বুদ্ধিমত্তা কেন প্রজ্ঞার খারাপ বিকল্প
বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী লাইনাস পলিং পর্যন্ত অনেক বুদ্ধিমান মানুষই কেন ভয়ংকর ভুল করেন, তার একটি বিশ্লেষণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ধরনের চিন্তা-পরীক্ষা প্রায়ই চোখে পড়ে। কল্পনা করুন, ভবিষ্যতের ৮০ বছর বয়সী ‘আপনি’ আজকের এই দিনটির দিকে ফিরে তাকাচ্ছেন। আপনার বর্তমান শরীরে ফিরে আসতে, আপনার সেই ব্যথাহীন হাঁটুগুলো ফিরে পেতে এমনকি বর্তমানের ব্যস্ত সময়সূচি ও জরুরি মনে হওয়া সমস্যাগুলো ফিরে পেতে তিনি কী না দিতে রাজি হতেন!
আত্ম-উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শের মতো এটিরও মূলে রয়েছে মনোবিজ্ঞানের চমৎকার অন্তর্দৃষ্টি এবং কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক যুক্তি। কিন্তু বেশিরভাগ আত্ম-উন্নয়নমূলক পরামর্শের বিপরীতে এর মূল কাঠামোটি বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত। সময়, মূল্য ও অনুশোচনা নিয়ে মানুষ কীভাবে ভাবে তার ওপর ভিত্তি করেই মূলত এই ধারণাটি দাঁড়িয়ে আছে।
গবেষকরা দেখেছেন, মানুষের সবচেয়ে বড় অনুশোচনাগুলো সাধারণত কর্মের চেয়ে অকর্মণ্যের (বা যা করা হয়নি তার) দিকেই বেশি ঝোঁকে। মনোবিজ্ঞানীরা যখন মানুষের জীবনের অনুশোচনা নিয়ে জরিপ করেন তখন একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন দেখা যায়। সংক্ষিপ্ত সময়ে মানুষ যা করেছে তার জন্য অনুশোচনা করে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যা করেনি তার জন্য বেশি অনুশোচনা হয়। পার্টিতে বলে ফেলা সেই বিব্রতকর কথাটি হয়তো সপ্তাহখানেক তাড়া করে বেড়ায়। কিন্তু যে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ নেওয়া হয়নি বা যে সম্পর্ক ঠিক করা হয়নি তার জন্য মনে আক্ষেপ থেকে যায়। এমনকি যে বিদেশ ভ্রমণ করা হয়নি সেটিও দশকের পর দশক আক্ষেপ হয়ে বসে থাকে।
স্মৃতি ও আবেগের সম্পর্কটি বুঝতে পারলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ফেডিং অ্যাফেক্ট বায়াস’ (Fading Affect Bias), যেখানে নেতিবাচক স্মৃতির আবেগগত তীব্রতা ইতিবাচক স্মৃতির চেয়ে দ্রুত মিলিয়ে যায়। সেই বিব্রতকর মুহূর্তের দহন সময়ের সাথে সাথে কমতে থাকে। কিন্তু যে পথ নেওয়া হয়নি তা কালের পরিক্রমায় আরও প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, ঠিক এই কারণেই যে সেটি কখনো ঘটেইনি। কল্পনা সেই শূন্যস্থানগুলো সম্ভাব্য সেরা ফলাফল দিয়ে ভরিয়ে দেয় অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো তাদের সমস্ত জটিলতা নিয়েই স্মৃতিতে থেকে যায়।
আমাদের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো ভবিষ্যতের পুরস্কারের চেয়ে বর্তমানের পুরস্কারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া এবং অতীতের অভিজ্ঞতার চেয়ে বর্তমানের অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দেওয়া। ২৫ বছর বয়সে আসবাবপত্র সরাতে গিয়ে পিঠে ব্যথা হলে কেউ ভাবে না যে ‘ভালোই হলো, এখনো অন্তত আসবাব সরাতে পারি।’ কিন্তু ৮০ বছর বয়সে যখন আপনি আর তা পারবেন না তখন সেই স্মৃতি অন্য রকম এক অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসে।
বয়সের সাথে মানুষের সুখের মাত্রা কীভাবে বদলায়, সে বিষয়ে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে। সামাজিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য একটি আবিষ্কার হলো সুখের U-আকৃতির বক্ররেখা, যেখানে দেখা যায় মানুষ বিশের কোঠায় সবচেয়ে বেশি সুখী বোধ করে এবং চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে সুখের পরিমাণ কমে গেলেও বয়স বাড়লে তা আবার বাড়তে থাকে। বয়স্করা কি আসলেই বেশি সুখী নাকি আবেগ নিয়ন্ত্রণে তারা বেশি পারদর্শী হয়ে ওঠেন, তা নিয়ে অবশ্য এর ব্যাখ্যায় বিতর্ক রয়েছে। তারা কি নিজেদের খারাপ বিকল্পের সাথে তুলনা করেন নাকি জীবন সম্পর্কে সত্যিই গভীর কিছু উপলব্ধি করতে পারেন? কারণ যাই হোক না কেন, মধ্যবয়স্কদের চেয়ে বয়স্করা জীবনে বেশি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আর এই বিষয়টিই সেই সরল ধারণাকে জটিল করে দেয় যে আপনার ৮০ বছর বয়সী সত্তা আপনার যৌবনের প্রতি হিংসায় জ্বলছেন।
