যাত ‘ওজিম্যান্ডিয়াস’ কবিতার কথা মনে পড়ে যায়: নিজেকে চিরস্থায়ী ঘোষণা করা প্রতিটি সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের চারপাশে আজ কেবলই সীমাহীন, নির্জন আর সমতল বালুচর বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
আর হ্যাঁ, এই পতনের তালিকায় আগামীতে গুগল, অ্যানথ্রপিক এবং অন্যান্যরাও থাকতে পারে।
বর্তমান এআই-কেন্দ্রিক আলোচনাগুলো মডেল-১ থেকে মডেল-২, এরপর মডেল-৩—এবং ভবিষ্যতে যা আসবে, তার মধ্যে একটি সরলরেখা টেনে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, মানুষের শ্রম বা অস্তিত্বের দিন শেষ। কিন্তু প্রযুক্তি হোক বা অন্য যেকোনো কিছু, পূর্বাভাসের ইতিহাসে এই সরলরৈখিক প্রক্ষেপণই (linear projection) সবচেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সাম্রাজ্য বা কোম্পানির ক্ষেত্রে যা ঘটে তা হলো—অপ্রত্যাশিত কোনো বাধার মুখে তাদের অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়, নেতারা কৌশলগত ভুল করে বসেন, আর নতুন কোনো শক্তি এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করে যা প্রতিষ্ঠিত পুরনো কাঠামোকে টলেমির উপচক্রের (epicycle) মতোই অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করে। সেই পুরনো কাঠামোটি হয়তো জটিল এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত উন্নত, কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল পথে পরিচালিত। এই ভুলগুলোই নতুন সুযোগ তৈরি করে, প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং নতুন উদ্ভাবকদের জন্য পথ খুলে দেয়। এআই শিল্প কেন এই নিয়মের বাইরে থাকবে? ফাউন্ডেশন মডেলগুলোর মাঝে এমন কী জাদুকরী ব্যাপার আছে যা ইতিহাসের প্রতিটি প্রভাবশালী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এন্ট্রপির নিয়মকে (law of entropy) বাতিল করে দেবে?
ক্লেটন ক্রিস্টেনসেন তার ‘দ্য ইনোভেটরস ডিলেমা’ বইতে এই ধারণারই কর্পোরেট সংস্করণ তুলে ধরেছেন। দশকের পর দশক ধরে, বিভিন্ন শিল্পখাতে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো নতুন কোনো যুগান্তকারী (disruptive) হুমকির জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এর জবাব দিতে গেলে তাদের বিদ্যমান ব্যবসা (বা পরিচয়, দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা লক্ষ্য) ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং তাদের এটা স্বীকার করে নিতে হতো যে, যে কৌশল ব্যবহার করে তারা এতদিন পদোন্নতি বা সাফল্য পেয়েছেন, সেটি আসলে ভুল ছিল। অর্থাৎ: প্রভাবশালী ব্যবস্থাগুলো নিজেরাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যা শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংসের কারণ হয়। কারণ, কোনো একটি ব্যবস্থার অভাবনীয় সাফল্য এর ভেতরে থাকা মানুষদের ওই ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দেখার ক্ষেত্রে অন্ধ করে দেয়।
আমরা এখনো এআই শিল্পে প্রথম কোনো বড় পতন দেখিনি। কোনো ফাউন্ডেশন মডেল কোম্পানিকে ব্ল্যাকবেরি, নোকিয়া, রোমান বা অটোমানদের মতো ভুল করতে দেখিনি, কিংবা কাউকে হিটলারের মতো বার্লিনের বাঙ্কারে চূড়ান্ত পতনের অপেক্ষায় থাকতে দেখিনি। কিন্তু আমরা তা দেখব, এবং বারবারই দেখব—কারণ এ ধরনের ভুলগুলোই ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যে অহংকার কোনো এক যুগে একটি কোম্পানি বা সাম্রাজ্যকে প্রভাবশালী করে তোলে, সেই একই জিনিস তাদেরকে পরবর্তী যুগের পরিবর্তনগুলো দেখার ক্ষেত্রে অন্ধ করে দেয়। ২০০৬ সালে মাইক লাজারিডিসকে কিংবা ১৯০০ সালে কোনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসককে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, তাদের বিশ্বব্যবস্থা চিরস্থায়ী কি না—তবে তারা প্রত্যেকেই অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়ে প্রমাণ করে দিতেন যে কেন তাদের ব্যবস্থাটি চিরকাল টিকে থাকবে।
যখন কেউ আপনাকে বলেন যে এজিআই (AGI) অনিবার্য এবং বেশিরভাগ মানুষের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন হয়ে পড়াটা নিশ্চিত—তখন তারা আসলে বোঝাতে চান যে, বর্তমান এআই শিল্পের নেতারা অদেখা সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অনির্দিষ্টকাল ধরে নিখুঁতভাবে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখবেন। আর তা এমন একটি পরিবেশে, যা হয়তো ইতিহাসের যেকোনো প্রযুক্তিগত পরিবেশের চেয়ে দ্রুতগতিতে বদলাচ্ছে। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন যে, এই নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো, ঠিক এই মুহূর্তে এসে মানব ইতিহাসের প্রতিটি সাম্রাজ্য ও কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য চিরন্তন নিয়মকে ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, একসময় রাস্তা ভেঙে পড়ে, লেজিয়নরা (সেনাবাহিনী) পিছু হটে, টলেমির উপচক্রগুলো একটি সহজ সত্যের সামনে এসে ধসে পড়ে। এরপর যার পূর্বাভাস কেউ কখনো দেয়নি—সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন কিছুর জন্ম হয়। ইতিহাসে সবসময় এমনটাই হয়ে এসেছে, এবং ভবিষ্যতেও এমনটাই হবে।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পেটেন্ট কি চুরির ফসল?
টেলিফোনের আবিষ্কার নিয়ে ১৫০ বছরের বিতর্ক। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নাকি এলিশা গ্রে? এক ঐতিহাসিক রহস্যের অনুসন্ধান।
বিদ্যুৎহীন যুগে মানুষ কীভাবে বরফ তৈরি করত?
আধুনিক রেফ্রিজারেটরের আগে ৪০০ বছর খ্রিস্টপূর্বে পারস্যরা কীভাবে প্রকৃতির বিপরীতে বরফ তৈরি করত, জানুন ইয়াখচালের বিস্ময়কর কৌশল।
OpenAI বন্ধ করে দিচ্ছে তাদের সবচেয়ে মোহনীয় চ্যাটবট
ওপেনএআইয়ের জনপ্রিয় চ্যাটবট GPT-4o বন্ধের ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও শোক। অনেকে বলছেন, "এভাবে চলতে পারব না।"