skip to content
গুলবাহার
মাতা হারি

মাতা হারি: জীবন, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ও লেগাসি

·

• ৫ মিনিট

তিনি কি এক মনোহরী নৃত্যশিল্পী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গুপ্তচর, নাকি নিতান্তই নির্দোষ বলির পাঁঠা? মাতা হারি এমন এক রহস্যময়ী নারী যাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্ব এখনো মানুষকে মুগ্ধ করে। কিন্তু আসল মাতা হারি কে ছিলেন? কীভাবে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির এই অভিযোগে জড়িয়ে পড়লেন? আসুন তাঁর জটিল জীবনগাথার একটু গভীরে যাই।

মাতা হারির প্রারম্ভিক জীবন

মাতা হারি মার্গারেথা জেলে নামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৭৬ সালের ৭ আগস্ট নেদারল্যান্ডসের লিউওয়ার্ডেন শহরে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবা একজন সচ্ছল টুপি বিক্রেতা ছিলেন। শৈশবে তাঁর জীবন সাধারণ ডাচ পরিবারের মতোই ছিল। কিশোরী বয়সে তাঁদের পরিবারে চরম আর্থিক সংকট দেখা দেয়। বাবার ব্যবসা একেবারে ধ্বংসের মুখে পড়ে। এর কিছুদিন পর তাঁর বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। ১৮৯১ সালে মায়ের মৃত্যুর পর পনেরো বছর বয়সী মার্গারেথাকে তাঁর আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

চার বছর পর ডাচ সেনাবাহিনীর অফিসার ক্যাপ্টেন রুডলফ ম্যাকলিওডের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং তাঁরা বিয়ে করেন। দুঃখজনকভাবে তাঁদের এই দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের ছিল না। স্বামীর অবিশ্বস্ততা ও নির্যাতনের কারণে তাঁদের সম্পর্ক জর্জরিত ছিল। তাঁদের দুটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাই তাঁকে পরবর্তীকালে এক নৃত্যশিল্পীতে পরিণত করেছিল। আর এই মঞ্চনামই তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয়।

এশীয় ঘরানার নৃত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেন মাতা হারি
এশীয় ঘরানার নৃত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেন মাতা হারি

১৯০৫ সালে মার্গারেথা প্যারিসে চলে আসেন। সেখানে তিনি এশীয় ঘরানার নৃত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তিনি মাতা হারি নামটি গ্রহণ করেন, মালয় ভাষায় যার অর্থ হলো “দিনের চোখ”। খ্যাতি অর্জন করার পর তিনি ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সফর করেন। তিনি নিজের সম্পর্কে একটি কাল্পনিক কাহিনি তৈরি করেছিলেন। তিনি দাবি করতেন যে একজন পুরোহিত তাঁকে নৃত্য শিখিয়েছেন। আর তাঁর জন্মও নাকি ভারতেই হয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গুপ্তচর হিসেবে জীবন

বিশ্বে গুপ্তচরবৃত্তির সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলো মূলত রাশিয়া ও স্নায়ুযুদ্ধকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু গুপ্তচররা এরও বহু বছর আগে থেকেই কাজ করে আসছেন। যেকোনো যুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ছিল। প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ও জয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা রাখা খুবই জরুরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চিত্রটিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। পুরনো পদ্ধতির গুপ্তচরবৃত্তির পাশাপাশি সেসময় বিমানের ক্যামেরার সাহায্যে আকাশ থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজও শুরু হয়।

জেমস বন্ডের মতো চলচ্চিত্র ও বইগুলোতে গুপ্তচরদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জমকালো পোশাকে তুলে ধরা হয়। সেখানে তাঁরা ধরা পড়লেও কখনো ভয় পান না। কিন্তু বাস্তবে গুপ্তচরবৃত্তির কাজ এতটা রোমাঞ্চকর নয়। এই কাজে নানা মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়। বিভিন্ন গোপন তথ্য জেনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তা পাঠাতে হয়। ১৯১৭ সালের দিকে যুদ্ধে জড়িত দেশগুলোতে এক হাজারের বেশি গুপ্তচর সক্রিয়ভাবে কাজ করছিলেন।

মার্গারেথা জেলের পাশাপাশি সেসময় আরও কয়েকজন বিখ্যাত গুপ্তচর ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্রিটজ জৌবের দুকেন নামের এক ব্যক্তি একটি জার্মান গুপ্তচর চক্র পরিচালনা করতেন। এছাড়া ব্রিটিশ গুপ্তচর সিডনি রেইলির নামও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

মাতা হারি ও গুপ্তচরবৃত্তি

মাতা হারি গুপ্তচরবৃত্তির জন্য একজন আদর্শ প্রার্থী ছিলেন। নেদারল্যান্ডস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়নি। তাঁর দেশ নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকায় জেলে কোনো সন্দেহ ছাড়াই অনায়াসে সীমান্ত পার হতে পারতেন।

তাঁর গণিকাবৃত্তি ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে অর্জিত খ্যাতি তাঁকে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।
তাঁর গণিকাবৃত্তি ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে অর্জিত খ্যাতি তাঁকে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

জানা যায় যে, ১৯১৫ সালে জার্মানি তাঁর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করেছিল। তাঁর গণিকাবৃত্তি ও নৃত্যশিল্পী হিসেবে অর্জিত খ্যাতি তাঁকে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। তথ্য সংগ্রহের জন্য এই সুযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত আকর্ষণ ব্যবহার করে অনেক গোপন আলোচনা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা তাঁর সামনে খুব একটা সতর্ক থাকতেন না। এটি ঠিক তাঁর পেশার কারণে নাকি কেবল নারী হওয়ার কারণে ঘটত, তা আজও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তিনি আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, সে বিষয়েও কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