লরা কারস্টেনসেনের সোশোইমোশনাল সিলেক্টিভিটি তত্ত্ব (Socioemotional Selectivity Theory) অনুযায়ী মানুষের জীবনের সময় যখন সংকুচিত হয়ে আসে, তখন তারা ভবিষ্যৎ-মুখী লক্ষ্যের চেয়ে আবেগগত সন্তুষ্টির দিকে বেশি ঝোঁকে। বয়স্করা নিশ্চিতভাবেই তাদের হারানো যৌবনের জন্য কাঁদেন না, বরং তারা বৃদ্ধ বয়স নিয়েই বেশ সন্তুষ্ট থাকেন।
তাহলে কি এই চিন্তা-পরীক্ষাটি একেবারেই অকেজো? একেবারেই না।
আপনার বর্তমান অগ্রাধিকারগুলো নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট মূল্য রয়েছে। আপনি যখন বৃদ্ধ বয়সের নিজেকে কল্পনা করেন, তখন আসলে নিজের জীবনের একটি মূল্যায়ন অনুশীলন করছেন। আপনি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করছেন, বর্তমান জীবনের কোন অংশগুলো দূর থেকে দেখলে মূল্যবান মনে হবে, কোন উদ্বেগগুলো তুচ্ছ মনে হবে এবং কোন সুযোগগুলো আসলে নেওয়া উচিত ছিল।
অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান ক্যাপল্যান ‘হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন’ (Hedonic Adaptation) নিয়ে কথা বলেছেন, যা হলো ইতিবাচক বা নেতিবাচক ঘটনার পর আমাদের সুখের মান আবার স্বাভাবিক স্তরে ফিরে আসার প্রবণতা। লটারি জিতলেও এক বছরের মধ্যে আপনি ঠিক আগের মতোই সুখী (বা অসুখী) অবস্থায় ফিরে যাবেন। কী আমাদের সুখী করবে তা ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে আমরা আশ্চর্যজনকভাবে ব্যর্থ, কারণ আমরা ভুলে যাই যে নতুন পরিস্থিতিতে আমরা কত দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যাই।
তবে হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন উল্টোদিকেও কাজ করে। আমরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ি যে ভুলে যাই একসময় এটিই আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক মনে হয়েছিল। প্রথমবার যখন ভালো রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার সামর্থ্য হলো, তখন তা চরম বিলাসিতা মনে হয়েছিল। কয়েক বছর পর এটি শুধুই আরেকটা সাধারণ রাতের খাবার। রুমমেট ছাড়া নিজের প্রথম বাসাটি ছিল পরম বিস্ময়ের। এখন তা লক্ষ্যই করি না। ঠিক এখানেই ৮০ বছর বয়সী দৃষ্টিকোণ কাজে আসে, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের বর্তমান স্বাভাবিক অবস্থাটি (Baseline) মানব ইতিহাসের তুলনায় এবং ভবিষ্যতের ‘আপনার’ তুলনায় কতটা অসাধারণ।
হয়তো আপনি কোনো চিন্তা ছাড়াই অনায়াসে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারেন। হয়তো চোখ ক্লান্ত না করেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়তে পারেন। হয়তো রাত ৯টার পর জেগে থাকলে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার মতো লাগে না। হয়তো এখনো মানুষ আপনাকে চাকরি দিতে, আপনার সাথে সময় কাটাতে এবং সহযোগিতা করতে চায়। হয়তো এখনো আপনার সেই শক্তি আছে, যার মাধ্যমে এমন সব প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে পারেন যা অন্যদের কাছে অর্থহীন মনে হয়। এই সামর্থ্যগুলোর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে এবং সেটি যে কখন শেষ হয়ে গেছে, তা হয়তো আপনি অনেক পরে গিয়ে বুঝতে পারবেন।
আপনার ৮০ বছর বয়সী সত্তা কি সত্যিই আপনার আজকের দিনটিকে হিংসা করবেন? হয়তো চিন্তা-পরীক্ষাটি যতটা দাবি করে, বাস্তবে তার চেয়ে কম। তিনি হয়তো প্রবীণ নাগরিক হিসেবে পাওয়া সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রের নাটকীয়তা না থাকার কারণে বেশ শান্তিতেই আছেন। কিন্তু সাধারণ ও সাদামাটা কিছু নির্দিষ্ট দিনের কথা মনে পড়লে তিনি কি চাইবেন না যে সেই দিনগুলোতে আরেকটু বেশি মনোযোগ দিলে ভালো হতো? কোন উদ্বেগগুলো আসলে গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনগুলো নয়, সে বিষয়ে কি তিনি আপনাকে কিছু পরামর্শ দিতে চাইবেন না?