মাতা হারির গ্রেপ্তার, বিচার ও মৃত্যুদণ্ড

ফরাসিদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সময় মাতা হারি ছয়টি ভিন্ন নাম ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে জার্মানির হয়ে দ্বৈত গুপ্তচর হিসেবে কাজ করার জন্য তাঁর একটি বিশেষ ছদ্মনাম ছিল। একজন ফরাসি গুপ্তচরের মৃত্যুর পর তারা সন্দেহ করে যে, মাতা হারিই হয়তো সেই নামগুলো জার্মানির কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন। এরপর ১৯১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিসের হোটেল এলিসি প্যালেস থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২৪ জুলাই তাঁর বিচারকাজ শুরু হয়। জার্মানির সঙ্গে আঁতাত করে হাজার হাজার ফরাসি সৈন্যের মৃত্যুর জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়েছিল।

তাঁর ব্যাপক পরিচিতির কারণে মাতা হারির এই বিচারকাজটি পুরো সংবাদমাধ্যমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। সেন্ট লুইস পোস্ট-ডিসপ্যাচ পত্রিকা ১৯১৭ সালের ১২ আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়, “মাতা হারি কল্পনাতীত কাহিনিকেও হার মানানো এক রোমাঞ্চ ও ট্র্যাজেডির পথ তৈরি করেছেন। বার্মা থেকে প্যারিস পর্যন্ত তিনি বহু পুরুষকে মৃত্যু ও লজ্জার দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।”

১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর মার্গারেথা জেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফরাসি ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সেই সময়েই অনেকে মাতা হারিকে যুদ্ধ ও বৈরী পরিস্থিতির এক দুঃখজনক শিকার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁর এই নিষ্ঠুর পরিণতি কি সত্যিই ন্যায়সংগত ছিল? কারণ সেই সময় যুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি একেবারেই স্বাভাবিক একটি ঘটনা ছিল। এই ঘটনাটি নারীদের ইতিহাসে ভোগান্তি ও বঞ্চনার প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে আসে।

১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর মার্গারেথা জেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর মার্গারেথা জেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

মাতা হারির স্থায়ী লেগাসি ও ফেম ফাতাল ভাবমূর্তি

জেলের এই কুখ্যাতি তাঁর মৃত্যুর অনেক বছর পরেও মানুষের মুখে মুখে বেঁচে ছিল। তাঁর মঞ্চনাম ‘মাতা হারি’ এখন ফেম ফাতাল বা রহস্যময়ী নারী গুপ্তচরের সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। তাঁর জীবনের গল্পটি নানা বই ও চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও আধুনিক মাধ্যমেও এটি চিরস্থায়ী হয়ে আছে। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে একাধিক তথ্যচিত্র ও ঐতিহাসিক কল্পকাহিনিও তৈরি করা হয়েছে।

মাতা হারির গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এর ঠিক কতটা অংশ সত্যি তা নিয়ে আজও প্রশ্ন থেকে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত পুরো বিচারকাজটি মূলত পরোক্ষ প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাছাড়া যুদ্ধে খারাপ ফলাফলের জন্য ফরাসিদের কাউকে না কাউকে দায়ী করার প্রয়োজন ছিল। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় ফ্রান্সে মানুষের বিনোদনের ধরন অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। মাতা হারির উসকানিমূলক নৃত্যশৈলী ফরাসি সমাজে তাঁকে অনেকটা বিদেশির মতোই করে তুলেছিল। ইতিহাসবিদ ওয়েসলি ওয়ার এ সম্পর্কে বলেন, “তাদের একজন বলির পাঁঠার দরকার ছিল এবং তিনি ছিলেন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য।”

তাহলে তিনি কি সত্যিই এক ফেম ফাতাল ছিলেন? তিনি কি এমন এক বিপজ্জনক মোহিনী ছিলেন, যিনি গোপন তথ্য পাওয়ার জন্য পুরুষদের শিকার বানাতেন? নাকি মার্কিন ইতিহাসবিদ নরম্যান পলমার ও থমাস অ্যালেন যেমনটা মনে করেন, তিনি ছিলেন কেবলই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একজন সাধারণ শিকার? তিনি কি কেবল বড় কোনো রাজনৈতিক খেলায় বোকা বনে যাওয়া এক অসহায় নারী ছিলেন? এই প্রশ্নগুলো আজও মানুষের কাছে উত্তরহীন রয়ে গেছে।

কেমন লাগলো এই লেখাটি?

প্রাসঙ্গিক লেখা

৩টি লেখা
  1. ক্রিকেটের ইতিহাস

    ফুটবলের পর ক্রিকেটই বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা। ২৫০ কোটি অনুসারী নিয়ে এই খেলার উৎপত্তি থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ইতিহাস জানুন।

    ক্রিকেটখেলাধুলাইতিহাস
  2. অপরাধ, অভিশাপ ও প্রতিশোধ: মিয়াসমার গল্প

    প্রাচীন গ্রিসে মিয়াসমা বলতে বোঝাত আধ্যাত্মিক দূষণ, যা সাধারণত অবাধ রক্তপাতের কারণে সৃষ্টি হতো।

    প্রাচীন গ্রিসগ্রিক পুরাণইতিহাস
  3. বিমান দুর্ঘটনায় নিহত প্রথম ব্যক্তি

    ১৯০৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ওরভিল রাইটের উড়োজাহাজে যাত্রা করে থমাস সেলফ্রিজ ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।

    ইতিহাসউড়োজাহাজবিমান দুর্ঘটনা