নিশ্চয়ই চাইবেন।
আর ঠিক এখানেই সুযোগটি লুকিয়ে আছে। আপনি আপনার বর্তমানের সাধারণ সমস্যাগুলো নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগগুলো বিনিময় করতে পারেন একটি ‘ধার করা’ দৃষ্টিকোণের সাথে, যা সেই সমস্যাগুলোকে তাদের আসল রূপে দেখতে সাহায্য করে। কারণ এগুলো অস্থায়ী, সামলানো সম্ভব এবং প্রায়শই ভুলে যাওয়ার মতো। আপনি বুঝতে পারবেন যে সমস্যা সমাধান করতে পারা, উদ্বেগ করার মতো মানসিক শক্তি থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারার মতো বিলাসিতাগুলো চিরকাল থাকবে না। বর্তমান অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ স্মৃতির বিনিময় হার প্রায়শই আপনার পক্ষে থাকে না, যার মানে হলো এই মুহূর্তে আপনার কাছে যা আছে তাকে আপনি সম্ভবত কম মূল্য দিচ্ছেন।
সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিছু দিন সত্যিই খুব খারাপ যায়। কিছু সমস্যা সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বেশিরভাগ দিনেই এমন কিছু উপাদান থাকে যা ভবিষ্যতের ‘আপনি’ খুব মিস করবেন, যদি শুধু এখনই সেগুলো লক্ষ্য করতে শিখতে পারেন। ৫০ বছর পরের আপনি হয়তো আজকের দিনটির জন্য সবকিছু দিয়ে দিতে রাজি হবেন না, কিন্তু কিছু না কিছু তো অবশ্যই দিতে রাজি হবেন। আসল প্রশ্ন হলো, আপনি কি ভবিষ্যতের অনুশোচনাকে এখনই কাজে লাগাতে প্রস্তুত, যখন আপনার কাছে এখনো সময় আছে সেই জিনিসগুলো উপভোগ করার যা আপনি ভবিষ্যতে আরও বেশি উপভোগ করতে চাইবেন?
বিখ্যাত শিল্পী প্যাটি স্মিথ বিষয়টি চমৎকারভাবে বলেছেন:
“আমরা এমন জিনিস চাই যা আমাদের নেই। আমরা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত, শব্দ, অনুভূতি ফিরে পেতে চাই। আমি আমার মায়ের কণ্ঠ শুনতে চাই। আমি আমার সন্তানদের শিশু বয়সে দেখতে চাই। ছোট হাত, দ্রুত পা। সবকিছু বদলে যায়। ছেলে বড় হয়ে গেছে, বাবা মারা গেছে। মেয়ে আমার চেয়ে লম্বা, দুঃস্বপ্ন দেখে কাঁদছে। দয়া করে চিরকাল থেকো, আমি পরিচিত জিনিসগুলোকে বলি। যেও না। বড় হয়ো না।”
বুদ্ধিমত্তা কেন প্রজ্ঞার খারাপ বিকল্প
বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন থেকে শুরু করে নোবেলজয়ী লাইনাস পলিং পর্যন্ত অনেক বুদ্ধিমান মানুষই কেন ভয়ংকর ভুল করেন, তার একটি বিশ্লেষণ।
কীভাবে হয়ে উঠবেন আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত
যারা নিজেদের আকর্ষণীয় বলে প্রমাণ করতে ব্যস্ত, তারাই আসলে সবচেয়ে বিরক্তিকর। আসল ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার মূলমন্ত্র জেনে নিন।
আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী সময়
একটি যুব বাস্কেটবল দলের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করে আমি যেভাবে সত্যিকারের সুখ খুঁজে পেয়েছিলাম, এবং কেন তা আজকের প্রযুক্তি জগতের জন্য প্রাসঙ্গিক।